বাংলার জমিদার ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা – আল হাসান

জমিদারি ও ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকায় অনেকেই ধারণা যে,ব্রিটিশ আমলে জমিদারদের উৎপত্তি।অথচ একটু লক্ষ্য করলে প্রতীয়মান হয় যে,জমিদার একটি ফার্সী শব্দ এবং মুঘল আমল থেকেই এর ব্যবহার হয়ে আসছে।দুটি ফার্সী শব্দ জমি ও দার ভূমির উপর যার অধিকার৷ইরফান হাবিব বলেন, ‘জমিদারী অধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তি সদৃশ অন্যান্য দ্রব্যের মতো কোন সম্পদের মালিক নন, এ এমন এক পদ যার কারণে তিনি সামজিক পণ্যের ভাগ গ্রহন করেন।মুঘল সম্রাজ্যের প্রচলিত ধারা অনুযায়ী জমিদার এমন একজন ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি খালসা তে লিপিবদ্ধ জমির এক অংশ ভোগ করেন এবং সরকারের কাছে তার জমিতে উৎপাদিত লভ্যাংশের ভাগ দিতে বাধ্য।মুঘল পূর্ববর্তী সময়ের বংশানুক্রমিক জমিদারী ব্যবস্থা থেকেই এই জমিদার কথাটি সরাসরি গ্রহন করা হয়।

ভৌমিক,ভূঁইয়া প্রভৃতি নাম বাংলায় মুঘল শাসনামলের আগেও ভূমির অধিকারিক অর্থেও ব্যবহার করা হতো।এ কারণেই এ অঞ্চলটিকে বারো ভূঁইয়াদের দেশ ও অনেকে বলতেন।উড়িষ্যাতেও প্রাচীন জমির মালিকদের একই নামে উল্লেখ করা হতো।প্রচলিত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাকে তাদের মতো পরিবর্তন করতে মুঘল শাসকগন তাদের অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য এই শব্দটি গ্রহন করেছিলেন।মুঘলশাসনামলে জমিদারি ব্যবস্থাপনা এক নতুন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত হতে থাকে।মুঘল প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত জমিদারগণ যে ব্যাপক অর্থ গ্রহন করতো তা জমিদারির সংজ্ঞাকে আরো জটিল কতে তোলে।জাতিগত পদবী থেকে শাসনকাজে নিয়োজিত বিভিন্নস্তরের ব্যক্তির জমিদারি পদবী গ্রহন করে প্রায় স্বাধীন রাজোচিত এলাকার শাসক, যেমনঃ রাজা,রানা ইত্যাদি।

প্রাক মুঘল যুগে সরকারের রাজস্ব আদায়কারী ব্যক্তিবর্গের জন্য মজুমদার, ইজারাদার ইত্যাদি নামের ব্যবহার হয়ে আসছে৷ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ভূসসম্পত্তির মালিকানা সরাসরি কেন্দ্রশাসনের অশীনে থাকলেও ভৌগলিক ও জলবায়ু বৈশিষ্ট্যমন্ডিত সুদূর বাংলার ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় নি।বাংলার পূর্বাঞ্চল ছিল নদীবৌধিত।বর্ষাকালে সমগ্র এলাকা প্লাবিত হওয়ায় জমির সীমানা নির্ধারন ও দলিল প্রস্তুত করা কষ্টসাধ্য ছিল।তদুপরি জালের মতো বিস্তৃত নদীনালা ও ঘনজংগলের কারণে যাতায়াত ও সৈন্য পরিবহন ছিল দূরুহ কাজ।উপরোক্ত কারণে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রায়তওয়ারী ব্যবস্থা একক গ্রামভিত্তিক চাষপদ্ধতি তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলে অনুপস্থিত ছিল।ফলে সুবে বাংলায় সুলতানি আমলেই জমিদার, তালুকদার এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় স্বীকৃত প্রথায় পরিনত হয়।জমিদারি ব্যবস্থায় জমির মালিক ছিল সরকার।তবে জমিদাররা বংশানুক্রমিকভাবে জমিদারি ভোগ করতেন এবং সরকারবিরোধী কাজ না করলে তাদের উচ্ছেদ করা হতো না।রাজস্বআদায়কারী হলেও প্রশাসনিক কাজ থেকে শুরু করে সমস্ত ব্যাপারই জমিদারদের উপর ন্যস্ত ছিল।ফলে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রে জমিদার শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত৷দায়িত্ব,ক্ষমতা,সরকারের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদির প্রেক্ষিতে মুঘল আমলে জমিদারদের বিভিন্ন শ্রেনীভেদ লক্ষ্য করা যায়।কালক্রমে জমিদারি প্রথা মুঘল শাসন ব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।মুঘল সম্রাজ্যের বিশালতা ও সর্বক্ষেত্রে ঠিকমত নজর না রাখতে পারার সুবাদে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে জমিদারদের ক্ষমতা যথেষ্ঠ বৃদ্ধি পায়।বিপুল সংখ্যক জমিদার নানা অযুহাতে কেন্দ্রীয় কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতে বিরত থাকে।এর প্রতিকারার্থে মুর্শিদকুলি খান ১৭২২ সালে ‘মালজামিনি’ প্রথার প্রবর্তন করেন।এই ব্যবস্থায় ‘জমা-কামিল-তুমারি’ অনুযায়ী জমিদাররা নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব দিতে বাধ্য হন।অপারগতায় জমিদারি নিলামে তুলে দেয়ার নিয়ম করা হয়।রাজস্ব ব্যবস্থাকে সূদৃঢ় করতে মুর্শিদকুলি খান সুবে বাংলাকে ১৩ টি চাকলায় ভাগ করেন এবং চাকলাদারদের উপর রাজস্ব আদায়ের ভার পড়ে।আসলে জমিদাররাই ছিলেন এখানে চাকলাদার।এ প্রথাকে অধিকতর কার্যকর করার জন্য জোটবদ্ধকরন নীতি গ্রহন করা হয়।কালক্রমে এ ব্যবস্থাকে স্থায়ী করে ৬১৫ টি পরগনা ও ত্রিপুরার কিছু অংশসহ ১৫ টি বৃহৎ জমিদারি নিয়ে খাজনা নির্ধারন করা হয়।অবশিষ্ট অংশগুলো যা তালুক নামে পরিচিত তা তালুকদারের ভেতর বন্টন করা হয়।১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কর্তৃক দেওয়ানি লাভের পর রাজস্ব ব্যবস্থাকে অধিকতর লাভজনক করতে পাঁচশাল,দশশালা বন্দোবস্ত শুরু হয়। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারদের মালিকানাস্বত্ব ও দেয়া হয়।মুঘল আমলে জমিদাররা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারদের মতো অনুপস্থিত জমিদার ছিলেন না।ফলে তখনকার সময়ে জমিদারদের জাঁকজমকপূর্ন জীবন যাত্রা গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিকে সচ্ছল রাখতে সাহায্য করতো।যেমনঃশান্তিপুর,
সন্তোষ,ঘোড়াঘাট,রাজশাহীর সূক্ষ্ম সূতি ও রেশমি বস্ত্রশিল্প, নদীয়া,দিনাজপুর,রাজশাহীর জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় সমৃদ্ধি লাভ করেছিল।জমিদারদের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা গ্রামীণ অর্থনীতি তথা সমাজের উপর যথেষ্ঠ প্রভাব ফেলতো।বস্তুতপক্ষে নানা ত্রুটি সত্ত্বেও বিশাল মুঘল সম্রাজ্যের অর্থনৈতিক, সামাজিক,প্রশাসনিক কাঠামোয় জমিদারি প্রথা একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয় এবং ব্রিটিশরাও জমিদারদের সাথেই নতুন আংগিকে ভূমি রাজস্ব আদায়ের বন্দোবস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় যা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নামে ২২ মার্চ,১৭৯৩ থেকে কার্যকর করা হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে,মুঘল সম্রাজ্য সব এলাকায় আবার জমিদারি কথাটি এক অর্থে ব্যবহার করা হয়নি।উত্তর ভারতে আঠারো শতক পর্যন্ত মুসলিম শানের আগে সম্পত্তির অধিকারী ব্যক্তিবর্গকে জমিদার আখ্যা দেয়া হতো।বাংলার জমিদাররা বুন্দেলাখন্ডের জমিদারদের থেকে পৃথক হলেও উত্তর ভারতের তালুকদারদের সাথে তাদের মিল ছিল।এমনকি সুবাহ বাংলার জমিদারি শর্তও বিহার থেকে কিছুটা পৃথক ছিল।
জমিদারী শর্তগুলো কেবল প্রাদেশিক প্রথার উপর নির্ভর করতো না,এগুলো আঞ্চলিক শর্তসমূহের উপর ও নির্ভর করতো।

গ্লেজিয়ার বলেছেন,

“for want of better terms, ma be styled the semy feudatory estates,such as Bykuntpure and the chaklas,held by rajahs of Cooch Behar, the sub feudatory or the rest of Coochwara,hd by decendants of Cooch Behar officers,who had a century before been inducted by the Moghuls into their estates as zamindar, the new purchasers such as Baharbund and Soroopore,who could pretend to no rights beyond any limitation the government might have chosen to have entered theor deeds of possession,the large zamindar,owner of ehat had been principalities, such as Edrakpore and Dinagepore and lastly the smaller once which were generally holders of talooks,which has been seperated from the large states.”

জমিদারদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান দায়িত্ব ছিল খাজনআর ব্যপারে এবং সরকারের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।১৭৩৫ সালে রাজা রামকান্তকে রাজশাহীর জমিদারির সনদে বলা আছে ” তিনি রাজকোষাগার পেরিশকাশ প্রভৃতি প্রদান করবেন এবং বাকি অংশ কিস্তবন্দী অনুযায়ী বন্দোবস্ত করবেন এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর মুজকুরাত,নানাকার প্রভৃতির মাধ্যমে আদায়কৃত ভাড়া দিতে বাধ্য থাকবেন।” এই সকল দায়িত্ব জমিদারদের উপর অর্পনের মাধ্যমে দেশকে আয় সমৃদ্ধি ও তৃপ্ত কৃষিসমাজের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

জমিদাররা যে সব জায়গা থেকে খাজনা আদায় করত তাদের তিন শ্রেনীতে ভাগ করা যায়৷মাল, সাইর ও বাজি জমা।

মাল এর অধীনে প্রাপ্ত অর্থ মূলত জমির খাজনা থেকে পাওয়া যেত।ভূমি কর ই এর প্রধান অংশ।

জমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জমিদারের জমির মাপ বা উৎপাদিত দ্রব্যের পরিমাপ মূল্যায়ন করা হতো না,বরং নাসাক্ব নামে সংক্ষিপ্ত বিবেচনার উপর নির্ধারিত হতো।মূল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা টোডর মল প্রবর্তিত ‘জমা-তুমারি-কামিল’বিভিন্ন সময়ে কৃষির উন্নতি ও জমিদারী এলাকার বিস্তৃতির সাথে সংগতি রেখে সংশোধন করা হতো।

মাল ওয়াজিবী জমিদারদের রাজস্ব মোট কৃষিযোগ্য জমির উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হতো। জমিদারের উপর দায়িত্ব ছিল পতিত জমি পুনরুদ্ধার করে তা বন্দোবস্ত করা।মোগল শাসকেরা এই সকল জমির উন্নয়নে উৎসাহ দিতেন এবং যতদিন না পর্যন্ত এসব জমির পণ্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উন্নীত না হতো ততদিন খাজনা মওকুফ করতো।সাধারণত এসব পতিত জমি ধর্মীয় কাজে ব্যয় করা হতো।জমিদাররা অবশ্য তাদের জমিদারির এই সকল উন্নতিজনিত লভ্যাংশ হাতছাড়া করতে রাজি ছিলেন না, ফলে অধিকাংশ পতিত জমির উন্নতিতেও উৎসাহী ছিলেন না।সুবাদাররা এ বিষয় সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এবং সম্ভবত মাঝে মাঝে আবোয়াব বা সেস ধার্য করতেন।মুর্শিদকুলি তগেকে মীর কাশিম পর্যন্ত সকলে ১৭৭২ পর্যন্ত নির্ধারিত রাজস্ব ছাড়াও আবওয়াব ধার্য করতেন।মীর কাশিমের নবাবীর সময় মোট আবওয়াব থেকে প্রাপ্ত অর্থ খালসা ও জায়গির জমির প্রাপ্ত অর্থের সমান ছিল।

সাইর সাধারণত নদীপথে মালপত্র আনা নেয়া, বিক্র‍য় শুল্ক ধার্যের মাধ্যমে আদায় করা হতো।সুবা বাংলায় ঠিক কত ধরনের সাইর আদায় হতো তা বলা কষ্ট।আওরংজেবের শাসনামলের শেষ দিকে প্রায় ৮০ ধরনের সাইর বন্ধ করে দেয়া হয়।রাহদারী ও পান্ডেরী টোল সাধারণত ঘাট বা চৌকী ও হাটের উপর অর্পিত হতো,জমিদারি এলাকার মধ্যে চলাচলকারী পণ্য ও মালামাল পরিবহনের উপর জমিদার এ কর ধার্য করতেন। এছাড়াও জমিদাররা পরগনাগুলোতে বাজার স্থাপন করতেন এবং শুল্ক আদায় করতেন।জমিদারিতে সংগঠিত আড়ং,মেলা,যাত্রা,তীর্থস্থানগুলোতে আগত তীর্থযাত্রীদের থেকে জমিদারের যথেষ্ঠ লাভজনক আয় হতো।যেমনঃবীরভূম রাজার অধীনে দেওরের প্রাচীন মন্দিরে প্রচুর তীর্থযাত্রী উপহার সামগ্রী দিতেন। এসব উপহারের মধ্যে ঘোড়া,পালকি,গয়না,মুক্তা জমিদাররা রেখে দিত৷মন্দিরে পূজা পাঠ ও নানা প্রকার ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের জন্য প্রধান পুরোহিত পেতো৷ স্বল্প মূল্যের রুপা,কাপড় পেত।সমসাময়িক তথ্য থেকে জানা যায় মুঘল শাসকেরা এই অন্যায় টোল আদায়ের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে বাদশাহী আদেশ জারি করে এই বেআইনি টোল আদায়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।আওরংজেবের জারি করা এক আদেশে বেআইনিভাবে আদায়কৃত এই সব সেস রাষ্ট্রীয় কোষাগারের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।কিন্তু সম্রাটের এই নিষেধাজ্ঞা অধিকাংশ সময়ই অগ্রাহ্য করা হতো,প্রত্যন্ত অঞ্চলের জমিদাররা তো তা ভ্রুক্ষেপ করতেন না।সবগুলো মুঘল প্রদেশের মধ্যে বাংলা সুবাতেই কোন প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই আদায় করা হতো।আঠারো শতকের মাঝে এ ব্যবস্থা এতই তীব্র আকার ধারণ করে যে,কারখানা থেকে বের হওয়া বা মাঠ থেকে আহরিত দ্রব্যের মূল ভোক্তার হাতে পৌছানোর প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেত।বাংলার নবাব এই সমস্যা সমাধানের অনেক চেষ্টা চালান।কোন কোন দ্রব্যের উপর আরোপিত টোল নিষিদ্ধ করা হয় এবং বার্ষিক দেয় খাজনা থেকে জমিদারদের আনুপাতিক হারে রেয়াত দেয়া হতো।

কোন বিশেষ দ্রব্যের উপর আরোপিত রাজস্বকে বাজে জমা নামে অবহিত করা হয়।এসব দ্রব্যের অনিয়ন্ত্রিত প্রকৃতির ফলে এর খাজনার হার নির্ধারন অসুবিধাকর ছিল।জরিমানা,বিবাহ ফি,পণ্য বাজেয়াপ্তকরন এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।বাজে জমার একটি উল্লেখযোগ্য খাত হল সন্তানহীন অবস্থায় মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরন।প্রতি আর্থিক বছরে দুটি বন্দোবস্ত জাতি করা হত।একটি সরকার ও জমিদারের মধ্যে যা সদর বন্দোবস্ত নামে পরিচিত।অন্যটি জমিদার ও রায়তদের মধ্যে মফস্বল বন্দোবস্ত।চাষযোগ্য জমির খাজনা কিস্তিতে দেওয়া হতো আর বনাঞ্চলের খাজনা মাসে মাসে।

জমিদারদের খাজনার চাহিদা নির্ধারিত থাকলেও তারা কৃষকের খাজনা পৃথকভাবে নির্ধারন করে থাকতেন।খাজনার হারে এত ব্যাপক পার্থক্য ছিল যে কেবল অঞ্চল ভেদে নয় সরকার,পরগনা এমনকি গ্রাম ভেদে এর পার্থক্য লক্ষ করা যায়।আওরংজেবের সময়ে বাদশাকে কৃষক যে হারে খাজনা দিত তা কোন অংশেই অর্ধেকের বেশি নয়।কৃষকের আদেশে বোঝাস্বরুপ বা কৃষির জন্য অতিরিক্ত কর ধার্য নিষিদ্ধ ছিল।বাদশাহী আদেশে রায়তদের বিভিন্ন মেয়াদে ঋন দেয়া হত।যদিও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে টোডরমলের জমির বন্দোবস্ত জারি ও মুর্শিদকুলি খানের আবোয়াব ও মাথাউত জারির মধ্যবর্তী সময়ে উন্মুক্তভাবে ও ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারণ করা হয়,এর ফলে কৃষকের খাজনা যথেষ্ঠভাবে বেড়ে যায়।মুর্শিদকুলিখানের সময় খাজনার হার ছিল বিঘা বা কানি প্রতি ১০ আনা। ১৭৫৫-৬১ নাগাদ বেশি না বাড়লেও তা ২ রুপি পর্যন্ত হয়।রায়ত বা জমিদারদের মধ্যে সংস্থাপিত চুক্তি দুটি ছিল প্রচলিত পদ্ধতি ও চুক্তিভিত্তিক। প্রথমটির খাজনা নির্ক নামে পরিচিত।নির্ক হলো একটি বিশেষ এলাকার প্রচলিত আচরণভিত্তিক বিঘাপ্রতি উৎপাদিত পণ্য ও দ্রব্যের খাজনার নির্দিষ্ট হার।জমিদাররা স্বেচ্ছাপ্রণিতভাবে যে জমি যাকে ইচ্ছা বরাদ্দ করতে পারতো।জমিদার ও রায়তদের মধ্যে শস্য ভাগ করে নেওয়ায় বিহার বা উড়িষ্যার পদ্ধতি বাংলায় প্রচলিত ছিল না। আর এ খাজনা নগদ অর্থে পরিশোধিত হতো।জমিদাররা তাদের ববরাদ্দকৃত খাজনা নগদেই পরিশোধ করতেন।প্রথাগত ভাতা কর্তনের পর জমিদাররা এই রাজস্ব গরুর গাড়িতে করে সুবার রাজধানীর উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিতেন।সেখান থেকে অত্যন্ত কঠোর পাহাড়ায় দিল্লির উদ্দেশ্যে পাঠানো হতো।আওরংজেবের পর এই পদ্ধতির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কারণ ক্রমাগত উত্তরাধিকার যুদ্ধ ।মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলের শেষভাগে খাজনা শ্রফ বা ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানো শুরু হয়।ব্যাংকারদের মাধ্যমে টাকা পাঠানোয় তছরুওএর ঝুঁকি ও অনেকটাই কমে।যদিও একসময় বিলের মাধ্যমে রাজস্ব প্রদান জমিদার বা সরকার উভয়ের মধ্যে অসুবিধার কারন হয়।জমিদাররা সারা বছর ব্যাংকারদের কাছে ঋনী থাকতো।ফলে উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।সম্রাজ্যের শেষ বছরগুলোতে প্রথাগত নির্ধারিত পদ্ধতিতে তৈরি মানসম্মত রুপার প্রকৃত সিক্কার বিপরীতে জগৎ শেঠ বাট্টা ও আগিও প্রথা চালু করেন।ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুবা বাংলার সর্বময় রাজনৈতিক ক্ষমতা অধিকার করার পর নবাবের ঋন গ্রহনের ক্ষমতা খর্ব হয়,কোম্পানির কর্মচারী ও তাদের গোমস্তা জমিদার, কৃষক ও রায়তদের শ্রফের দায়িত্ব পালন করতে থাকে,কোম্পানির কর্মচারী ও তাদের গোমস্তা জমিদার, কৃষক ও রায়তদের শ্রফের দায়িত্ব পালন করে থাকে।জগৎ শেঠের বিলের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি বাতিল করে দেওয়া হয় ও রাজস্ব নগদ অর্থে দেয়া শুরু হয়।রেজা খানের প্রস্তাব অনুযায়ী সিলেক্ট কমিটি কর্মচারীদের জমিদারদের জমির বিনিময়ে ঋন প্রদান অথবা ইজারা, বন্ধক নেয়া নিষিদ্ধ করে দেয়।এ ছাড়াও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারই দফতরগুলোতে প্রভাব বিস্তার নিষিদ্ধ করা হয়।রেজা খানের প্রস্তাব অনুযায়ী ব্যাংকের মাধ্যমে খাজনা দেয়া পুনরায় শুরু হয়।রাজস্ব ব্যবস্থা ও জমিদারী তত্ত্বাবধানের জন্য বড় জমিদারিগুলোকে কয়েকটি পরগনা,ডিহিতে ভাগ হয়।প্রতিটি ডিহি কয়েকশত গ্রাম নিয়ে তৈরি হতো।জমিদারির রাজস্ব সংগ্রহ কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনা মূলত সদর কাছারি থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো।কাছারির প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন দেওয়ান।

এছাড়া মুন্সি,আমিন,সুর,বক্সী,উকিল,মৃধা অন্যান্য কর্মচারীরা থাকতেন।বড় জমিদাররা নিজস্ব উকিলের বাইরেও উকিল রাখতেন।জমিদারীতে দু ধরনের কর্মচারীর হিসাব পাওয়া যায়- প্রধান কাছাড়িতে কর্মরতদের হুজুরী বলা হতো আর মফস্বল কাচাড়িতে কর্মরতরা এলাকার কাজ কাজ দেখত৷

হুজুরি বা সদর প্রশাসন নয় ভাগে বিভক্তঃ

১/মালখানাঃ যেখানে রাজস্ব বিষয় দেখা তো,নথি সংরক্ষণ করা হতো।

২/নিকাশী দফতরঃ যেখানে হিসাব পরীক্ষা ও বিন্যস্ত করা হতো।

৩/দেউড়ী দফতরঃ জমির ভাড়া পৃথকভাবে সংরক্ষণ এর জায়গা।

৪/তোশাখানাঃ পোশাক পরিচ্ছেদ সংরক্ষণ ও সরবরাহ।

৫/ শিলাখানাঃ অস্ত্র,অলংকার,অর্থ ভান্ডার।

৬/নিয়ামত কারখানাঃ ধর্মীয়সহ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা দ্রব্যাদি।

৭/সোহাবত নামের দপ্তর ধর্মীয় কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বেতনের ব্যবস্থা করতেন।

বড় পরগনা বা ডিহিগুলোর অধিকাংশ দায়িত্ব স্থানীয় কিছু কর্মচারীর হাতে দেয়া থাকতো। পাতি জমিদাররা নিজেরাই সব করতো।

মফস্বলের বিভিন্ন এলাকা দেখাশোনার জন্য দুই ধরনের কর্মচারী ছিল।পরগনাতে মুকাররারী ও অন্যান্য স্থানে ও অন্য স্থানে মফস্বলী নামক কর্মচারীকে দায়িত্ব প্রদান করা হতো।পাতি জমিদারদের কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা ছিল না।জমিদাররা নিজেই এসব বিষয় দেখাশোনা করতেন। ১৭৮৮ সালে কালেক্টর হাচ দিনাজপুর থেকে মন্তব্য করেন-
“The original jumma or Rentroll has decreased several causes,the chief of which is the manoeuvre that has been in practice for many years, by the mundulls Promaniks and principal inhabitants of the villagers who under the plea of real, or fictitious desertion of the riauts,have got into their possession,considareble tracts of ground at an under rated assessment upon Moocta Potta,and the original established rate or nirk,has become almost obsolete.

নায়েব, গোমস্তারা সর্বাংশে নীতিহীন ছিলেন।যখন কোন জমিদার খেলাপী হয়ে জমিদারীর অংশ বিক্রি করতো, তখন এইসব আমলারা ছদ্ম পরিচয়ে বিভিন্ন অংশ কিনে নিত।শাহবাজপুরের জমিদার তাজ ই খুদাদাদ সঠিকভাবে চিত্রিত করেছেন-

“Kishn Ram, the writer’s naib,has with the most fraudulent intcnitions,bestowed large parcel of land in this parganah on his relation amd adherents,and does not listen to his inhibitor.Besides, has has sold four houses in Jahangirnagar and possessed himself of the money.He has also borrowed large sums oon bonds forged in the writers name and accepted the ‘uhdahhari of the parganah Idyelpur which is situated in another zamindari,without his consent or knowledge. These are the writer’s reason for displacing his Kishn Ram Sundar.”

তালুকদারের প্রচলনের ফলে দেশের কৃষি সমাজের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।কাটনিকাদার বা তালুকদার সহ জমিদাররা জমির অবমূল্যায়ন দেখিয়ে সুবিধা আদায় করতো।তালুকদাররা সাধারণ রায়ত অপেক্ষা অধিক সুবিধা ভোগ করতো।

The tenants of a talook are possessed of so many indulgence and taxed with such evident partiality in proportion to the rest,that the talooks genenrally swarm with inhabitant where other parts are deserted

কানুনগো দফতর জমিদারের ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত বিষয় খোঁজ খবর রাখতো। ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে জমিদারীতে কানুনগো ও ফৌজদারদের গুরুত্ব ও ক্ষমতা কমতে থাকে।বড় বড় জমিদারিগুলোকে বিভিন্ন ডিহিতে ভাগ করায় ফৌজদারদের ক্ষমতা কমে যায়। নায়েব সুবার মন্তব্য থেকে জানা যায়,

The zamindar in the Circas of Cochbchar and Chuklaw of Rajemehal,and the district oof Purnea,where is it has long been usual for Phousdar to be stationed,contrary to the practice of the zamindars of Bhettoreah,Nudea,Bishenporore,Birbhoom and Isoufpur can not be themselves without the permission of the Phousdar undertake any measure.”

বড় জমিদারির দায়িত্ব সম্পর্কে রেজা খান লিখেছেনঃ

“As Rajeshahy,Bhettoreah,Dinajpore,Nuddeah,
Isoopporc Beshnpore were extensive and important zamindaries,the papers of the Tucsem dependent on the Suddur and it is not usual for the canongoe gomasthas to attend the zamindar and furnish them with papers,there are however some of their mahorers statiomed in their district to collect the tucsemy and other accounts.”

দিওয়ানি অঞ্চল সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে রেজা খান জমির আনুমানিক মূল্যের উপর নির্ভর করে একটি নতুন খাজনা তালিকা তৈরি করেছিলেন।মীর জাফর ও কাসিম যে ব্যবস্থা করেছিলেন তা অপেক্ষা বন্দোবস্ত এর হার কম ছিল।তৎকালীন প্রচলিত কর সংগ্রহ ব্যবস্থা মূলনিতির উপর নিযুক্ত হলেও কিছু নতুন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল।কোম্পানি সময়মত কর সংগ্রহ করে প্রত্যেক জমিদারকে নিজস্ব রক্ষীবাহিনী রাখা আবশ্যক করেছিল।উচ্চ কর নির্ধারণ বাতিল করা হয়েছিল এবং তার পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন জিনিসের উপর ছোট ছোট করে আলাদা কর দেয়া শুরু হয়েছিল।
জমিদারদের নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা নিয়ে যেসব পরিদর্শক নিযুক্ত হয়েছিল তাদের উপর জমিদারদের বিদ্বেষ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।অধিকাংশ জমিদার কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় যদি না এসব পরিদর্শক দের হাত থেকে নিষ্কৃতি দেয়া না হয়।জমিদাররা এ ব্যাপারে লিখিত নিশ্চয়তা নিয়ে তারপর শান্ত হয়। জমিদারদের বিরোধিতা সত্ত্বেও পরিদর্শকরা তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।কাউকে কর বকেয়া রাখার সুযোগ দেয়া হয় নি।

যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দিওয়ানি লাভ করলো তখন বাংলার তখন বাংলার কর প্রশাসন ব্যাপক অপব্যবহার দ্বারা আক্রান্ত ছিল।নবাবদের অযোগ্যতা ও তাদের কর্মচারী ও জমিদারদের লোভ এর জন্য দায়ী।কোম্পানি বুঝতে পেরেছিল কর সংগ্রহ ব্যবস্থায় সরাসরি অংশগ্রহণ না করলে দিওয়ানি ব্যবসার মৃত্যু ঘটবে৷রেজা খান ও সেতাব রায় কোম্পানির পক্ষ থেকে যথাক্রমে বাংলা ও বিহারের নায়েব, দিওয়ান হিসেবে কাজ করছিলেন।মির কাশিম কানুনগোদের প্রদত্ত তথ্য প্রায় পুরোপুরি অবজ্ঞা করতেন।বাদশাহী শাসনের ক্রমবর্ধমান দূর্বলতার সুযোগে সুবার প্রশাসনের অস্থিতিশীলতা ব্যাপক আকার ধারণ করে।মেদিনীপুর জেলার দাংগাবাজ চরিত্রের কারণে কর সমস্যার সমাধান করে সব ঠিক করা ছিল অত্যধিক দুরুহ।১৭৬৯-৭০ সালে দুর্ভিক্ষ রায়তদের সসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক জীবনকে অসংলগ্ন করেছিল এবং এয়াজস্ব প্রশাসনকে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃংখলায় পরিণত করেছিল।সামষ্টিকভাবে সমর্পিত ও দেওয়ানি জেলাগুলোর আসল জমার মানসম্পন্ন হার যৌক্তিকভাবে সহনীয় পর্যায়ে পরিবর্তিত হয়েছিল, যদিও কোম্পানির লক্ষ্য ছিল সম্পূর্নভাবে জমিদারির সম্পদমূল্য নিরুপন করা তথাপি তা সম্ভব হয়নি।

তথ্যসূত্রঃ

1.সুবে বাংলার জমিদার ও জমিদারি(১৭০৭-৭২),শিরিন আখতার,দিব্য প্রকাশ,ঢাকা,২০১৮,(পৃষ্ঠাঃ১৯-২১,৫১-৭৩,)

  1. The Central Administration of East India company, B.B Misra,NewDelhi,(page:164)
  2. বাংগালার জমিদার,শ্রীবামাচরন মজুমদার, দিব্য প্রকাশ, ঢাকা,(পৃষ্ঠাঃ২০,২১,৬৫,৬৬)
  3. বাংলার জমিদার ও রায়তের কথা,কমল চৌধুরী,দেজ পাবলিশিং,কলকাতা,(পৃষ্ঠাঃ৪৭০,৭১)