খেলার মাঠের আত্মকথা

কলমে:- অভিজিৎ ঘোষ ( বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় )


ভূমিকা:-
    আমি ধুলিপূর্ণ পান্ডুরময় এক খেলার মাঠ। আমি হাজার হাজার মানুষের আনন্দ ও ফূর্তির অবলম্বন। নবীন, প্রবীণ, শিশু, যুবক প্রত্যেকই আমার বন্ধু। প্রতিনিয়ত আমার বুকে দাপিয়ে বেড়িয়েছে কয়েকদল মানুষ। তারা একবারও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেনি আমার অবস্থা। কেবল নিজেদের আত্মতৃপ্তির জন্য আমাকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে। একদল মানুষ আমার বুকে কোনদিন ফুটবল নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছে, আবার কোনদিন ব্যাট আর বল নিয়ে মেতে উঠেছে ক্রিকেট খেলায় আনন্দে, কোনদিন আবার রেকেট আর কক নিয়ে টেনিস খেলার ইচ্ছাকেও বাদ দেয়নি। আমার জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি মানুষকে আনন্দ দিয়ে গেছি। আমাকে অবলম্বন করে আত্মতৃপ্তি মিটিয়েছেও অনেক মানুষ। কিন্তু কোনদিনই কারো ভালোবাসার পাত্র আমি হয়ে উঠতে পারিনি। আমার বুকের উপর দিয়ে বয়ে যায় স্বাধীনতার তৃপ্ত বায়ু, অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি। আমার বুকে এসে শতাধিক মানুষ স্বাধীনভাবে লাফালাফি, ছোটা-দৌড়া, স্বাধীনভাবে খেলাধুলা করে। কিন্তু আমি পরাধীনতার শৃঙ্খল পায়ে পরে চুপ করে তাদের ভালো লাগাকে আমার ভালো লাগায় পরিণত করি। কারণ আমার ভালোলাগা মন্দলাগাকে কেউ প্রাধান্য দেয় না আমার ভালো লাগা মন্দ লাগায় কারো কিছু এসে যায় না। কেউ দেখতে পায় না আমার চোখের জল। হয়ত বা আমার বুক আর মুখটার দিকে কেউ ভালোভাবে তাকিয়েই দেখেনি।

জন্ম বৃত্তান্ত:-
    প্রথম অবস্থায় আমার বুকে দাঁড়িয়ে ছিল হাজার হাজার ছোট বড় মাঝারি গাছ। তারাও ছিল আমার বন্ধু। তাদের সাথে রোজ কত কথা, কত ফুর্তি, কত আনন্দে মেতে উঠেছি। কিন্তু হঠাৎ একদিন আমার পাশে একটা বিরাট সভা হল। সেই সভায় পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী এসে ভাষণ দিলেন তিনি ঘোষণা করলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন এই এলাকা জুড়ে তিনি এক বিরাট কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। কিছু দিনের মধ্যেই আমার পাশেই তৈরি হয়ে গেল বহুতল বিশিষ্ট একটি কলেজ। এরপর আমার দিকে নজর পড়ল তাদের। আমার বুক থেকে আমার প্রাণের বন্ধুদের কেটে নেওয়া হল। আমার বুক থেকে তাদের শিরা উপশিরা পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হল। আমি যন্ত্রণায় কাতর হয়ে উঠলাম। আমার বন্ধুদের জন্য কষ্ট হলেও সব মুখ বুঝে সহ্য করলাম কারণ আর কিছুদিনের মধ্যেই আমার বুকে কচি কাঁচা নবীন প্রবীণ বালক বালিকার হাসিতে ভরে উঠবে এবং তাদের পায়ের ছাপে ধন্য হব আমি, তারই আনন্দে। আর তাই হল। আমার বুকে হাজার হাজার ছেলে মেয়ে আর ওই কলেজেরই অধ্যক্ষ বাবুরাও এসে আমার বুকে খেলা শুরু করল। কত বাহারি তাদের খেলা। আমি মুগ্ধ চিত্তে দেখতাম। এই ভাবেই জঙ্গল সাফ করে আমার জন্ম দিল একদল মানুষ।

স্মৃতির পার্টি অতীত দিন:-
    আমার চারপাশে লাগানো হলো নানান রঙ বেরঙের ফুলের গাছ। পরিচর্যার জন্য এক মালিকেও নিযুক্ত করা হলো। সে রোজ সকাল নটার সময় এসে আমার বুকে জল দিত। সার মাটি ইত্যাদি নানান ধরনের উপাদান ছড়িয়ে দিত। এইভাবে আস্তে আস্তে আমার বুক থেকে রসদ শুষে নিয়ে ফুলের গাছগুলি কিছু দিনের মধ্যেই তরতাজা হয়ে উঠল। তাদের ফুলের সুগন্ধে আমি সারাক্ষণ মোহিত হয়ে থাকতাম। ধীরে ধীরে গাছগুলিও আমার খুবই কাছের বন্ধু হয়ে উঠল।
   আমার বুকে ঘোরাফেরা করতে এবং আমার চারপাশে জুড়ে গড়ে ওঠা নতুন ফুলের বাগান দেখতে একদল ছেলেমেয়েরা আসত। তারা গাছের ফুল ছিড়ে একে অপরকে প্রেম নিবেদন করত। তাদের এই বাল্য প্রণয় দেখে আমার বুকটা খুশিতে ভরে উঠত। আবার মাঝে মাঝে আমার মুখটা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠত।
     কলেজের ছাত্র-ছাত্রী এবং অধ্যক্ষদের বিভিন্ন খেলার মধ্যে আমিও মেতে উঠতাম। আমারই বুকে দাঁড়িয়ে একদল বিজয়ী খেলোয়াড় উল্লাসে মেতে উঠেছে। আবার পরাজিত খেলোয়াড়ের দল বিষণ্ণতায় মুখ ভিজিয়ে নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছে। আমি নির্বাক হয়ে সব দেখেছি তাদের সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, আনন্দ, বেদনা, প্রণয় সমস্ত কিছুকে নিজের মত করে অনুভব করেছি। কখনো আমার মুখে হাসির রোসনাই ফুটে উঠেছে, আবার কখনো আমার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় বয়ে গেছে কান্নার জল। কেউই কিন্তু তা অনুভব করতে পারেনি।

আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা:– 
     মাঝে মাঝে কোনোদিন কোনোদিন আমারও ইচ্ছে হতো আমার বুকে আজ ক্রিকেট খেলা হোক, কিন্তু স্বাধীন ছাত্র-ছাত্রীদের দল তারা আবার ঠিক করে বসতো ফুটবল খেলার কথা। দুঃখে ঘৃণায় ফেটে পড়তাম তখন। আবার কোনদিন হয়তো ভাবতাম আজ আমার বুকে টেনিস খেলা হোক, কিন্তু হইচই করে ছুটে আসা ছেলেদের হাতে ব্যাট আর বল দেখে আমি স্তম্ভিত হতচকিত হয়ে যেতাম। দুঃখ, অভিমানে আমার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে অশ্রু। কিন্তু সেই অশ্রু কারো মনকে কোনদিন স্পর্শ করতে পারেনি। খেলার নেশায় বুঁদ হয়ে তারা আমার চোখের অশ্রুকে পদদলিত করে দিয়ে গিয়েছে। হারজিতের নেশায় ছুটে বেড়িয়েছে, কখনো আমার কথা ভেবেও দেখেনি। আসলে তো ওরা আমাকে ভালোই বাসে না। শুধু আমিই ওদের ভালোবাসি। ওরা স্বার্থপর ভাবে আমার ওপর হারজিতের নেশায় দাপিয়ে বেড়িয়েছে, আর আমি নিঃস্বার্থভাবে ওদেরকে আমার বুকে আনন্দ ফুর্তিতে মেতে ওঠার মদত যুগিয়েছি।

বর্তমান অবস্থা:- 
    হঠাৎ একদিন আমার বুকে নামানো হল ইট, পাথর, সিমেন্ট, বালি। আমি অবাক হয়ে গেলাম। একদল ছেলে মেয়ে আমার বুকে এসে বসল। তাদের কথা ভালো করে কান দিয়ে শুনলাম। আমার বুকে নাকি তৈরি হবে এক বিরাট বহুতল। যেখানে ক্যান্টিন আর কলেজের হস্টেল তৈরি করা হবে। তাদের প্রত্যেকের মুখে দুঃখের ছাপ, কারো চোখ আবার টলমল করছে জলে, একজন তো আবার কেঁদেই ফেললে আমাকে হারানোর ভয়ে। আমি তাদের দুঃখ কান্না অনুভব করলাম। বেদনায় আমার বুক ফুলে উঠলো, আমার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু। সেই ছেলেটির অশ্রু যখন আমার বুক স্পর্শ করল, তখন বুঝলাম, আমি এতদিন ভুল ভাবতাম। তারাও আমাকে খুব ভালবাসে। আমাকে হারানোর জন্য তাদের বিষণ্ণতার চেহারা দেখে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম।

উপসংহার:- 
     আমার ওপর দাপিয়ে বেড়ানো ছেলেমেয়ে ও লোকগুলোর ওপর রাগ হতো ঠিকই। কিন্তু আমি কোনদিনই কাউকে কষ্ট দিতে চাইনি। আমি তাদের সাথে মিলিয়ে নিয়েছিলাম নিজের সুখ,দুঃখ, ইচ্ছা অনিচ্ছাকে। মনকে আমি বুঝিয়েছিলাম দুঃখ বিনা জগতে কেউ সুখী নয়। এক অধ্যক্ষের মুখে একদিন শুনেছিলাম –

“কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে
  দুঃখ বিনা সুখলাভ হয় কি মহিতে?”

কিন্তু আজ এই পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে এই কথাকে আর কি মান্যতা দেব। আমার বুকের উপর তৈরি হবে বহুতল। যেখানে হবে হস্টেল আর ক্যান্টিন। কিন্তু আমি তো কখনো এমন চাইনি। হঠাৎ মনে পড়ল আমার চাওয়া না চাওয়ার সাথে তো কারো কিছু যায় আসে না।  আমাকে যারা জন্ম দিয়েছিল, আমার ভবিষ্যতও আজ ঠিক তাদেরই হাতে। তারাই ঠিক করুক আজ আমার সাথে তারা কি করবে। তবে তারা যাই করুক আমাকে মুখ বুঝে মুক হয়ে সব সহ্য করতে হবে। কারণ আমার প্রতিবাদের ভাষা কেউই কোনদিন বোঝেনি, আর বুঝবেও না। আমার কষ্ট কেউ কোনদিন অনুভব করতে পারেনি, আর করবেও না। আমার বুকফাটা কান্না,  মর্মভেদি চিৎকার, আর চোখ দিয়ে বয়ে যাওয়া অশ্রুও কেউ কোনদিন চোখ মেলেও দেখবেনা কারণ আমি একটি ধুলি ধুসরিত খেলার মাঠ।