ইরান থেকে আসা ভগবানের দূত, পাল্টে দিয়েছিল কাশ্মীরের সংস্কৃতির ইতিহাস
কলমে : স্বাগতা মন্ডল
সুফিইজম নিয়ে ভারতভূমিতে চালু ধারণা হলো ওরা দারুণ কালচারাল। ঈশ্বরের গান গায়, অনেকটা আমাদের বাউল কি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতো। সুফিদের খানকাহ, মাজারের ইতিহাস, নিজামুদ্দিন আউলিয়ার ইতিহাস খোদাই করা আছে ভারতের মাটিতে। ইতিহাস কখনো মিথ্যে বলে না। মন্দির মসজিদের দেওয়ালে দেওয়ালে ইতিহাস তার ছাপ রেখে যায়। প্রোপাগান্ডা মেশিনারি যতই ভুল বোঝানোর চেষ্টা করুক ইতিহাসকে মুছে ফেলা মুশকিল।
সুদূর পারস্যের একটি গ্রাম ছিল আরাক। বর্তমান ইরানের একটি শহর সেটি। সেই আরাক গ্রামের শামসুদ্দিন আরাকি কাশ্মীরের ইতিহাসকে পাল্টে দেওয়ার কৃতিত্বের(!) দাবিদার বারোজন সুফির অন্যতম। ইতিহাসকে নিজের ইচ্ছেয় লিখি এত সাহস আমার মতো নগণ্য মানুষের নেই। আরাকির কীর্তিকলাপ গ্রন্থিত করে গেছে তারই শিষ্য মুহাম্মদ আলী কাশ্মীরি। তোহাফত-উল-আহবাব শিরোনামাঙ্কিত জীবনীতেই সুদূর ইরানের এক মানুষ ভারতের মাটিতে কি ছাপ রেখে গেছিল তার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছিল তারই শিষ্য। এছাড়া বাহরিস্তান-ই-শাহী ও তারিখ-ই-কাশ্মীর নামক দুটি ফার্সি দিনপঞ্জীতেও আরাকির কান্ডকারখানা লিপিবদ্ধ আছে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে, কাশ্মীরে কাশ্মীরি পন্ডিত ছাড়া অন্য বর্ণের হিন্দু নেই কেন? কি হয়েছিল তাদের? ললিতাদিত্যর কাশ্মীর, কলহনের কাশ্মীরে হিন্দু ও বৌদ্ধদের কি হলো? কি হলো লেখা আছে এইসব বহিরাগত ধ্বংসকারীদের রচিত ইতিহাসেই। অন্য ভারতীয়র লেখা ইতিহাস এখানে উল্লেখই করছি না। আরাকির কীর্তিকলাপ একটি ফেসবুক পোস্টে দেওয়া সম্ভব নয়। আমি মূল কুকর্মর বিবরণ দিলাম, ওরই শিষ্য ও ওর দেশের মানুষের রচিত ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে।
আরাকির জন্ম 1424 সালে। হীরাটের তৈমুরি শাসক মির্জা বায়াকারার রাজসভার পদে ছিল 1470 থেকে 1505 সাল অবধি। কথিত আছে মির্জা বায়াকারা অসুস্থ হয়ে পড়লে ওষুধের খোঁজে আরাকি কাশ্মীরে আসে। এত জায়গা ছেড়ে কাশ্মীর কেন? সারদা পীঠে যে ভারতীয় বিজ্ঞানের চর্চা হতো, সারা বিশ্বে তা প্রসিদ্ধ ছিল। ওষুধের খোঁজে এসে আরাকির ধোলাই হওয়া মগজ কাজ করা শুরু করে। কাশ্মীরে সবাই মূর্তিপূজক হিন্দু। এরা কিকরে এত জ্ঞানের অধিকারী হয়? আরাকি ছিল নূরবক্সীয় সুফি। কাশ্মীরে তাদের অস্তিত্ব ছিল না। আরাকি প্রথমে এসে তৎকালীন কাশ্মীরে প্রতিষ্ঠিত হামাদানি সুফি বলে নিজেকে দাবী করে। আরাকি নিজেকে ‘খোদার দূত’ বলে দাবী করে ধর্মান্তরকরণ শুরু করে। প্রথমে গিলগিট বাল্টিস্থানের চাক চান বৌদ্ধদের ছলে বলে কৌশলে ধর্মান্তরকরণ করে। তার জীবনীকার ও শিষ্যর লেখায় বলা আছে, ‘ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে তার চেয়ে বেশি মূর্তি ও মন্দির কেউ ধ্বংস করেনি। কোনো সুলতান, পাদশাহ, কোনো রাজ্যশাসক এই গৌরব দাবী করতে পারে না’।
১)হরি পর্বত
২)চামুন্ডি মন্দির
৩)মামলেশ্বর(মহাসেন) মন্দির
৪)ভার্বল ভূতেশ্বর মন্দির
৫)নন্দকেশ্বর মন্দির
৬)বোমার
৭)কামরাজ
৮)উত্তরেশ্বর
৯)বাদাকোট
১০)কুবিরেশ্বর
১১)সাত্তল
১২)পানেহ রেনু
১৩)ভীম স্বামী
১৪)বাখি রেনু
১৫)মানেক রেনু
১৬)ভেতালুন
১৭)তাসওয়ান
১৮)ডাল লেকের মধ্যে উদেরনাথ
১৯)সাদাসমোলো
২০)মদ রেনু
২১)জোয়ালামুখী
২২)সোনওয়ার
২৩)বৈজনাথ
২৪)ভেরিনাগ
ও আরও পঞ্চাশটি বড় মন্দির ধ্বংস করে। ছোট মন্দিরের সীমা সংখ্যা ছিল না।
এছাড়া আরাকির আদেশে ২৪০০০ হিন্দু পরিবার ধর্মান্তরিত হয়। অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠলে পন্ডিত নির্মল কান্তের নেতৃত্বে হিন্দুরা উজির মুসা রায়নার কাছে পরিস্থিতির সুরাহার জন্য আবেদন করেন। যে দলটি গিয়েছিলেন তাদের কারাবন্দী করা হয় ও আমৃত্যু না খাইয়ে রাখা হয়। জোর করে সার^কাম^সিজন করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প তৈরি হয়। যে সব হিন্দু প্রতিরোধ করে তাদের জোর করে গোমাংস ভক্ষণ করানো হয়।
এরপরে কাজী চাক নামক নতুন শিয়া উজিরের অত্যাচারে ঘর ছাড়ে প্রচুর কাশ্মীরি হিন্দু। চাকের শাসনকালে হিন্দুদের ট্যাক্স ছিল ৪০টি মূল্যবান রত্ন প্রতি হিন্দু। প্রতিদিন ৯০০ হিন্দুকে কতল করা হতো। ১০০০ গোধন জোরপূর্বক হত্যা হতো প্রতিদিন।
এইসব ধ্বংস হওয়া মন্দির দিয়ে কি হয়েছিল? ইতিহাস লেখা আছে মাজারে, দরগায়, পাথরে পাথরে।
প্রোপাগান্ডা ইতিহাসবিদরা ভয় পেতে শুরু করুন এবার। যা এতোদিন শাক দিয়ে ঢাকা দুর্গন্ধ মাছের মতো ছিল, খুব কম মানুষ জানতেন, বিবেক অগ্নিহোত্রী সেই আরাকিকে সবার সামনে তুলে এনেছেন। যে ইতিহাস মিথ্যে নয়। যে ইতিহাস এরপর হয়তো আর লুকোনো যাবে না। প্রশ্ন কিন্তু উঠতে শুরু করেছে। কেন সারদা পীঠের ধারকরা নিজের জন্মভূমি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হলেন। এক যুগ নয় তো বহু বছরের ইতিহাস। কেন নিজেদের নারীদের নাক কেটে নিজের আত্মীয়রা কুৎসিত করে রাখতেন, যাতে খানকাহর অত্যাচার সহ্য করতে না হয়, গিরিজা টিক্কুর মতো অবস্থা না হয় সেই ইতিহাস বাইরে আসতে শুরু করেছে। এরপরও সত্যি লুকোতে চাইলে কোনও কথাই কেউ বিশ্বাস করবে না।
তথ্যসূত্র:
1)Tohafut-Ul-Ahbab trans.. by Kasinath Pandita pp.233
2)Ibid pp.281
3)Rajatarangini(3.460)
4)Mark Aurel Stein, Rajatarangini(3.460)
5)Mark Aurel Stein, Rajatarangini(Book 2,Page 447)
6)Tohafut-Ul-Ahbab trans.. by Kasinath Pandita pp.218
7)Ibid PP.219
8)Ibid PP.220
9)Kalhana’s Rajaratangini(1.121)
10)Mark Aurel Stein, Rajatarangini(1.1.107)
11)Tohafut-Ul-Ahbab trans.. by Kasinath Pandita pp.221
12)Ibid PP.221
13)Wail of the Valley PP.31
14)Tohafut-Ul-Ahbab trans.. by Kasinath Pandita pp.226
15)Ibid PP.227
16)Ibid PP.242
17)Ibid PP.251
18)Ibid PP.255
19)Ibid PP.269
20)Ibid PP.277
21)Ibid PP.196
22)Ibid pp.197