কন্যাশ্রী প্রকল্প

কলমে:- অভিজিৎ ঘোষ ( বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় )


ভূমিকা :-
     সময়ের আবহমান স্রোতে গা ভাসিয়ে সেই প্রাচীনকালের থেকেই মানুষের গঠিত সমাজে ‘কন্যা’ কথাটি যেন এক বেদনাদায়ক শব্দ। অতীতে কন্যা সন্তান প্রসব করিলে নববধূর কপালে জুটতো নির্যাতন এবং অত্যাচার এর করুন দৃশ্য। তাছাড়া কন্যা সন্তানটিও সমাজে অবহেলিতভাবে বড় হতে হত তাকে। নানান লাঞ্ছনা গঞ্জনার মাধ্যমে জীবন নির্ধারণ করতে হতো তাকে। এমনকি তারা সমাজের বাঁধাধরা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকত। স্কুল কলেজের উজ্জ্বল ও স্বপ্ন মুখর দিন থেকে তারা ছিল চির বঞ্চিত। তাদেরকে চার দেওয়ালের মধ্যে বাঁধাধরা জীবনের মধ্যে থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্য একটি জনমুখী প্রকল্প হল কন্যাশ্রী প্রকল্প। কন্যাশ্রী প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি প্রকল্প যেটি নারী স্বাধীনতার জন্য গঠিত। এছাড়াও তাদেরকে শিক্ষায় দীক্ষায় পারদর্শী করে তোলার জন্য এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের উদ্দেশ্য নিয়েই জন দরদী পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই অভাবনীয় প্রকল্পটির সূচনা করেছেন।

কন‍্যাশ্রী প্রকল্পের সূচনা:-
    দৈনন্দিন জীবনের প্রবাহমাত্রা সমসাময়িক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সমীক্ষা বা সার্ভের রিপোর্ট থেকে উঠে আসা তথ্য থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায় যে ছাত্র-ছাত্রীদের যে আনুপাতিক হার পরিলক্ষিত হয়, সেই অনুযায়ী ছাত্র এবং ছাত্রদের আনুপাতিক হার ছিল ৮০ এবং ২০ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গের সরকার বিভিন্ন মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে  নারী শিক্ষার আনুপাতিক হারকে অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি করার জন্য এক অভিনব চিন্তার দ্বারস্থ হয়ে যে নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন তার নামই কন্যাশ্রী। এই কন্যাশ্রী প্রদান করে বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্র এবং ছাত্রীদের আনুপাতিক হারকে ৬০ এবং ৪০ শতাংশে তুলে নিয়ে এসেছেন পশ্চিমবঙ্গের জনদরদী মুখ্যমন্ত্রী এবং কল্যাণকরি সমাজ সংস্কারক।

কন‍্যাশ্রী প্রকল্পের তাৎপর্য:-
কন্যাশ্রী কথাটিকে ভাঙলে আমরা মূলত দুইটি নতুন শব্দ পাই। একটি হল- ‘কন্যা’ এবং অপরটি হলো ‘শ্রী’। কন্যা কথার অর্থ হলো মেয়ে বা বালিকা এবং শ্রী কথার অর্থ হল সুন্দর বা লক্ষী। অর্থাৎ কন্যাশ্রী কথার তাৎপর্য হলো কন্যা বা মেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অভিনব পরিকল্পনা। মেয়েরা হল ঘরের লক্ষ্মী বা শ্রী। সেই লক্ষ্মী বা শ্রীকে শিক্ষায় দীক্ষায় পারদর্শী এবং আত্ম নির্ভরশীল করে তোলার জন্য এক বিশেষ প্রচেষ্টাই হল কন্যাশ্রী।

কন‍্যাশ্রী প্রকল্পের উদ্দেশ্য:-
   মেয়েদেরকে আত্মনির্ভরশীল এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার জন্যই পশ্চিমবঙ্গ সরকার এক মহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েদের সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটানো। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেয়েদেরকে দক্ষ এবং পারদর্শী করে তোলা এবং মেয়েদেরকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং আত্মনির্ভরশীল করে তোলা হল এই প্রকল্পের বিশেষ লক্ষ্য। মেয়েরা যাতে শিক্ষাক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা প্রকাশ করতে পারে তার জন্য এই প্রকল্পের মাধ্যমে মেয়েদেরকে এককালীন বেশ মোটা অংকের একটা টাকা দিয়ে সাহায্য করা হয়, যাতে মেয়েটির ওপর আর পারিবারিক কোনো চাপ না পড়ে এবং সকল কাজে যাতে মেয়েরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে তাই হলো এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য

কন‍্যাশ্রী প্রকল্পের স্বরূপ –
  কন্যাশ্রী প্রকল্পটিকে তিনটি স্তরে ভাগ করে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হয়েছে। যে স্তর গুলির মাধ্যমে এই মহৎ প্রকল্পটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হয়েছে সেই স্তর গুলি হল k1, k2 এবং k3  ।
K1 ধাপে বালিকাদের 13 বছর বয়স থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি বছর 500 টাকা করে বৃত্তি দেওয়া হয়। ১৮ বছর সম্পূর্ণ হলে সেই বালিকাটি K2 ধাপে পৌঁছে যায় এবং এই K2 ধাপের মাধ্যমে ২৫ হাজার টাকা অনুদান পায় সেই কন্যাটি। এবং সর্বশেষ ধাপটি হল K3, এই K3 ধাপে প্রতি তিন লক্ষ মেয়েদেরকে প্রতি বছর নিয়ে আসা হয়। এবং এই K3 ধাপে কন্যাশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রীদের প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা করে এবং কলা বিভাগের ছাত্রীদের প্রতি মাসে ২০০০ টাকা করে বৃত্তি দেওয়া হয়।

সুফল:-
    কন্যাশ্রী প্রকল্প বাস্তবিকভাবে এক মহৎ প্রকল্প এই মহৎ প্রকল্পের অনেক সুফল রয়েছে সেই সুফল গুলি হল নিম্নরূপ-
  1. স্কুলে ড্রপ আউট ছাত্রীদের হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব হয়েছে এই কন্যাশ্রী প্রকল্পের জন্য।
2. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরও স্কুলের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করা হয়েছে এই কন্যাশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে।
3. কন্যাশ্রী প্রকল্পের প্রাপ্য মোটা অংকের টাকার জন্য অনেক মেয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়েছে।
4. কন্যাশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যাতে মেয়েরা নিজেদেরকে বিভিন্ন ক্ষেত্রগুলিতে পারদর্শী করে তুলতে পারে।

সম্মান:-
   পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মহৎ প্রকল্প কন্যাশ্রী আজ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। সমাজের প্রতিটি মানুষ মূর্খ থেকে শিক্ষিত, গোঁয়ার থেকে চালাক প্রত্যেকেই সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছে এই প্রকল্পটিকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বাহবা জানিয়েছেন সমস্ত  রাজ্যবাসী কন্যাশ্রী প্রকল্পের রূপায়ণের জন্য। পশ্চিমবঙ্গের আনাচে-কানাচে প্রতিটি ঘরে ঘরে স্কুল পড়ুয়া প্রতিটি কন্যাকে এই প্রকল্পের সুবিধা প্রদান করেছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সম্মানের আসনে তাই কন্যাশ্রী প্রকল্প আজ বিশ্বনন্দিত। জগৎ পূর্ণ সম্মানে ভূষিত হয়ে কন্যাশ্রী এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও পশ্চিমবঙ্গবাসীগণ গর্বিত ও আনন্দিত।

আন্তর্জাতিক সম্মান ও পুরস্কার:-
   কয়েকটি রাষ্ট্র কর্তৃক সম্মান ও পন্ডিত মহলে সাড়া জাগায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কন্যাশ্রী প্রকল্প। আন্তর্জাতিক সম্মানেও সম্মানিত হয়েছে এই কন্যাশ্রী প্রকল্প। তাই রাষ্ট্র কর্তৃক বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে তার কন্যাশ্রী প্রকল্পের রূপায়ণের জন্য। এছাড়াও ২০১৩ সালে রাষ্ট্র সংঘ কর্তৃক এই প্রকল্পটিকে প্রথম স্থান দেওয়া হয়েছে। কল্যাণকর এবং সমাজ কল্যাণকর প্রকল্প হিসেবে ২০১৪ সালে লন্ডনে ইউনিসেফ (UNICEF) দ্বারাও এই প্রকল্পটির প্রশংসা পেয়েছে এবং ডব্লিউ এস আই এস- সিক্সটিন (WSIS-16) পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

উপসংহার:-
   বিশ্ব মধ্যে যেকোন বিষয়, যেকোন প্রকল্প, যেকোন কর্ম, যা কিছুই সংঘটিত হোক না কেন সমস্ত কিছুই সমালোচনা আলোকে এসে পৌঁছায়। এবং সমালোচকরা তার সুফল ও কুফল সম্পর্কে স্বীকার অস্বীকার করে থাকেন। কিন্তু কন্যাশ্রী প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কন্যাশ্রী প্রকল্পটিকে ভারতসুদ্ধ সমস্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলিও সমাজ কল্যাণকর নারী কল্যাণকর প্রকল্প হিসেবে বিনা বাক্যে স্বীকৃতি দিয়েছে। কন্যাশ্রী প্রকল্পটি নারী কন্যাদের উন্নতির জন্য এমন এক প্রকল্প যে এর কোন খারাপ দিকই নেই বা কোন খারাপ উদ্দেশ্যও নেই। তাই এই প্রকল্প নিয়ে সমালোচনা করতে গেলে সমস্ত সমালোচকদের অকপটে এর সুফল গুলিকে স্বীকার করে নিতে হয়েছে। কারণ এর কোনো খারাপ দিক কারো নজরে এসে পৌঁছয় নি আজ পর্যন্ত। সমাজের সর্বস্তরের নারী কন্যারা আজ কন্যাশ্রী প্রকল্পের জন্য মুক্ত। তারা আজ আনন্দিত, তারা আজ গর্বিত। তাই বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন পোস্টে বিভিন্ন কন্যাশ্রী দেরকে নির্ভয়ে বলতে দেখা যায়-

আমি কন্যাশ্রী কন্যা
            ভবিষ্যতের অনন্যা

কন্যাশ্রী দিচ্ছে ডাক
            বাল্যবিবাহ দূরে যাক