ঠাকুরবাড়ির বৃক্ষচর্চা – আল হাসান

জোড়াসাকোঁর ঠাকুরবাড়ি। অসংখ্য ঘর,মহল,বিশাল বাগান জুড়ে পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা এক ইতিহাস।ম্যাকিন্টন বার্ন কোম্পানির দ্বারা গড়া এই বাড়ি।বর্ধমানরাজ মহাতাবচাঁদ এই বাড়ি ও বাগান দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে একই শৈলীতে গড়েছিলেন বর্ধমানের মহতাবমঞ্জিল।দ্বারকানাথ ঠাকুরের সাথে বর্ধমানরাজ মহাতাবচাঁদ এর ছিল দুর্দান্ত সম্পর্ক।ঠাকুরবাড়ির প্রধান মালিকেও তিনি বর্ধমানে নিয়ে গিয়েছিলেন তার গোলাপবাগকে আরো সুন্দর করে গড়ার জন্য।

৬ নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন।দ্বারকানাথের পর কর্তা দেবেন্দ্রনাথ।মূল ভবন ও বৈঠকখানার বাড়ি মিলে দুই বাড়ি হলেও প্রবেশপথ এক।প্রধান ফটকের সামনে বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া নিমগাছ।গাছটি লাগিয়েছিলেন দিগম্বরী দেবী।তার কোটরে টুন্টুনির বাসা।অন্য পাশে গোলাপচাঁপা গাছ।ফুল ফুটিয়ে চোখ টানত সবার। নহবতখানার নিচে পুরনো কুয়ো।কুয়োর পাশে বিশাল সবজিবাগান।বাগানের এক কোনে দাঁড়িয়ে ছিল তেতুঁলগাছ।এটা নাকি লাগিয়েছিলেন দ্বারকানাথের মা।এর মোটা ডালে বাড়ির সব ছেলেপুলে খেলাধুলো করেছে।এ গাছের নিচেই ছিরু মেথরের ঘর। সেই রামলোচন ঠাকুরের সময় থেকে তিন পুরুষ ধরে আছে।তাদের ঘরের পেছনে বাড়ির পাচিল।পেছনে সারি ধরে কয়েকটি বাদাম গাছ।বাদাম গাছ থেকে পাতবাদাম সংগ্রহ করা হতো।

দ্বারকানাথের মধ্যম পুত্র গিরীন্দ্রনাথের ছিল বাগানের সখ।তার এই সখ পরবর্তীতে উত্তরসূরীরাও পেয়েছিল।দার্জিলিং থেকে আঙুর,পিচ ফলের গাছ এনে লাগিয়েছিলেন। আরো ছিল লেবু,চম্পা,চামেলি,জুঁই,
বেলি,টগর,হাসনাহেনা অসংখ্য প্রজাতির গোলাপ।

সত্যেন্দ্রনাথ ‘আমার বাল্যকথা বইতে লিখেছেন,”এই বাগানে ছোটজাতের অনেকগুলো জুঁইগাছ ছিল।রোজ বিকেলে রাশি রাশি জুঁই ফুল তারা কুড়িয়ে আনতেন।নানারকম ফুলের গন্ধে সর্বদা মুখরিত থাকতো এই বাগানটি।মেঝ কাকার বাগান বিলাস পেয়েছিলেন তাঁর ছোট ছেলে গুণেন্দ্রনাথ।গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বাগান ছিল বাড়িতে। সবাই বলতো শখে বাগান।গুনেন্দ্রনাথ নিলামে দেশি বিদেশি প্রচুর দুষ্প্রাপ্য গাছ কিনেছিলেন। গুনেন্দ্রনাথের বন্ধু বৈকুন্ঠবাবু একবার ছোটলাট রিচার্ড টেম্পলের সাথে নিলামে জিতে কেনেন একটা গাছ।সেটি বৈকুন্ঠবাবু গুনেন্দ্রনাথকে উপহার দেন।জোড়াসাকোর বাড়িতে সে গাছ গেছে শুনেই ছোটলাটের চাপরাশি এসে হাজির।তাতে লেখা তার নাকি গুনেন্দ্রনাথের বাগান দেখতে ইচ্ছে করছে।গুনেন্দ্রনাথ বুঝলেন গাছটা চাই ছোটলাটের।ঘোড়ায় চড়ে এলেন তিনি,বাগান ঘুরে দেখলেন,খেলেন যাবার সময় গাছটি বগলদাবা করে নিয়ে গেলেন।সেসময় কোলকাতা শহরে উদ্ভিদবিজ্ঞানের উপর সবচেয়ে বেশি বই সংগ্রহে ছিল গুনেন্দ্রনাথের। গাছ সম্পর্কে দুষ্প্রাপ্য একটি বই তার সংগ্রহে ছিল। চামড়ায় মোড়া,সোনার জলে বাঁধানো।তিনি বাড়ির নিচতলা থেকে তিনতলা সর্বত্র ফুলে ফুলে সাজিয়ে তুলেছিলেন।তার শোবার ঘরের পূর্বদিকে অক্ষয় সাহাকে দিয়ে তৈরি করেছিলেন গাছঘর।ঘরের দেয়ালগুলো তে লাগানো ছিল চিতাবাঘ,হরিণের ছাল৷আর মেঝেসহ অন্য অংশে গাছের ছাল দিয়ে মুড়ে তার উপর দামি বিলেতি পরগাছা লাগিয়ে দিয়েছিল ভাগবত মালি।ভাগমত মালির কল্যানে গুনেন্দ্রনাথের বাগানের প্রতিটি পাতা ঝকমক করতো।ভাগবত মালী তার এলাকা থেকে কয়েকটি করবী গাছ এনে লাগিয়েছিলেন বাবুর বাগানে।একবার এক হর্টিকালচারের সাহেব গুনেন্দ্রনাথকে বললেন,এ দেশের মাটিতে কখনো টিউলিপ ফুল ফুটবে না৷গুনেন্দ্রনাথ চ্যালেঞ্জ করলেন, সে ফুল ফোটাবেই।যেই বলা সেই কাজ।বিলেত থেকে আসলো টিউলিপের কলম।নানারকম সার দিয়ে কাঁচঢাকা দিলেন তার ওপরে।বই থেকে চিত্রগুলো দেখিয়ে ভাগবতকে বুঝিয়ে দিলেন পরিচর্যা পদ্ধতি।ফুল ফুটলো গাছে৷দৌড়ে এলেন সাহেব।সাহেবের ইচ্ছাতেই ভাগবতমালী কোলকাতায় প্রথম হওয়া হর্টিকালচার প্রদর্শনীতে নিয়ে গেলেন।সোনার মেডেল পেলেন গুনেন্দ্রনাথ।সেই সোনার মেডেল গুনেন্দ্রনাথ ভাগবতমালীকেই উপহার দিলেন।বাকি জীবন ভাগবত বাবুর বাগানের সেবা করেই কাটিয়ে দিয়েছেন।ভাগবতমালীর দাপটে বাগানে পোলাপান ঢুকতে পারতো না।অবনীন্দ্রনাথ বাগানের এক কোণে মাটি খুঁড়ে সেখানে গামলা বসিয়ে টিনের হাঁস ছেড়ে দিয়েছিলেন।চুম্বকের টানে চলত সেই হাঁস।

গগনেন্দ্র,সমরেন্দ্র,অবনীন্দ্র তিন ভাই এই দক্ষিনের বাগানের সামনেই থাকা দক্ষিণের বারান্দায় বসে তৈরি করেছেন আরেক ইতিহাস।দেশ বিদেশ থেকে শত শত জ্ঞানীগুনী মানুষ আসতেন তাদের কাছে।বাগানের সীমানায় ছিল সারি ধরে নারকেল, আম গাছ।অসংখ্য গাছে জংগলের ভেতর ও আলাদা করে দেখা যেত ভাগবত মালির লাগানো সেই করবীগাছগুলো। ভাগবত মালী গত হয়েছিলেন বহু আগে।পরবর্তীতে অবনীদ্রে সেই করবী গাছ দেখে ভাগবতমালীর কথা স্মৃতিচারণ করতেন।অবনীন্দ্রনাথের সময়ে ছিল সেই গাছঘর।নাতিদের সাথে সে বিকালে সেখানেই সময় কাটাতেন।বাড়ির ভেতরে ছিল বাঁধানো চাতাল।সেখানে ছিল সিমলা থেকে আনা বাতাবি লেবু,বিলিতি আমড়া গাছ।শিশু রবীর চোখে ছিল তা স্বর্গ বাগান।হেমন্তের শিশিরমাখা ভোরে সেই চাতালেই এসে বসতেন শিশু রবীন্দ্রনাথ।শৈশবে সেখানে আতার বীজ ও বুনেছিলেন তিনি।রোজ নিয়ম করে তাতে পানি দিতেন।বাড়িতে ছিল পুরনো ঘাটবাঁধা পুকুর।তার পুবধারে ছিল বিরাট বটগাছ।জীবনস্মৃতিতে আচগে সে গাছের কথা।বাড়ির চাকরেরা সে গাছে দৈত্যি আছে বলএ ভয় দেখাতেন।দক্ষিনে নারিকেল গাছের সারি পুকুরকে আগলে রেখেছিল।

পাঁচ নম্বর বাড়িতে গুণেন্দ্রনাথ গটে তুলেছিলেন নন্দনকানন অপরদিকে মহর্ষি ভবনে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও কাদম্বরীদেবী।তিনতলআর ছাদে লাগিয়েছেন চামেলি,গন্ধরাজ,রজনীগন্ধা,করবী,
দোলনচাঁপা ফুল।আর ছিল প্রচুর পাখি।ছাদের পাশের ঘরেই ছিল পিয়ানো।সেই নন্দনকাননেই বসতো জ্যোতিদাদার সাহিত্য অাসর।রবীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠার বীজটি বুনেছিল এখানেই। সেই বীজ একদিন বিশাল মহীরুহ হয়ে সমগ্র বাংলাকে যেন আজো ছায়া দিয়ে চলেছে৷

তথ্যসূত্রঃ

১/ঠাকুরবাড়ির ভৃত্যমহল ও অন্যান্য,শান্তা শ্রীমানী,পত্রলেখা প্রকাশন,কোলকাতা,২০১৯, (পৃষ্ঠাঃ৩৭,৩৮)

২/ঠাকুরবাড়ির জানা অজানা,সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দে’জ পাবলিকেশন্স, কোলকাতা, (পৃষ্ঠাঃ৬১,১০৯)

৩/ ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়,জসীমউদ্দিন,পলাশ প্রকাশনী,কোলকাতা।