শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে রাধাবিরহ প্রক্ষিপ্ত কেন ?
কলমে – নম্রতা বিশ্বাস, এম.এ, বি.এড
বিরাট বিস্তৃত ও ব্যাপ্ত সমুদ্রের বুকে মাঝে মাঝে ভাসমান শৈল – শিরাকে কখনো কখনো দ্বীপখণ্ড জেগে থাকতে দেখা যায়, অনেক সময় এই গুলোকে দেখে মনে হয় এইগুলো স্বতন্ত্র; যেন পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে জেগে আছে। কিন্তু আসলে এগুলো সবই সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত। তেমনি ‘ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ’ নামাঙ্কিত এই কাব্যটি তেরোটি খণ্ডে বিভক্ত জন্মখণ্ড, তাম্বুল খণ্ড, দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, ভারখণ্ড, ছত্রখণ্ড, বৃন্দাবনখণ্ড, কালিয়দমনখণ্ড, বস্ত্রহরণখণ্ড, হারখণ্ড, বাণখণ্ড, বংশীখণ্ড, রাধাবিরহ। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের খণ্ডগুলির কাহিনী সূত্র অনুসরণ করলে মনে হয় এর মধ্য দিয়ে একটি নাটকীয় সংঘাতময় কাব্য রচনা করেছেন যেন কবি। কিন্তু অনেক সমালোচকদের মতে শেষের অংশটি অর্থাৎ ‘রাধাবিরহ’ প্রক্ষিপ্ত। প্রসঙ্গত বলি, প্রক্ষিপ্ত শব্দের অর্থ হলো ‘কাব্যের অংশ নয়’, পরবর্তী কালে নতুন ভাবে সংযোজিত হয়েছে।
‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য সম্পর্কে অনেক সমালোচকেরা ‘জন্মখণ্ড’ থেকে ’ছত্রখণ্ড’ পর্যন্ত এক রীতি এবং পরের খণ্ডগুলিতে ভিন্ন রীতি প্রয়োগ করা হয়েছে এমন অভিমতও পোষণ করেছেন। রীতি ভিন্ন হলেই যে কাব্য ভিন্ন হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কাব্যটির সূচনায় নায়ক নায়িকার পারস্পরিক পরিচিত পারস্পরিক সম্পর্ক – এই সবই কথোপকথনমূলক রীতিতে বর্ণিত। পরবর্তীতে দেখা যায় নায়ক – নায়িকার জীবন যৌবনের আনন্দ ও তার ঘাত – প্রতিঘাতে মিলন বিচ্ছেদের কথাসূত্র – ঘটনাবলি প্রথমে যা ছিল নাটকীয় ঘাতপ্রতিঘাতময় অভিনয়ধর্মী শেষপর্যন্ত সেটি গিয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র আবেগাত্মক আত্মোন্মোচনের দীর্ঘশ্বাস রূপে।
‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ -এর কাহিনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম পর্যায় জন্ম ও তাম্বুল খণ্ডের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় কংস ধ্বংসের উদ্দেশ্যে কৃষ্ণ জন্ম –
“বিজয় নাম বেলাতে ভাদর মাসে। নিশি আন্ধকার ঘন বারি বরিষে॥
হেন শুভক্ষণে দেব জগন্নাথ হরী৷ শঙ্খ চক্র গদা আর শারঙ্গ ধরী॥”
কৃষ্ণের সম্ভোগ উদ্দেশ্যে রাধার জন্ম –
“কাহ্নাঞিঁর সম্ভোগ কারণে। লক্ষ্মীক বুলিল দেবগণে॥
আল রাধা পৃথিবীত কর অবতার। থির হঊ সকল সংসার॥ আল রাধা॥”
কৃষ্ণের জন্য রাধাকে নপুংসক আইহনের স্ত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করানো –
“দৈবেঁ কৈল কাহ্ন মনে জাণী। নপুংসক আইহনের রাণী॥”
বড়াইকে রাধার তত্ত্বাবধানের জন্য নিযুক্ত করা –
“নিয়োজিলী নানা পরকারে। আল। হাট বাটে রাধা রাখিবারে॥ ল বড়ায়ি॥”
এরপর মথুরাযাত্রী বড়াই ও রাধার বিচ্ছেদ, রাধার রূপের বর্ণনা শুনে কৃষ্ণের মনে রাধার দেহ সম্ভোগের তীব্র বাসনা জাগা । তার ফলে কৃষ্ণ বড়াইকে দূতী করে রাধার কাছে তাঁর তাম্বুল পাঠানো –
“কর্পূরবাসিত তাম্বুলে৷ আর। কস্তুরী ভরাআঁ কপোলে।”
তাম্বুল স্বীকারে রাধার অস্বীকার এবং তাম্বুল নিয়ে আসার কারণে রাধার হাতে বড়াইয়ের লাঞ্ছনা –
“কাহ্নাঞিঁ । চড়েঁ মাইলে রাধা মোরে দেখ বিদ্যমানে।
এত আপমান সহে কাহার পরাণে॥”
এই সমস্ত ঘটনাবলিকে নাট্যগতি সম্পন্ন কাহিনীর উন্মোচন অংশ হিসেবে ধরা হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ে দান – নৌকা – ভার ও ছত্রখণ্ডকে রাখা যায়। এই সময় রাধার প্রতি কৃষ্ণের আগ্রহ লক্ষ করা যায়। দেহকে কেন্দ্র করে তাঁর আগ্রহ কখনো শ্লীল – অশ্লীলের মাত্রা অতিক্রম করতে দেখা গিয়েছে। এই পর্যায় রাধাকে প্রেমিকা হিসেবে দেখেননি কৃষ্ণ, বরং তাঁদের মধ্যে যে জন্ম – জন্মান্তরের সংযোগ সেই ভিত্তিতে কৃষ্ণ রাধাকে দৈহিক সম্ভোগ করতে চায় –
“পুরুব জনমে কৈল জলধি মথানে। তোহ্মে লক্ষ্মী রাধা এবেঁ আহ্মে হরি কাহ্নে॥”
এমন ভাবেই ‘ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ’ কাব্যটি সাজানো হয়েছে। অন্যদিকে রাধা ক্রমে কৃষ্ণকে রাখাল বালক ভাগিনেয় ছাড়া তেমন কিছুই ভাবতে পারছেন না৷ মায়ার আচ্ছন্ন যেন তিনি, তাঁর ফলে সৃষ্ট হয়েছে দ্বন্দ্ব। কৃষ্ণ রাধাকে বলপূর্বক ভোগ করতে চাইছেন। আর প্রথমিক অনীহার পরে রাধা ক্রমে ক্রমে দেহকে অবলম্বন করেছেন, যা পূর্বরাগের নায়িকার নিদর্শন –
“এবার কাহ্নাঞিঁ বড় কৈল উপকার। জরমেঁ সুঝিতেঁ নারোঁ এ গুণ তাহার॥”
অনিচ্ছা মিলন, মিলিত হবার পর দেহের সম্ভোগ চিহ্ন গুলি আড়াল করার প্রয়াসে রাধার দ্বন্দ্ব ঘন মানসিক আবেগ স্পষ্ট এই পর্যায়ে। এই অংশ কাহিনীর নাট্যক্রিয়ার উর্ধ্বায়ন হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তৃতীয় পর্যায় বৃন্দাবনখণ্ড ও কালিয়দমনখণ্ড। কৃষ্ণ রাধাকে আনন্দ দানের উদ্দেশ্য নির্মাণ করেন বৃন্দাবনে রম্য উদ্যান ও কুঞ্জগৃহ। কৃষ্ণ এই নন্দিত স্থানে রাধাকে আহ্বান করে। রাধা সেখানে এসে প্রথমে কৃষ্ণকে বলে তাঁর সখীদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে, আলোচ্য ঘটনার ভগবতাদি পুরাণেও সমর্থ আছে। বড়ু চণ্ডীদাস সুপ্রচলিত পরিচিত কাহিনীর ভিত্তিতে আলোচ্য কাব্যে এনেছেন দুর্লভ মনস্তত্ত্বের আকর্ষণ – বিকর্ষণের দোলা।
কালিয়দমনখণ্ডেও মনোরঞ্জনকারী কৃষ্ণ জল ক্রীড়ার জন্য যমুনার জলকে পরিশুদ্ধ করার জন্য ঘোর বিষময় জলাভূমিকে শোধনের অমানুষী প্রয়াস করেছেন। এই ঘটনার ক্রম পুরাণের ধারা মেনে হয়নি অবশ্য, পুরাণে আগে কালিয়দমন পরে রাসের উল্লেখ আছে। কিন্তু বড়ু চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে আগে কুঞ্জলীলা পরে জলক্রীড়ার উল্লেখ করেছেন। জীবন ও মৃত্যুর সম্ভাবনার মাঝখানে নায়ক যেন এখানে শায়িত হয়ে আছেন। কালিয়দমনখণ্ডে দেখা যায় পিতা নন্দ ও মাতা যশোদা দেবী মূর্চ্ছাপন্ন, সহোদর অগ্রজ বলরাম স্মরণ করচ্ছেন কৃষ্ণকে, তাঁর নানা জন্মের শক্তি ও বিজয়ের ভূমিকা; গোপা ও গোপীদের হাহাকার করতে দেখা যাচ্ছে। পরবর্তীতে দেখা যায় কৃষ্ণ বেঁচে ওঠার পর জগৎ আবার চলৎচঞ্চল হল। কালিয়দমনের পর কৃষ্ণ জল থেকে বেরিয়ে এলে রাধা কৃষ্ণের প্রতি নিস্পন্দ নেত্রে আশ্চর্যভাবে তাকালেন –
“নেহেঁ তবেঁ আ কুলী রাধিকা ততিখনে। নিমেষরহিত বঙ্ক সরস নয়নে॥
দেখিল কাহ্নের মুখ সুচির সমএ। সকাল লোকের মাঝেঁ তেজি লাজ ভএ॥”
কৃষ্ণও রাধার দিকে অনুরূপ তাকালেন –
“দেখি দামোদর রাধাক পাশে। খনেক করিল ঈষত হাসে॥”
মৃত্যুত্তীর্ণ এই প্রেমের দৃষ্টি বৃন্দাবনখণ্ডের পরবর্তী নাটকীয় তুঙ্গ পরিস্থিতির প্রগাঢ় প্রকাশ বলা যেতে পারে।
চতুর্থ পর্যায়, যমুনাখণ্ড, হারখণ্ড ও বানখণ্ড। আলোচ্য পর্যায়ে কালিদহের জলক্রীড়া, বস্ত্রহরণ, হারহরণের ঘটনার উল্লেখ আছে। অচিন্ত্য বিশ্বাসের মতে বস্ত্রহরণের কোনো আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা আছে নৌকাখণ্ডের মতো।
অচিন্ত্য বিশ্বাসের মতে,
“কৃষ্ণ যেহেতু সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, তার সঙ্গে মিলিত হবার জন্যে জাগতিক প্রাণ – জীবাত্মাকে সব মায়া – মোহ – লজ্জা – পসার – লাভ – লোকসানের আশা ত্যাগ করতে হবে। তবেই তিনি কাণ্ডারী হয়ে যম – যমুনার ওপারে নিয়ে যাবেন। অর্থাৎ পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভ করতে হলে জীবাত্মাকে সর্বস্ব সমর্পণ করতে হবে।”
বস্ত্রহরণখণ্ডে রাধার মনে কৃষ্ণের ব্যবহারের স্বরূপ যে ঈষৎ ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছিল, হারখণ্ডে সেই ক্রোধ বেড়ে গিয়ে আত্মপ্রকাশ করে –
“তেকারণে আয়িলোঁ তোহ্মার থানে॥
বারেঁ বারেঁ কাহ্ন সে কাম করে৷ যে কামে হে কুলের খাঁখারে॥”
এই পর্যায়ে কাহিনীর নাট্যগতি অবরোহণ উন্মুক্ত হয়েছে বলা যায় পাশ্চাত্য নাট্যতাত্ত্বিকদের মতে এর নাম নাট্যক্রিয়ার নিম্নগতি।
পঞ্চম পর্যায় বাণখণ্ড, বংশীখণ্ড ও রাধাবিরহ। বাণখণ্ডে দেখা যায় রাধাকে প্রাণঘাতী কামদেবের শরে আহত করেন কৃষ্ণ। পরবর্তীতে সকলের অনুরোধ কৃষ্ণ রাধা আবার তাঁর প্রাণ ফিরিয়ে দেন –
“বারেক জিঅ তোঁ গোআলী। রাধা ল। আর না বুলিবোঁ ধামালী॥”
বংশীখণ্ডে দেখা যায় রাধা কৃষ্ণের প্রাণঘাতী কামনার শরের চেয়েও ভয়াবহ বংশীধ্বনি শুনে বিপন্ন হয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত রাধা কৃষ্ণের বংশীধ্বনি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তাঁর বাঁশিটি চুরি করেন। –
“কদম তলাত: নিন্দ গেল কৃষ্ণ: দেখিল আইহনরাণী॥
ধীরে ধীরে তার: নিকট গিআঁ : বাঁশী চোরায়িআঁ সত্বরে।”
কিন্তু বাঁশি চুরি করার পূর্বের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বাঁশির ধ্বনি রাধাকে এতদিনের গতানুগতিক যাপন থেকে বিচ্যুত করেছে – তাঁর হাহাকারের সূচনা এখানে। কে একজন কালিন্দী নদীর কূলে বাঁশি বাজাচ্ছেন – তাঁর ডাকে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, জীবনের যেন উলটো দিকে বৈতে আরম্ভ করেছে। এখান থেকে কাব্য হয়ে উঠেছে বিশ্বপ্রাণের তুঙ্গ হাহাকার।
রাধাবিরহ বস্তুত বংশীখণ্ডের সুরটিতে যেন প্রগাঢ় করেছে। বংশীখণ্ডে দেখা যায় রাধাকে কৃষ্ণের প্রতি চরম অনুগত্য স্বীকার করতে –
“আজি হৈতেঁ চন্দ্রাবলী হৈল তোর দাসী।”
রাধাবিরহে রাধার যে করুণ পরিণতি হয়েছিল অর্থাৎ ‘Cataslolrophee’ সেটি লক্ষ করা যায়। আলোচ্য অংশে দেখা যায় কৃষ্ণ রাধাকে অনিচ্ছাকৃত মিলনের পর একা ফেলে চলে যায় তাঁর কর্তব্য সাধনের উদ্দেশ্যে। দানখণ্ডে রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের যে অনিচ্ছাকৃত মিলন হয়েছিল সেটাই যেন কৃষ্ণের দিক থেকে এলো রাধাবিরহে। তার পাশাপাশি অন্য বিষয়ও ফিরে আসতে দেখা যায়, যেমন প্রথমে রাধা কৃষ্ণকে তাঁদের মধ্যে যে মাতুলানী সম্বন্ধ সেই সম্পর্কের কথা বলেছিল, পরবর্তীতে রাধাবিরহে দেখা যায় কৃষ্ণ রাধাকে সেই কথাগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন –
“মাঅ যশোদা মোর : মামা আইহন ল : তোহ্মে মোর সোদর মাঊলানী॥”
রাধাবিরহে রাধার জীবনের যে দুঃখ কষ্ট দেখানো হয়েছে তা যেন এক গ্রাম্য নায়িকার বেদনাকে উন্মোচন করে। কিন্তু বিমানবিহারী মজুমদারের মতে ‘রাধাবিরহ’ প্রক্ষিপ্ত বিমানবিহারী মজুমদারই সর্বপ্রথম ‘রাধাবিরহ’ কে প্রক্ষিপ্ত বলেছিলেন।
ড. বিমান বিহারী মজুমদারেরমতে –
“ইহার পূর্বে কাব্যের প্রত্যেক অংশকে খণ্ড বলা হইয়াছে, কিন্তু ‘রাধাবিরহে’র বেলায় উহাকে খণ্ড বলা হয় নাই। খুব সম্ভবত এটি একটি স্বতন্ত্র কাব্য।”
ড. মজুমদার তাঁর অভিমতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য যেসকল যুক্তিগুলি দেখিয়েছেন সেগুলি নিম্নের রূপায়িত করা হল –
১/ অন্যান্য সব অংশের নামকরণের সঙ্গে ‘খণ্ড’ কথাটি উপস্থিত থাকলেও ‘রাধাবিরহে’ ‘খণ্ড’ শব্দটি অনুপস্থিত।
২/ ‘তাম্বুল খণ্ড’ থেকে ‘বংশীখণ্ড’ পর্যন্ত রাধা চরিত্রের মধ্যে যে বিকাশ লক্ষ গিয়েছে তা স্বাভাবিক। কিন্তু ‘রাধাবিরহ’ -এ রাধার আকস্মিক জন্মান্তর দেখানো হয়েছে। একই কবির কাব্যদেহে দ্বিবিধ ভাবান্তর একটু সন্দেহজনক।
৩/ ‘রাধাবিরহ’ অংশে বড়াইকে কবি স্বতন্ত্র ভাবে অঙ্কন করছেন । রাধা যখন বড়াইকে বলেন যে, কোনো ভাবেই কৃষ্ণকে মথুরা থেকে নিয়ে আসতে, তখন বড়াইকে কৃষ্ণের রূপ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়।
“কেমনে বেড়াএ কাহ্ন কিবা রূপ ধরে। এঁকে এঁকে সব কথা কহ তোঁ আহ্মারে॥”
৪/ কৃষ্ণ ও রাধার মধ্যে রতিসঙ্গম পূর্বের খণ্ডগুলিতে অনেকবার লক্ষ করা গিয়েছে কিন্তু ‘রাধাবিরহে’ সেই সকল পূর্ববর্তী দৈহিক সঙ্গমের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।
৫/ ‘রাধাবিরহের’ – এর ভাষা পূর্ববর্তী খণ্ডগুলি থেকে মার্জিত, শ্রুতিসৌন্দর্যবিস্তারী ও আবেদন সৃষ্টিকারী।
৬/ দানখণ্ডে যেখান বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রার প্রসঙ্গ এসেছে সেখানে ‘রাধাবিরহ’ -তে ‘কড়ি’ বা মুদ্রার পরিবর্তে ‘সোনা’-এর উল্লেখ রয়েছে –
“শত পল সোনা বড়ায়ি লআঁ সে মেল।
প্রাণনাথ কাহ্নাঞির উদ্দেশে চল॥”
৭/ ‘রাধাবিরহ’ তে এমন কিছু ভণিতা উল্লেখ আছে, যা পূর্ববর্তী খণ্ডগুলিতে লক্ষ করা যায়নি।
৮/ ড. বিমান বিহারী মজুমদারের মতে ‘রাধাবিরহ’ কামনা বাসনা বিসর্জিত বিশুদ্ধ হৃদয় সম্বলিত স্বতন্ত্র আখ্যান।
অন্যদিকে যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধির মতে,
“রাধা বিরহখণ্ড ছোট ছিল, এক গায়েন পালাটি বাড়াইয়াছেন। দুই গায়েনের দুই পালা একত্র করিয়া কৃকীর বিরহ খণ্ড হইয়াছে।”
এই অভিমতের ভিত্তিতে যোগেশবাবু যে যুক্তি গুলো দেখিয়েছেন সেগুলি হল –
১/ তাম্বুলখণ্ডে রাধা কৃষ্ণের অপমান করিয়াছেন , বড়ায়ি ল/ কদমের তলে বসী ইতি পদে কৃষ্ণ প্রতিশোধ নিরূপণ করিতেছেন। তিনি দান সাধিবেন, রাধার হার কড়িয়া লইবেন , বৃন্দাবনে বিহার করিবেন, রাধাকে মদন বাণ মারিবেন। যে গায়েন কাব্যের এই অনুক্রণিকা করিয়াছিলেন, তিনি কি জানিতেন না কৃষ্ণ রাধাকে বিরহনলে দগ্ধ করিবেন ? তাঁহার পুথিতে কি বিরহখণ্ড ছিল না ? ”
২/ ‘ কাব্যটি ত্রয়োদশ খণ্ডে বিভক্ত, দ্বাদশ নয়, চতুর্দশ নয় । সংখ্যাটি অযুগ্ম। অসাধারণ মনে হইতেছে। ’
৩/ ‘ কৃকীতে বিরহপালা দুইবার আছে। প্রথম বিরহের পর রাধা কৃষ্ণের মিলন হইয়াছিল। এইখানে বৃন্দাবনলীলা শেষ হইবার কথা। কংসবধ বলিতেই হইবে এমন নির্বন্ধ ছিল না । ’
৪/ ‘ বিরহ খণ্ডের ভাষার বিশেষ আছে, এত আনুনাসিক ইহার বিশেষ লক্ষণ। অপরাপর খণ্ডে ঞাঁ , ইঞাঁ আছে। অন্য কয়েকটা শব্দের বানানেও বিশেষ আছে।’
এই সকল বক্তব্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বলা যায়, যে রাধার ‘জন্মান্তর’ -এর প্রাক্-পূর্বাভাষ ‘রাধাবিরহ’ আখ্যানে থাকলেও এটিকে স্বতন্ত্র Text বলা যায় না। ভাষার তেমন কোনো আধুনিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন এই অংশে খুঁজে পাওয়া যায় না।
অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে –
“সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে ‘রাধাবিরহ’ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের অন্তর্ভুক্ত এবং বড়ু চণ্ডীদাসের রচনা।”
যেসকল কারণ গুলির উপর ভিত্তি করে বলা যায় রাধাবিরহ প্রক্ষিপ্ত নয় সেইগুলো –
প্রথমত, হতে পারে লিপিকার প্রমাদে ‘খণ্ড’ শব্দটি বাদ পরে গিয়েছে। যেমন – ‘কালীয়দমনখণ্ড’ -এর পরবর্তী খণ্ড ‘যমুনাখণ্ড’ -এর নাম পুথিতে উল্লেখ করা ছিল না সম্পাদক বসন্তরঞ্জন নিজেই এই অংশের নামকরণ করেছিলেন ‘যমুনাখণ্ড’।
দ্বিতীয়ত, ‘রাধাবিরহ’ অংশের শেষ পৃষ্ঠাটি যেহেতু পাওয়া যায়নি হতে পারে সেই পৃষ্ঠাটিতে ‘খণ্ড’ কথাটি উপস্থিত ছিল।
তৃতীয়ত, রাধা চরিত্রের যে জন্মান্তর দেখা গিয়েছে তা বংশীখণ্ড থেকেই ‘রাধাবিরহ’ অংশে তারই গভীরতর আকৃতির অনুসন্ধান পাওয়া যায়।
“বিরহেঁ আকুলী যবেঁ চাহোঁ মো তোহ্মারে । তখন আসিহ তোহ্মে অতি অবিচারে॥”
চতুর্থত, রাধাসর্বস্ব ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কথাটি যেমন স্বীকার্য তেমনি এটিও স্বীকার্য যে, শ্রীকৃষ্ণ চরিত্রের বিশেষ Pattern কবি ধরতে চেয়েছিলেন। কাব্যটিতে দেখা যায় কৃষ্ণ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। ফলে ‘রাধাবিরহ’ -এ কমনীয়, নমনীয়, প্রেমসর্বস্বত্যাগী পুরুষের প্রতীকী চরিত্ররূপে গৃহীত হন না কৃষ্ণ। তাঁর কোনো রূপান্তর লক্ষ করা যায় না। ফলে এটিকে স্বতন্ত্র কাব্য বলা যায় না।
পঞ্চমত, রাধাবিরহে দেখা যায় বড়াই কৃষ্ণকে খোঁজার জন্য তাঁর রূপ কেমন জানতে চান কিন্তু সেটি ছিল কবির অভিপ্রায় অনুসারে। কেননা, মধ্যযুগের কবিরা সময় ও সুযোগ পেলে নায়ক – নায়িকার রূপ বর্ণনায় তৃপ্ত হতেন।
ষষ্ঠত, নৌকাখণ্ড – ভারখণ্ড – ছত্রখণ্ডের কথা স্মরণ করে কৃষ্ণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন রাধা, তাহলে তো বলা যায় খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ডতা রক্ষিত হয়েছে।
সপ্তমত, ‘রাধাবিরহ’ -এর ভাব গভীর ও হৃদয়সংবেদ্য অনুভূতিতে অতলাশ্রয়ী মনের অবচেতনের দ্বার পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়, ফলে এর ভাষা চটুল, তরল, স্থূল না হওয়াই সংগত।
অষ্টমত, ‘রাধাবিরহ’-এ পূর্ববর্তী খণ্ডগুলির মতো রাগ- রাগিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এমনকি পূর্ববর্তী খণ্ডগুলির মতো সংস্কৃত শ্লোকের ব্যবহারও লক্ষ করা যায়।
অচিন্ত্য বিশ্বাস ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের সমালোচনায় জানিয়েছেন –
“এ রচনায় খণ্ডগুলি বিচ্ছিন্ন নয় – পরম্পরিত। একটির সঙ্গে অন্যখণ্ড কার্যকরণসূত্রে, রচনারীতিগত বৈশিষ্ট্যে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ। কোনো খণ্ড পৃথক নয় – প্রক্ষিপ্ত নয়।”
বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্যভাষা দেখে মনে হয় সমস্ত রচনাটাই যেন একি রকম। সুতরাং ‘রাধাবিরহ’ প্রক্ষিপ্ত নয় বরং ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যটি যেন খণ্ডে খণ্ডে মালার মতো বিন্যস্ত এক অখণ্ড গাঁথুনি।