বাংলা সাহিত্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান
কলমে : অনন্যা সাহা, বি.এ (বাংলা), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলা সাহিত্যের জগতে, নানান ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের সমাহারের মধ্যে, অন্যতম এক অধ্যায় হল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের স্থাপনা।
সেই সময়ে এই কলেজের স্থাপনা নেহাত, নব্য ইংরেজদের বাংলা শিক্ষা প্রদানের জন্য হলেও, বাংলা সাহিত্যের লিখিত এবং মুদ্রিত ভিত্তিমূল গঠনের পিছনে এর এক বিশেষ ভূমিকা ছিল৷ প্রসঙ্গত উইলাম কেরী মহাশয়ের উল্লেখ না করলেই নয়, তিনি বাংলায় এসে নিজ জীবৎকালে নানান ধরণের কার্য সাধন করে যান। যে কার্য গুলির মধ্যে অন্যতম হল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপনার দায়ভার গ্রহণ।
তৎকালীন সময়ে তাঁর তত্ত্বাবধানে এই কলেজ থেকে, অনেক ধরণের গ্রন্থ সমাহার প্রকাশ লাভ করে, যে গ্রন্থ সমাহার গুলির গুরুত্ব আজও অনস্বীকার্য। এছাড়া,ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রত্যেক অধ্যাপকবৃন্দ ছিলেন বিশেষ গুণে গুণান্বিত, এর পাশাপাশি তাঁদের শিক্ষা মনস্কতার ভিত্তিও ছিল বেশ উন্নত, যে ভিত্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে নানান ধরণের,অসাধারণ গ্রন্থ সমূহ। বলাবাহুল্য এই গ্রন্থ গুলিই,পরবর্তী বাংলা সাহিত্য জগৎ নির্মাণের,মূল নিয়ামক হিসেবে পরিগণিত।
■ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পটভূমি :
১৮০০ সালের মে মাসের চার তারিখে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সাল নিয়ে সমালোচক মহলে বিশেষ বাক-বিতন্ডা বর্তমান থাকলেও , ১৮০০ সালকেই মূলত এই কলেজের প্রতিষ্ঠা সাল হিসেবে গণ্য করা হয়। পূর্বেই বলা হয়েছে,বাংলা ভাষার গদ্য রচনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই কলেজের সাথে নিযুক্ত প্রত্যেকটি ব্যক্তিবর্গের এক বিশেষ ভূমিকা আছে। বলাবাহুল্য তাঁরা না থাকলে, সে সময়ে বাংলা গদ্য সাহিত্য জগতের সার্থক পরিবর্তন কখনই আসতোনা।
সে কালে এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন রেভারেন্ট ব্রাউন, এর পরে ১৮০১ সালে উইলিয়াম কেরী মহাশয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাথে নিজেকে নিযুক্ত করেন। এ কলেজে তাঁর অবস্থান ছিল দীর্ঘমেয়াদি,১৮০১ সাল থেকে ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ কলেজের সাথে যুক্ত ছিলেন। প্রথমে তিনি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে এ কলেজে আসেন।
এই ১৮০১ সালেই মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে এ কলেজে আসেন। এছাড়াও চন্ডীচরণ মুনশী, রামরাম বসু, রাজীবলোচন মিত্র প্রমুখ ব্যক্তিমহাশয় এই কলেজের সে সময়ে যুক্ত হন।
মূলত ইংরেজ সিভিলিয়ানদের এদেশের ভাষা শেখাতে এই কলেজ স্থাপিত হলেও, বাংলা গদ্যের গতিশীলতাকে সচল করতে এই কলেজের ভূমিকা অন্যতম।
■ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য :
প্রাথমিক ভাবে ব্রিটিশ আধিকারিকবৃন্দদের ভারতীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ তৈরি হলেও, সেই সময়ে অন্যান্য নানান ধরণের কার্যক্রম এই কলেজ অতীব স্বকীয়তার সাথে সম্পন্ন করে। যে কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হল বাংলা ও হিন্দি ভাষার বিকাশ।
প্রসঙ্গত এই কলেজের কর্তৃপক্ষ দ্বারা প্রদত্ত ভাষা শিক্ষার মধ্যে, যে ভাষা সকলের শিক্ষা দেওয়া হত সেগুলি হল, আরবি, ফার্সি, সংস্কৃত, হিন্দুস্তানি এবং বাংলা। তবে পরবর্তীতে মারাঠি এবং চীনা ভাষার শিক্ষার জন্যও এই কলেজে বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বিভিন্ন ভাষায়, ভাষা শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে এই কলেজে নানান বিশিষ্ট ব্যক্তি সকলের আগমন ঘটে। তবে বাংলা ভাষা শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে সেই সময় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে বেশ সমস্যায় পরতে হয়, কারণ এই সময় বাংলার বেশির ভাগ পন্ডিত বর্গই সংস্কৃত ভাষাশিক্ষা প্রদানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন। ফলত পরে, কেরী সাহেবকে কলেজ কর্তৃপক্ষ নির্বাচন করে, বাংলা ভাষা শিক্ষা প্রদানের জন্য এবং এই কেরী সাহেবই মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার মহাশয় ও রামরাম বসু মহাশয়কে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সদস্য করে নিয়ে আসেন। বলাবাহুল্য এনারা তিন জনে মিলেই
প্রাথমিক ভাবে,বাংলা গদ্য ভাষার উত্তরণের পথ নির্মাণ করে যান।
এছাড়াও শিক্ষা প্রদানের তাগিদে, এই কলেজে একটি গ্রন্থাগার নির্মাণ করা হয়। যে গ্রন্থাগারটি নানান স্থান থেকে সংগৃহীত নানান পুঁথি পত্র এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ দ্বারা প্রকাশিত নানা পুস্তিকা সকল সহ পরিপুষ্ট থাকতো। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পন্ন পুস্তিকা সকলের ঠাঁইও এই কলেজের গ্রন্থাগারে ছিল। তবে পরবর্তীতে এই কলেজ ভেঙে দেওয়ার পরে, এই বহুমূল্যবান গ্রন্থাগারের, গ্রন্থ সংগ্রহ অধুনা ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারকে প্রদান করা হয়।
■ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখক গোষ্ঠী :
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাথে, অনেক গণ্য মান্য ব্যক্তিবর্গ নিযুক্ত ছিলেন। নিম্নে সেই গণ্য মান্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে থাকা, কিছু জনের কথা তুলে ধরা হল যাঁরা নিজ অক্লান্ত পরিশ্রম এবং লেখনীর দ্বারা বাংলা সাহিত্যের ভিতকে সার্থকভাবে দৃঢ় করে তোলেন :
◆ উইলিয়াম কেরী :
১৭৮৯ সালে পাদ্রী হওয়ার পরে, কেরী মহাশয় কলকাতায় আসেন ১৭৯৯ সালে। ভারতে আসার পরে তিনি তাঁর জীবনের ৪১টি বছর এখানেই কাটান।
কলেজের সাথে যুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি পাঠ্য যোগ্য পুস্তকের অভাব বোধ করেন ফলত তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগেই মূলত, গদ্য ভাষায় পাঠ্য পুস্তিকা রচনার দায়ভার গ্রহণ করেন।
প্রথমে তিনি মোট পাঁচশত টাকার বিনিময়ে কলেজের কার্যাভার গ্রহণ করেন। সর্বোপরি নিজ জীবৎকাল তিনি খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে এবং বাংলা গদ্য সাহিত্যের পথ নির্মাণেই অতিবাহিত করেন।
◆ রামরাম বসু :
রামরাম বসু ছিলেন এই কলেজের আর এক গুণী পন্ডিত। বাংলা গদ্যের উদ্ভব কালে ইনিই নিজ লেখনী বৈশিষ্ট্যর নিরিখে নজির সৃষ্টি করে যান।
এছাড়াও ফার্সি ভাষাতেও তাঁর বিশেষ বুৎপত্তি ছিল।
তিঁনিই প্রথম কলেজের ছাত্রদের জন্য পাঠ্য পুস্তিকা রচনা করেন।
এনার জন্ম হয় হুগলীর চুঁচুড়ায় আনুমানিক ১৭৫৭ সালে। ১৮০০ সালের মে মাস নাগাদ তিঁনি শ্রীরামপুর মিশনের সাথে যুক্ত ছিলেন পরবর্তীতে ১৮০১ সালে তিঁনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে আসেন,মাসিক ৪০ টাকা বেতনের বিনিময়ে।
১৮০১ সাল থেকে প্রায় ১৮১৩ সাল পর্যন্ত তিঁনি এই কলেজের সাথেই যুক্ত ছিলেন।
◆ মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার :
পরবর্তী প্রজন্মে বিশেষ প্রভাব প্রদানকারী ব্যক্তি বর্গের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার মহাশয়।
তিঁনি আনুমানিক ১৭৬২-৬৩ সালে মেদিনীপুরে জন্ম গ্রহণ করেন। তিঁনি ছিলেন মেদিনীপুরের রাড়ী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ। তিঁনি নিজ যৌবন কালে কলকাতায় এক চতুষপাঠিতে সংস্কৃত শিক্ষা প্রদান করতেন।
১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাথে তিনি মাসিক মোট দুইশত টাকার বিনিময়ে যুক্ত হন এবং বলাবাহুল্য এই কলেজে অবস্থান কালে তিনি নিজ পণ্ডিত্যকে বেশ দক্ষতার সাথেই মানুষের কাছে পরিস্ফুট করেন যে পণ্ডিত্যের আবেশ আজও রয়ে গিয়েছে ।
■ বাংলা গদ্য সাহিত্যের উন্নয়নে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহের ভূমিকা :
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের আওতাভুক্ত উইলিয়াম কেরী, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার এবং রামরাম বসু এই তিন জন ছিলেন, এই কলেজের তিন প্রধান স্তম্ভ। তাঁদের ব্যক্তি বৈশিষ্ট বাংলা গদ্যের উদ্ভব পর্বকে যে সুগমতা দান করেছিল তার আবেশে, পরবর্তী সমগ্র ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ গোষ্ঠী,বাংলা গদ্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে ওঠে।
নিম্নে উইলিয়াম কেরী, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার এবং রামরাম বসু প্রনীত কিছু রচনার বৈশিষ্ট্যর সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রস্তুত করা হল –
◆ কথোপকথন (১৮০১) :
•এই রচনা মূলত,বাংলায় কথাবার্তা লিখনের মাধ্যমে, ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা ভাষা এবং বাঙালি সমাজ সম্বন্ধে সম্যকভাবে অবগত করানোর জন্য করা হয়।
•এই রচনার বিষয় গুলির মধ্যে উল্লেখ্য হল, স্ত্রীলোকের কথোপকথন, হাটের বিষয়, জমিদার, ভোজনের কথা ইত্যাদি।
•এই রচনার মাধ্যমে সমকালীন বাঙালি সমাজের নানান শ্রেণীর পরিচয় পাওয়া যায়।
•সাধারণের কাছে বাংলা গদ্যকে যুক্তিচিন্তা ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পেশ করে এই রচনা।
•এই রচনার ভাষা প্রকৃত চলতি ভাষা নয় বরং এর ভাষা চলিত ও সাধু ভাষার মিশ্রণ।
•অনেক স্থানীয় প্রবাদ-প্রবচনের উল্লেখও আছে এতে।
•সংলাপেরে লঘুতা বাংলা গদ্যের বাস্তবতাকে অক্ষুন্ন রাখে।
◆ ইতিহাসমালা (১৮১২) :
•এখানে ইতিহাস নয় বরং আছে গল্পের সম্ভার।
•প্রাচ্চ এবং পাশ্চাত্যের নানান গল্পের সংকলন স্বরূপ হল এই ইতিহাসমালা।
•এই রচনার মূল উৎসব হিসেবে সংস্কৃত গাঁথা গল্প, উপকথা, লোকক্তি, বিদেশী উপখ্যান ইত্যাদিকে বিশেষ ভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
•এর ভাষা সংস্কৃত-গন্ধি।
•এর ভাষা অতটাও কঠিন নয় বরং সহজ, সরল ও স্বাভাবিক।
•এছাড়া বাংলা গদ্যের অন্যয়রীতি এতে স্পষ্ট।
•এর রচনা ভঙ্গিমায় সার্থক বাঙালি প্রভাব স্পষ্ট।
•ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা গদ্য সৃষ্টির, ক্ষমতার এক অন্যতম নজির হলো এই রচনা
•প্রথম বাংলা আখ্যান গ্রন্থের তকমার দাবিদার হিসেবেও এই ইতিহাসমালার গুরুত্ব অপরিসীম।
◆ রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১) :
•এটি বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম মৌলিক গ্রন্থ।
•ইতিহাস, জনশ্রুতি ও কল্পনা এই রচনার মূল অঙ্গ।
•এটি মূলত ইতিহাস আশ্রিত বাংলা গদ্য কাহিনি।
•এটি প্রথম বর্ণনামূলক গদ্য রচনা।
•এতে আরবি ও ফারসি ভাষার বিশেষ ব্যবহার আছে।
•বাংলা গদ্য রীতি পরিস্ফুট করতে গিয়ে, এতে তৎসম শব্দের বিশেষ প্রয়োগ পরিলক্ষিত হতে লক্ষ্য করা যায়।
•এছাড়াও গ্রন্থটি বাঙালি রচিত প্রথম গদ্য গ্রন্থের তকমা প্রাপ্ত।
◆ লিপিমালা (১৮০২) :
•পত্ররচনার আদলে এই পুস্তিকা লিখিত।
•রাজা পরিক্ষিত, দক্ষযজ্ঞ ইত্যাদি গাঁথা কাহিনি এতে পত্রের আদলে ফুটে এসেছে।
•সরল বাংলার ধরণ এতে প্রকাশিত।
•এর ভাষা রীতি বেশ সংযত।
•আবার এই রচনা পাঠ করলে, কেতাবি-গুরুগম্ভীর ভাষা রীতির আবেশ সম্মকভাবে টের পাওয়া যায়।
•এতে ব্যবহৃত স্বাভাবিক গদ্যশৈলী,সামাজিক জীবনের জন্য বেশ উপযোগী।
•সর্বোপরি এর সরল ভাষা, বাংলা মৌখিক ভাষার প্রায় কাছাকাছি।
◆ হিতোপদেশ (১৮০৮) :
•এটি হল একটি অনুবাদ গ্রন্থ।
•প্রাচীন পঞ্চতন্ত্রের কাহিনীর অনুবাদ এতে পরিস্ফুট।
•এই গ্রন্থ নানান প্রকারের নীতি এবং উপদেশ যুক্ত।
•এতে বর্ণিত বিচিত্র কাহিনিসকল বেশ চিত্তাকর্ষক।
•পশুপাখির মুখের ভাষায় লেখক অবিকল মানুষের কথা বসান।
•এর ভাষা সংস্কৃত-গন্ধী।
•অন্যয়রীতির সাথে,এতে স্থান পেয়েছে গুরুভার ভাষারীতি।
•বাংলা ভাষার, সাধু রূপ এবং তৎসম শব্দের বাহুল্যতা এতে স্পষ্ট।
◆ প্রবোধচন্দ্রিকা (১৮৩৩) :
•এর বিষয়বস্তু, ভাষাশৈলী দুই-ই অন্যতম।
•এটি একপ্রকার সংকলন গ্রন্থ।
•সংস্কৃত ব্যাকরণ, অলংকার, পুরাণ, নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি থেকে নিজ রচনার উপকরণ সংগ্রহ করেন লেখক মহাশয়।
•এছাড়াও এতে লৌকিক কাহিনীর সমাবেশও পরিলক্ষিত হয়।
•এই রচনার মুলে,মূলত তিন ধরণের ভাষারীতি ছিল যথা – কথ্যরীতি, সাধুরীতি এবং সংস্কৃতানুসারী রীতি।
•তৎসম শব্দ দ্বারা ভাষাগঠন এই রচনার এক অন্যতম বৈচিত্র।
•প্রবাদ-প্রবচন, দ্বিরুক্তিবাচক দেশি শব্দ ও গ্রাম্য শব্দ এই রচনার বিশেষ অঙ্গ।
■ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখক গোষ্ঠীর দ্বারা লিখিত পুস্তিকার তালিকাসমূহ :
◆ উইলিয়াম কেরী রচিত –
৹ কথোপকথন (১৮০১)
৹ ইতিহাসমালা (১৮১২) –
◆ রামরাম বসু রচিত –
৹ রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১)
৹ লিপিমালা(১৮০২)
৹ হরকরা
৹ জ্ঞানোদয়
৹ খ্রিষ্টসংগীত
৹ খ্রিষ্টবিবরণামৃতম
◆ মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার রচিত –
৹ বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২)
৹ হিতপদেশ (১৮০৮)
৹ রাজাবলী (১৮০৮)
৹ প্রবোধচন্দ্রিকা (১৮৩৩)
৹ বেদান্তচন্দ্রিকা (১৮১৭)
◆ হিতপদেশ (১৮০২) – গোলোকনাথ শর্মা
◆ দি ওরিয়েন্টাল ফ্যাবুলিস্ট – তারিণীচরণ মিত্র
◆ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং (১৮০৫) – রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়
◆তোতা ইতিহাস (১৮০৫) – চন্ডীচরণ মুনশী
◆ হিতপদেশ (১৮০৮) – রামকিশোর তর্কচূড়ামনি
◆ পুরুষপরীক্ষা (১৮১৫) – হরপ্রসাদ রায়
◆ কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন রচিত –
৹ পদার্থতত্ত্বকৌমুদী (১৮২১)
৹ আত্মতত্ত্বকৌমুদী (১৯২২)
৹ বাদপ্রতিবাদের (১৮২৩)
৹ সাধু সন্তোষী (১৮২৬)
■ প্রকাশিত রচনা সমূহে পরিলক্ষিত বাংলা গদ্যের বৈশিষ্ট :
নিম্নে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রকাশিত কিছু, বাংলা গ্রন্থের, গদ্য রীতির কিছু অতীব গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত প্রস্তুত করা হলো –
● কেরী রচিত কথোপকথনে চলতি ও সাধু ভাষা মিশ্রিত ক্রিয়া ছিল বেশ আকর্ষণীয়। যথা, “পরলোক হইল”, “করিবে না” এই ধরণের সাধু ক্রিয়ার সাথে, “খাওয়াতে হবে”,”বেচিতে হবে” এমন সাধু-চলিতের মিশ্রিত ক্রিয়া।
● কথোপকথন এর গদ্য ভাষারীতির আর এক দৃষ্টান্ত হল। যথা, “আমি তোর সকল জানি”।
● রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র রচনায়, লিখিত গদ্য ছিল বর্ণনামূলক। যথা, “আমরা এখানে সর্ববিষয়েই সুখি হইয়াছি।”
● রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র রচনার গদ্যরীতিতে ভাষা বৈচিত্রের ব্যবহার বিশেষ কম বললেই চলে। যথা, “তোমরা কি সকলে পাগল হইয়াছ। মহারানী কহিলেন ও কি সমাচার।”
● প্রায় সাবলীল বাংলা গদ্য রীতি এই , রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র রচনাটির ক্ষেত্রে বেশ পরিলক্ষিত। যথা, “রাজা প্রতাপাদিত্য মনে বিচার করেন – আমি একচ্ছত্রী রাজা হইবো এদেশের মধ্যে।”
● বত্রিশ সিংহাসন গ্রন্থের গদ্য রীতিতে, শব্দচয়নের ভাব অনুযায়ী ভাষা পরিকল্পনা বিষয়টি বিশেষ উল্লেখ্য। যথা, “হে চার্বাক, সকল শাস্ত্রের হৃদয়ার্ত তোমাকে বলি,শুন।”
● একই সাথে রাজাবলির গদ্য ভাষাও ছিল বেশ হৃদয়গ্রাহী। যথা, “যে সিংহাসনে বিবিধ প্রকার রত্নালঙ্কারধারীরা বসিতেন…সেই সিংহাসনে জটাধারি বসিল।”
সর্বশেষে বলা যেতে পারে ১৮০১ থেকে প্রায় অনেকটা সময় পর্যন্ত, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গ্রন্থ রচনার উদ্যোগ, বাংলা গদ্য সাহিত্য নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বলাবাহুল্য এই উদ্যোগ বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতিকেও এক বিশেষ গতি প্রদান করে। অথচ ইতিহাস খনন করলে জানা যায় শুধুমাত্র বাংলা গদ্য রচনা এ কলেজের মূল উদ্দেশ্য ছিলোনা, কিন্তু তাও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের বুকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ উল্লেখযোগ্য হয়ে রয়ে গিয়েছে মূলত গদ্য সাহিত্যের প্রাথমিক পটভূমিকা রচনার জন্যই।
এর পূর্বে বাংলায় যে সব গদ্য রচনা হয়েছিল সে সব গদ্যের তুলনায়, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ দ্বারা প্রকাশিত গদ্যগুলির,ভাষা অনেকটা সহজ বোদ্ধ এবং প্রকৃত বাংলা ভাষার নিকটবর্তী ছিল। মূলত এই কারণ বশতই বাংলা সাহিত্যের গদ্যরীতিকে নব কলেবর প্রদানের প্রেক্ষাপটে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মর্যাদা অনসীকার্য ।