শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও পদাবলীর রাধার তুলনামূলক আলোচনা

কলমে – নম্রতা বিশ্বাস, এম.এ, বি.এড


বড়ু চণ্ডীদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বৈষ্ণব পদকর্তাদের রচিত পদাবলী উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায় রাধা – কৃষ্ণের প্রেম বিষয়ক কাহিনীকে অবলম্বন করে পদ রচিত হয়েছে। কিন্তু রাধা কৃষ্ণের এই মিলন বিরহ কথা ছাড়া ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’- এর সঙ্গে বৈষ্ণব পদাবলীর পার্থক্য বহু অংশে লক্ষ করা যায় – ভাবে, ভাষায়, রচনারীতিতে এবং চরিত্র বিন্যাসে।

    শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য পড়ে দেখা যায় এটি একজন কবির রচিত কাব্য এবং অন্যদিকে বৈষ্ণবপদাবলী অনেক কবিদের রচিত পদের সমন্বয়ে গঠিত পদের নিদর্শন।
দেশ কাল সময়ের প্রেক্ষিতে এই দুই ধরনের রচনায় স্বতন্ত্রতা লক্ষ করা যায়। বড়ু চণ্ডীদাস যে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য  রচনা করেছেন, সেটি চৈতন্য পূর্ববর্তী কালের রচনা। অন্যদিকে পদাবলী সাহিত্যে প্রাক চৈতন্য ও চৈতন্য উত্তর যুগের ভিন্ন ভিন্ন কবির সৃষ্টি।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাহিনী কাব্য এটি মহাকাব্যের আকারে গৃহীত এবং তদনুসারেই বিবৃত করা হয়েছে কিন্তু বৈষ্ণবপদাবলী ঠিক কাহিনি কাব্য নয় এটিকে খণ্ডকবিতা বলা যায়, অনেকটা গীতিকবিতার মতো।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটিতে উক্তি প্রত্যুক্তির মধ্য দিয়ে কাহিনি অগ্রসর হতে দেখা যায়, যে তিন জন চরিত্র আলোচ্য কাব্যটিতে অধিক পরিমাণে স্থান দখল করে নিয়েছেন তাঁরা হলেন কৃষ্ণ, রাধা ও বড়াই, এদের উক্তি ও প্রত্যুক্তির মধ্য দিয়েই ঘটনা অগ্রসর হতে দেখা যায়। কিন্তু বৈষ্ণবপদাবলীতে কোথাও কোনো উক্তি ও প্রত্যুক্তির উল্লেখ নেই। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন যেখানে নাট্যগীতি সেখানে পদাবলীতে নাটকের ভাবটুকুও লক্ষ করা যায় না।

    ■ ছন্দ অলংকার ও কারুনির্মিত বিচারে বৈষ্ণবপদাবলী মধ্যযুগের যেমন সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা অন্য দিকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ছন্দ তার তুলনায় অনেক দুর্বল।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষা আদি মধ্যযুগের বাংলা ভাষার একমাত্র নিদর্শন ফলে অনেক ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয় অন্যদিকে বৈষ্ণবপদাবলীর ভাষা প্রাঞ্জল, সরল ও উৎকৃষ্ট ভাবের সমর্থ প্রকাশক ফলে ভাষা গৌরবে পদাবলীর সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের তুলনাই চলে না।

  ■ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বৈষ্ণবপদাবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দুটির উপস্থাপন কৌশল পুরোপুরি ভিন্ন। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের প্রথমেই ‘জন্ম খণ্ড’ -এর উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে উল্লেখিতই আছে রাধার জন্মই হয়েছে কৃষ্ণের ‘সম্ভোগ কারণে’, ফলে সারা কাব্য জুড়ে দেখা যায় কৃষ্ণ ছলে বলে কৌশলে রাধাকে ঘিরে দৈহিক ক্ষুধা নিবৃত্তি করেছে কিন্তু বৈষ্ণবপদাবলীতে কোথাও লক্ষ করা যায় না রাধার প্রতি কৃষ্ণের অশালীন আচরণ, বল প্রয়োগের বিষয়ও লক্ষ করা যায় না। এইখানে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বৈষ্ণবপদাবলীর মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য লক্ষ করা যায়।

   ■ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটিকে ঘটনা কাব্য বলা যায়। এখানে কাহিনি, চরিত্র ও ঘটনার প্রাধান্য লক্ষ করা যায়, এখানের চরিত্রগুলির মধ্যে নানান মানসিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া দেখা যায় কিন্তু পদাবলী ভাবমূলক যেহেতু, ফলে এখানে কাহিনী গৌণ। এখানে কবিদের মুখ্য কর্মই ছিল ভাব অনুযায়ী রস প্রকাশ করা, ফলে বৈষ্ণবপদাবলী গীতিরসপ্রধান কাব্য।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যকে ‘ধামালী কাব্য’ বলা হয়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে গ্রাম্য প্রেমের কাহিনী চিত্রিত হয়েছে। উক্ত কাব্যে এক পাষন্ড, উদ্ধত, বাক্যসর্বস্ব ও নারীত্ব ছিনতাইকারী গোপযুবকের কাছে এক অসহায় বালিকার অত্যাচারের দৃশ্য ফুটে উঠেছে। প্রথম দিকে কৃষ্ণের দেহাকাঙ্ক্ষা ও শেষের দিকে রাধার দেহাকাঙ্ক্ষা এই সকল বস্তু লক্ষ করা যায়, পদাবলী হল স্বর্গীয় প্রেমের মধু আস্বাদ, স্বয়ং চৈতন্য দেব বৈষ্ণবপদাবলী অযুতবার আস্বাদন করে আনন্দিত হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধাকে যেখানে দেখা যায় কৃষ্ণের নাম শুনে ঘৃণায় অবজ্ঞায় ফেটে পড়েছে, সেখানে বৈষ্ণবপদাবলীর রাধাকে দেখা যায় অস্ফুট আবেগে বলে উঠেছে –
“জপিতে জপিতে নাম অবশ করল গো কেমনে পাইব সই তারে।”

    ■ চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বৈষ্ণবপদাবলীতে পার্থক্য লক্ষ করা যায়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কৃষ্ণ যেখানে উদ্ধত, লম্পট, ধাপ্পাবাজ ও বিশ্বাসঘাতক, বাগাড়ম্বরকারী। সেখানে বৈষ্ণবপদাবলীর কৃষ্ণের মধ্যে এইসকল বস্তু অনুপস্থিত। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে দেখা যায় কৃষ্ণ রাধার রূপ বর্ণনা শুনে তাঁকে সম্ভোগ করতে চায় সেখানে বৈষ্ণবপদাবলীতে রাধার রূপ বর্ণনা শুনে কৃষ্ণকে বলতে শোনা যায় –
“রূপ কে চিনিতে পারে। জুড়ায় কেবল নয়নযুগল চিনিতে নারিনু কে।”
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে দেখা যায় যেখানে দূতীর উল্লেখ আছে। বড়াইকে কবি রাধার সখী দূতী ও অভিভাবিকা ও কুট্টিনী রূপে প্রকাশ করেছেন আলোচ্য কাব্যে। অন্যদিকে বৈষ্ণবপদাবলীতে কোনো রকম দূতীর উল্লেখ পাওয়া যায় না।
এই সকল বিষয়ের পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বৈষ্ণবপদাবলীর রাধা চরিত্রের যদি তুলনা করা হয় তো দেখা যায় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রাধা গ্রাম্যবালিকা, এখানে রাধাকে দেখা যায় হাটে পসরা বিক্রি করতে, পদাবলীতে এই রকম কোনো বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধাকে পিতৃকুল ও স্বামীকুল নিয়ে গর্ব বোধ করতে দেখা যায়, বৈষ্ণবপদাবলীতে এই রকম কোনো বিষয় লক্ষ করা যায় না। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে দেখা যায় রাধা কৃষ্ণের প্রেরিত উপহার ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন এবং দূতী বড়াইকে চড় মারতেও দ্বিধাবোধ করে না। বলাৎকারে উদ্যত কৃষ্ণকে নানা ভাবে নিস্তার করতে চেষ্টা করে, কৃষ্ণের ঈশ্বরত্বতেও তাঁর তেমন বিশ্বাস নেই। শেষ পর্যন্ত ভীত অসহায় রাধা নিজের প্রাণের ভয়ে কৃষ্ণের মতো পাষণ্ডকে দেহদান করে। পরবর্তীতে কাব্যে দেখা যায় কৃষ্ণ রাধাকে ত্যাগ করে মথুরায় পালিয়ে যায় আর রাধাকে দেখা যায় নিছক দেহজ মিলনের জন্য হাহাকার করতে। অন্যদিকে পদাবলীর রাধাকে দেখা যায় কৃষ্ণ নাম শুনে সে উৎকন্ঠিত। কৃষ্ণই যেন তার ধ্যানজ্ঞান। এই কারণেই চণ্ডীদাসের পদে উঠে এসেছে –
“কাল জল ঢালিতে সই কালা পড়ে মনে।
নিরবধি দেখি কালা শয়নে স্বপনে॥”
বৈষ্ণবপদাবলীতে দেখা যায়, রাধার প্রেমে সর্বদাই আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেয়েছে, যাকে বলে নিকষিত প্রেম।
কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যায়, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধার দুটি রূপ ফুটে উঠেছে ‘জন্মখণ্ড’ থেকে ‘বানখণ্ড’ পর্যন্ত যে রাধাকে দেখা যায়, ‘বংশীখণ্ড’ ও ‘রাধাবিরহ’-এ সেই রাধাকে দেখা যায় না। ‘বানখণ্ড’ পর্যন্ত কৃষ্ণের প্রতি রাধার যে বিতৃষ্ণা লক্ষ যায়, ,‘বংশীখণ্ড’-এ গিয়ে দেখা যায় সেই বিরাগ ধীরে ধীরে লোপ পেয়েছে। ‘বংশীখণ্ড’-এর পরবর্তী খণ্ড ‘রাধাবিরহ’ -এ এসে দেখা যায় রাধার যেন জন্মান্তর হয়েছে। ‘বংশীখণ্ড’ যে রাধাকে দেখা যায় সেই রাধাকে বৈষ্ণবপদাবলীর শুরুতেই লক্ষ করা যায়। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ ও ‘বৈষ্ণবপদাবলী’ দুই জায়গাতেই দেখা যায় কৃষ্ণের বাঁশির শব্দে রাধাকে চঞ্চল হতে। বংশীখণ্ডে রাধাকে বলতে শোনা যায় –
“আকুল শরীর মোর বেআকুল মন। বাঁশীর শবদেঁ মো আঊলাইলোঁ রন্ধন।।
কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি সে না কোন জনা। দাসী হআঁ তার পাও নিশিবোঁ আপনা॥”
অন্যদিকে বৈষ্ণবপদাবলীতে দেখা যায়, রাধা বলছে –
“কি লাগিয়া ডাক রে বাঁশী আর কিবা চাও।
বাকি আছে প্রাণ আমার তাও লৈয়া যাও॥”
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে দেখা যায় চারিদিকে বসন্তের সমারোহ, মিলনের আনন্দ, সেই সময় কৃষ্ণের বাঁশির সুরে রাধা চঞ্চল হয়ে উঠেছে, সে কৃষ্ণ ছাড়া নিজের রূপযৌবনকে বৃথা হিসেবে দেখে –
“কাহ্নাঞিঁ সোঁঅরী মোর চিত নহে থীর”

বংশীখণ্ডে আরো দেখা যায় বাঁশির সুরে রাধার রান্না করার সময় অসুবিধার ঘটনা –
“নান্দের নান্দন কাহ্ন আড়বাঁশী বাএ: যেন রএ পাঞ্জরের শুআ।
তা সুণিআঁ ঘৃতে মো পরলা বুলিআঁ: ভাজিলোঁ এ কাঁচা গুআ॥”
এটি আসলে রাধার কৃষ্ণ-উন্মুখী ভাবনা, এটি ‘যুবতী দেহের আর্তনাদ’ বললে সবটাই বলা হয়ে ওঠে না, এর মধ্যে আরো কিছু ছিল তা হল ‘প্রেমের বেদনা’। এই প্রেমের বেদনা থেকেই রাধাকে বলতে শোনা যায় –
“কাহ্নাঞিঁ বিহাণে মোর: সকল সংসার ভৈল: দশ দিগ লাগে মোর শূন।
আঞ্চলের সোনা মোর: কে না হরি লআঁ গেল: কিবা তার কৈলোঁ অগুণ॥”

‘রাধাবিরহ’ – এ রাধা সম্পূর্ণ কৃষ্ণময়ী। বংশীখণ্ডে রাধাকে দেখা যায় কৃষ্ণউন্মুখী বাঁশি চুরির পর তাকে ছলনা ও মিথ্যার আশ্রয় নিতে দেখা যায়, কিন্তু রাধাবিরহে কোথাও আর ছলনা ও উদ্ধত বাক্য প্রয়োগ করতে দেখা যায় না রাধাকে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের কবি বড়ু চণ্ডীদাস আলোচ্য খণ্ডের মধ্যে বাঁক নিয়ে এসেছেন, কবি এখানে রাধার দুঃখ যন্ত্রণাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন –
“নয়নশলিল পড়ে বদনে তাহার।‌ বাহুঞঁ গালিল যেন চাঁদ সুধাধার।
তোহ্মাক লিখিআঁ কাহ্ন মদনরূপ। প্রাণমগণ করে কহিলোঁ সরূপ॥”
আলোচ্য পদে রাধার যে অবস্থার কথা জানা যায় অর্থাৎ কৃষ্ণ বিহনে রাধার চোখ দিয়ে রাহুগ্রস্থ চাঁদের মতো অশ্রু ঝরছে, কৃষ্ণের চিত্র এঁকে তাকে রাধা প্রণাম জানাচ্ছে, সর্বদা কৃষ্ণের কথা ভেবে ভেবে তার মনে হচ্ছে কৃষ্ণ যেন তাঁর সামনে আছে, তাই সে কখনো হাসছে, কখনো রোষে ফেটে পড়ছে, কখনো কাঁদছে, কখনো কাঁপছে, কখনো ভয়ে অস্থির হচ্ছে – পদাবলীর রাধার মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্য গুলো লক্ষ করা যায়, এই কারণেই হয়তো বলা হয়ে থাকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ‘রাধাবিরহ’-এ পদাবলীর রাধার আগমনী শোনা যায়।

অচিন্ত্যকুমার বিশ্বাসের মতে,

“বড়ুর রাধার সঙ্গে পদাবলীর রাধার মিল চৈতন্যপূর্ব চণ্ডীদাসের পদের অন্তর্বস্তুতে থাকা সম্ভব। আমাদের মনে হয় বাংলা্র কৃষ্ণকেন্দ্রিক ভক্তিবাদের বিকাশে চণ্ডীদাস আমাদের পরিচিতি, তিনি একই ব্যক্তি দুজন নন। বড়ুর রচনা নাট্যগীতিময়। চণ্ডীদাসের রচনা গীতিময় বেদনাদীর্ণ। প্রথম ক্ষেত্রে কাব্য পরিকল্পনা প্রাগাঢ়, ব্যাপ্ত; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কাব্য আবেগ ঘনীভূত, দ্যুতিময়, চমৎকার ও মণিখণ্ডের মতো। সুতরাং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর শেষ যেখানে সেখানেই শুরু বৈষ্ণব পদাবলীর এরকম মন্তব্য করা যেতেই পারে।”

বৈষ্ণব পদাবলীর রাধার মতো রাধাবিরহের মধ্যেও ক্রোধের চিহ্ন লক্ষ করা যায় না, ব্যঙ্গবিদ্রূপ মান অভিমানও লক্ষ করা যায় না, শুধু লক্ষ করা যায় তিনি কৃষ্ণ বিরহের তীব্র তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা কি ভাবে ভোগ করেছিলেন। দেখা যায় রাধা এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যোগিনী হতে চায় –
১) “মুছিআঁ পেলাইবোঁ মোয়ে সিসের সিন্দুর। বাহুর বলয়া মো করিবো শংখচুর॥
মুণ্ডিয়া পেলাইবোঁ কেশ জ্যাইবোঁ সাগর। যোগিনীরূপ ধরী লইবোঁ দেশান্তন॥”
২) “বিরহ সাগর মোর গহীন গম্ভীর বড়ায়ি এ হাত কেমনে হয়িব পার।”

বিদ্যাপতির রাধাকেও ঠিক এই কথা বলতে শোনা যায় –
“বিরহ্নপয়োধি পার কিয়ে পাওব মঝু মনে নাহি পাতিয়াই।”

তেমনি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রাধাবিরহের একটি জায়গাতে পাওয়া যায় –
“যে কাহ্ন লগিআঁ: মো আন না চাহিলোঁ বড়ায়ি: না মানিলোঁ লঘু গুরু জনে॥
হেন মনে পড়িহাসে: আহ্মা উপেখিআঁ রোষে: আন লআঁ বঞ্চে বৃন্দাবনে॥”

অর্থাৎ, যে কৃষ্ণের জন্য আমি আর কিছু চাইনি, লঘুগুরুজন কাউকেই মানিনি , সেই কৃষ্ণ আমাকে উপেক্ষা করে অন্য রমণীর সঙ্গে বৃন্দাবনে বাস করছে।
এই উক্ত বিষয়টির পরিপ্রেক্ষিতেই চণ্ডীদাসের পদাবলীতে পাওয়া যায় –
“সই ! কেমনে ধরিব হিয়া।
আমার বঁধুয়া         আন বাড়ি যায়,
       আমার আঙিনা দিয়া॥”
জ্ঞানদাসের রচিত একটি পদ‌ যেখানে পাওয়া যায় –
“সুখের লাগিয়া এঘর বাঁধিনু অনলে পুড়িয়া গেল।
অমিয়া – সাগরে সিনান করিতে সকলি গরল ভেল॥”
এই রকমই একটি পদ রাধাবিরহতেও পাওয়া যায় –
“বড়ায়ি গো॥ কত দুখ কহিব কাঁহিনী।
দল বুলী ঝাঁপ দিলোঁ : সে মোর সুখাইল ল: মোঞঁ নারী বড় অভাগিনী॥”

আলোচ্য রাধাকে দেখে মনে হয় না তিনি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা চরিত্র, এই রাধাকে দেখে মনে হয় সে যেন বৈষ্ণবপদাবলীর রাধা। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের প্রথম দিক থেকে রাধা চরিত্রের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা গিয়েছিল শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের শেষে রাধা চরিত্রের সেই বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় না। আসলে বড়ুচণ্ডীদাস ‘রাধাবিরহ’-এ এসে রাধা চরিত্রের জন্মান্তর ঘটিয়েছেন। যন্ত্রণার আগুনে পুড়িয়ে কবি তাঁর রাধাকে চিরন্তন বিরহিনী রাধিকাতে রূপান্তরিত করিয়েছেন। বলা যেতে পারে তথ্য ও ঘটনার ঘনঘটা অতিক্রম করে কাব্য এখানে ভাবগভীর সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেছে। যার ফলে গীতরসের সন্ধান পাওয়া যায়। এখানে রাধার বিরহার্তি কবির  বিরহার্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে ফলে সৃষ্টি হয়েছে পদাবলীর রাধা।

এই কারণেই প্রমথনাথ বিশী বলেছেন –

“শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধার যেখানে শেষ, পদাবলী রাধার সেখানে আরম্ভ।”