গণদেবতা উপন্যাসের ছিরু পাল চরিত্র বিশ্লেষণ
পূজা দাস; এম. এ. (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)
সাম্প্রতিক উপন্যাস সাহিত্য ও ছোটগল্পে তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় অনন্য প্রতিভা। প্রথম মহাযুদ্ধের পরবর্তীকালে, কল্লোল-প্রগতি-কালি কলমের উতরোল পরিবেশে এই মহামানবের আবির্ভাব ঘটে। ঔপনিবেশিক শাসনে পযুদস্ত জাতীয় আন্দোলনে কখনো দীপ্ত, কখনো মন্থর, বেকার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সম্মুখীন-শূন্যতা রবীন্দ্রনাথ- শরৎচন্দ্র শাসিত জগতের পাশে তিনিও তাড়িত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন গ্রামের মানুষ, গ্রামের পুরানো- নতুন মাটির গন্ধ, তৃণ, বাতাস, স্বভাব – সব মিলিয়ে মিশিয়ে হয়ে ওঠা এক সচেতন মানুষ। তাঁকে নাগরিক জীবন উদ্ভূত- শূন্যবাদের প্রতিক্রিয়া কখনও গ্রাস করতে পারেনি। আর তা পারেনি বলেই তারাশঙ্কর যত গল্প উপন্যাস লিখেছেন সে সবের মধ্যে তিনি আপন দৃষ্টিকোণে স্থিত। ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’, ‘গণদেবতা’, ‘হাসুলি বাঁকের উপকথা’ প্রভৃতি উপন্যাসের প্রভাব আমরা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করি। যাই হোক, এখানে আমাদের আলোচ্য, ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের ছিরু পালের চরিত্র সম্পর্কে। উপন্যাস চরিত্র ছাড়া যেন পা ছাড়া কেদারার মতো, চরিত্র উপন্যাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তারাশঙ্করের উপন্যাসে বেশিরভাগ চরিত্ররা উঠে এসেছে, সমাজের অনেক নিচু তলা থেকে, যেমন ডোম, মুচি,বেদে, কাহার ইত্যাদি। তবে তিনি তাঁর গল্প বা উপন্যাসে শুধু নিচু তলার সরল সাধারণ মানুষের তুলে আনেননি। তাদের মধ্য থেকে উঠে এসেছে একদল হঠাৎ বড়লোক হয়ে ওঠা, স্বার্থপর, স্বার্থলোভী, অত্যাচারি, নিচু মনস্কতার মানুষেরাও। যারা নিজের স্বার্থের জন্য সবকিছু করতে পারে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ছিরু পালের চরিত্রটি।
■ গণদেবতা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত কাহিনী ও চরিত্র পরিচয়:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আধুনিক রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে গ্রামীন সমাজের প্রাচীন রীতিনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের কাহিনী ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। ধাত্রীদেবতা, কালিন্দী, পঞ্চগ্রাম প্রভৃতি উপন্যাসে লেখক প্রাচীন সমাজ পরিবর্তনের যে চিত্র এঁকেছেন,’গণদেবতা’ উপন্যাসে তার বিস্তৃত রূপ দেখা গেছে। ১৯২০ এর দশকে ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলে শিবকালীপুর গ্রামে আধুনিক কলকারখানা প্রসার এবং তার ফলে চন্ডীমণ্ডপের বিধি নিষেধ এবং সনাতন নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করে বেশিরভাগ গ্রামবাসী। কাশিপুর গ্রামের কামার অনিরুদ্ধ ও ছুতোর গিরিশ পুরানো নিয়ম ভেঙ্গে গ্রাম ছেড়ে এসে শহরের বাজারে দোকান করে। ফলে এতদিন যাবৎ পেয়ে আসা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে ভেবে গ্রামবাসী অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। প্রতিকারের আশায় তারা গ্রামের চন্ডীমণ্ডপে সভা করে। কিন্তু এই সভার মধ্যে শ্রীহরিপাল ওরফে ছিরু নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ঝামেলার সৃষ্টি করে। এই কারণে ছিরুর সঙ্গে অনিরুদ্ধ সংঘর্ষ বাঁধে। অপমানিত ছিরু প্রতিশোধ নিতে অনিরুদ্ধের জমির সমস্ত ধান তুলে নিয়ে যায়। অনিরুদ্ধ সব বুঝতে পেরেও ছিরুর প্রভাব প্রতিপত্তির ভয়ে কিছু করতে না পেরে হতাশায় মদ্যপান করে এবং জৈব প্রবৃত্তির কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে চন্ডীমন্ডপের পাঠশালার পণ্ডিত, গ্রামের সকল ভালো কাজের অংশী এবং সঙ্গী দেবনাথ ঘোষ অর্থাৎ দেবু প্রচন্ড বেদনা অনুভব করে চন্ডীমন্ডপের শাসন নীতির অচল অবস্থা দেখে। এখন ছিরু পালদের মতো সুযোগ সন্ধানী ব্যক্তিদের ক্ষমতাই প্রবল। একসময় মড়কে গ্রাম উজাড় হয়ে যায়, অনেক পরিবার ও সঙ্গে দেবুর পরিবারও ধ্বংস হয়ে যায়। নিঃসঙ্গ বিষন্ন দেবু উপলব্ধি করে প্রাচীন গ্রামীন প্রাচীন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের উদ্ভবের আগমন বার্তা।
■ ছিরু পাল চরিত্রটির পরিচয়:
“লোকটার চেহারা প্রকাণ্ড, প্রকৃতিতে ইতর এবং দুর্ধর্ষ ব্যক্তি। সম্পদের যে প্রতিষ্ঠা সমাজ মানুষকে দেয়, সেই প্রতিষ্ঠা সমাজে এই কারনে ছিরুর নাই। অভদ্র, ক্রোধী, গোঁয়ার ছিরু পালকে সম্পদোচিত সম্মান কেহ দেয় না।”
গণদেবতা উপন্যাসে ছিরু পাল সম্পর্কে মন্তব্যটি করেছেন স্বয়ং তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়। সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বনিকতন্ত্রের উত্থানের ফলে গ্রাম্যসমাজ জীবনে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে আলোচ্য উপন্যাসে তার বাস্তব রূপটি বর্ণিত হয়েছে। রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে জমিদার, জমিদারের প্রতিনিধি হিসেবে গোমস্তা, মহাজন, চাপরাশি, দারোয়ান চিত্রিত হয়েছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রশক্তির অধিকারী সেটেশমেনট অফিসার এই জমিদার শ্রেনির সঙ্গে যোগ দিয়েছে। শিবকালীপুরের এই রাষ্ট্রশক্তি হল ছিরু পাল। যে পরবর্তীকালে ধনের আভিজাত্যে শ্রীহরি ঘোষ হয়েছে। যুদ্ধের সময় একজন দল সুযোগ সন্ধানী মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এইসব মানুষেরা গরিব মানুষের ঘাড়ে পা রেখে সমাজের একস্তর থেকে আর একস্তরে উঠে গিয়েছিল। ছিরুপাল থেকে শ্রীহরি ঘোষ হওয়া চরিত্রটি সেই শ্রেণীর মানুষের প্রতিভু। শ্রীহরি পাল ওরফে ছিরু নতুন গড়ে ওঠা ধনী ব্যক্তি। জমিদারের সমকক্ষ একজন। দূর্ধর্ষ আর গোঁয়ার প্রকৃতির মানুষ সে। প্রকাশ্যে লোকে তাকে সম্মান দিলেও মনে মনে তাকে সবাই ঘৃণা করতো এবং ছিরু সেটা জানে আর জানে বলেই গ্রামের মানুষের প্রতি নিজের আধিপত্য বিস্তারের জন্য মানুষের সঙ্গে রুঢ় আচরণ করে। জমির আল বাড়িয়ে নেয়। অন্য জমির কিনারে রাতারাতি দেওয়াল তুলে জমি বাড়িয়ে নেয়। নিজের আধিপত্য স্বীকার কর করানোর জন্য গ্রামের নিচু শ্রেণীর নিরীহ মানুষদের ঘরে আগুন লাগায়, আবার নিজেই ঘরে গিয়ে সাহায্য করে। প্রকাশ্য যৌন জীবন যাপন করে। পরের স্ত্রীকে প্রবল ভাবে কামনা করে। খ্যাতির আকাঙ্খায় টাকা যে পথে উপার্জন করে,সেই পথেই লুটায়।
এককথায়, ছিরুপাল ছিল পল্লী গ্রামের জমিদারের সর্বজনীন সাংকেতিক রূপ। তাই সে মুচির মেয়ের সাথে রাত কাটায়, মদ খায়, অনিরুদ্ধ কামারের বউ পদ্মের দেহ ভোগের জন্য ঘোরাফেরা করে, আর মামুলি মামনি চাঁদা, সুদ চেকের দাম, নজরানা, তলবানা, তহুবি, থিয়েটার বৃত্তি, মন্দির সংস্কারের টাকা সংগ্রহ করে। গোমস্তারূপে জমিদারের নির্দিষ্ট খাজনা না দিয়ে যথেষ্ট অত্যাচার চালায় অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের জন্য, সেই সঙ্গে তো ভোগ কামনা আছেই। তারাশঙ্কর ছিরু পালকে উপন্যাসের দুবৃত্ত চরিত্র হিসাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই ছিরু পাল খ্যাতির মোহে এমন কোনো গর্হিত কাজ নেই যা করেননা।
■ চরিত্রটির বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য:
“ছিরু অথবা শ্রীহরি পাল – চাষী হইতে জমিদার উন্নীত, উচ্চ ও নীচ প্রবৃত্তির অদ্ভুত সংমিশ্রণ।” (শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)
কোন উপন্যাস, গল্প এবং বর্তমানে চলচ্চিত্রে একটি করে পজিটিভ চরিত্রের পাশাপাশি, একটি নেগেটিভ চরিত্র তাদের স্বমহিমায় পথ চলতে থাকে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণদেবতা উপন্যাসের নেগেটিভ চরিত্র হলো ছিরু পাল বা শ্রীহরি ঘোষ। যে টাকার আভিজাত্য পাল থেকে ঘোষ হয়েছে। নিম্নে তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাসে ছিরু পালের এই নেগেটিভ চরিত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হল:
◆ অত্যাচারী ছিরু: জমিদার শ্রেণীর বেশীরভাগ অংশই খেটে খাওয়া নিচু তলার সাধারণ মানুষের ওপর জোর জুলুম, অত্যাচার করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধ করে, এই রীতি প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। হঠাৎ করে টাকার আভিজাত্যে জমিদার হয়ে ওঠা ছিরুপাল ও এর বাইরে নয়। শুধুমাত্র অপমানের প্রতিশোধ নিতে অনিরুদ্ধের বাকুরিয়ার দুবিঘা জমির ধান কেটে নিয়ে যায়। কিন্তু অনিরুদ্ধ জানতে বুঝতে পেরেও পুলিশের কাছে যায়নি কারণ যেন উপন্যাসে নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন জগন্নাথ ডাক্তারের মুখে “সংসারে যাদের টাকা আছে তারাই সাধু – আর গরীব মাত্রই অসাধু।” নগদের বিনিময়ে আঙটজুতি না দেওয়ায় পাতুর উপর ছিরু পাল এমন অত্যাচার চালাই যে যা দেখে “উঃ, নির্মমভাবে প্রহার করিয়াছে। চৌধুরীর চোখে অকস্মাৎ জলআসিয়া গেল।” এছাড়াও ছিরু ইচ্ছাপূর্বক পাতুর ঘরে খড়ের চালে আগুন ধরিয়ে দেওয়া তো অত্যাচারেরই সামিল, শুধু অত্যাচার বললে ভুল হবে ছিরু পালের খামখেয়ালি পনা,পাগলামিও বটে “শ্রীহরি আবার এটা একটা বিড়ি ধরাইল। কিছুক্ষণ পরে গাছতলা হইতে বাহির হইয়া জ্বলন্ত বিড়িটা পাতুর চালের মধ্যে গুজিয়া দিয়া দ্রুত লঘু পদে আপন বাড়ির দিকে চলিয়া গেল।”
◆ স্বার্থান্বেষী ও স্বার্থপরতা: ছিরু পালের আরো একটি চরিত্র চোখে পড়ে আমাদের সে অত্যন্ত স্বার্থান্বেষী ও স্বার্থপর প্রকৃতির। কিভাবে নিজের আখেরটা গুছাতে হয় সে খুব ভালো করেই জানে এবং কোন সময় তা করতে হবে সে বিষয়েও সে খুব চতুর। চন্ডীপন্ডপের সভাতে অনিরুদ্ধ ও গিরীশের বিচারের সূত্র ধরেই সে অনিরুদ্ধার কাছ থেকে তার ধার দেওয়া হ্যান্ডনোট সংগ্রহ করেছে। এছাড়াও পাতুর ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে দুর্গা তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে বললে, দুর্গার মুখ বন্ধ করতে সে বলেছে “চুপকর, এতগুলো টাকা আমি দেব।” ছিরু যেমন টাকার লোভে সব করতে পারে, তেমনি নিজের স্বার্থের জন্য এমন কোন কাজ নেই যে সে পারেনা বা করেনি। গ্রামের মানুষের কাছে একটা সম্মানের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হবার লোভে সে তার উপার্জিত জোর জুলুম সুদের টাকা দান করতেও পিছুপা হয়নি। যাদের ঘর পুড়ে গিয়েছিল তাদের সে বলেছে, ‘‘এক কাজ কর। যা খর লাগে আমার বাড়ি থেকে নিয়ে আয়।”
◆ চরিত্রহীন: ছিরুর চরিত্রের মধ্যে প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রহীনতা। সে অত্যন্ত যৌন তৃষ্ণায় আচ্ছন্ন। ছিরুর চরিত্র নিয়ে স্বয়ং তারাশঙ্কর অনেকটা ব্যঙ্গের স্বরেই বলেছেন, “এই চুয়াল্লিশ বছর বয়সেই এসে সে দন্তহীন, যৌনব্যাধির আক্রমণে তাহার গুলো প্রায়ই সবই পড়িয়া গিয়াছে।” সন্ধ্যার পর যখন যৌনপল্লীতে মদ খেয়ে সব পুরুষমানুষ মাতাল হয়ে নেশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে,“তখন ছিরু নিঃশব্দে পদসঞ্চারে শিকার ধরিতে প্রবেশকরে।” উপন্যাসে পাতু পায়নের বোন দুর্গার সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক ছিলই। যেদিন সে অনিরুদ্ধ স্ত্রীকে পদ্মাকে দেখল সেদিন তার মনে যৌন তৃষ্ণা জেগে উঠেছে। সে ভাবতে থাকে কিভাবে পদ্মাকে সে আনবে “অনিরুদ্ধের অনুস্পতিতে পদ্মা কামারনীকে বাঘের মত মুখে করিয়া-“।
◆ অন্যায় চৌর্যবৃত্তি: ‘কথায় আছে স্বভাব যায় না মলে” ছিড়ু পাল তার একমাত্র উদাহরণ। হঠাৎ বড়লোক হয়ে ওঠা ছিরুপালের চরিত্রের মধ্যে আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো পরের জিনিসের প্রতি লোভ বা চুরি করে সেই জিনিস আত্মসাত করা। তাই সে অন্যের বাঁশঝাড় থেকে রাতের বেলা বাঁশ কেটে নিজের পুকুরে ফেলে রাখে, বাঁশ কাটার ফলে যাতে শব্দ না হয় সেই জন্য হাত করাত দিয়ে বাঁশ কাটে। এমনকি রাতের বেলা খেপলা জাল দিয়ে পরের পুকুরের পোনা মাছ ধরে এনে নিজের পুকুর ভর্তি করে। প্রতিবছর বর্ষার সময় তার ঘরের প্রাচীর নিজেই কোদাল দিয়ে ভেঙে ফেলে দেয়, তারপর সে নতুন প্রাচীর গড়বার সময় অপরের সীমানা কিংবা রাস্তার খানিকটা চেপে গিয়ে করে যাতে তার জায়গা বৃদ্ধি পায়। উপন্যাসিক তাই তার চরিত্রের বর্ণনা করতে গিয়ে একটু রসিকতা করে বলেছেন “এত বড় দেহ লইয়া সে কিন্তু নিস্তব্ধ সঞ্চারে দ্রুত চলিতে পারে।” অথবা “মনে হয় যেন একটা পশু গর্জন করছে”।
◆ ধর্মভীরু: ছিরুপালের চরিত্রের মধ্যে চৌর্যবৃত্তি, অত্যাচারী, অহংকারী, স্বার্থান্বেষী বৈশিষ্ট্য থাকলেও, তার চরিত্রের অন্য আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো সে ধার্মিক। উপন্যাসিক তার ধার্মিকতার পরিচয় দিয়েছেন- ছিরু অবিচলিত ধৈর্য্যে স্থির প্রশান্ত ভাবেই চন্ডীমন্ডপ হইতে নামিয়া বাড়ির পথ ধরিল।” ছিরু যখন কোন ঈশ্বরের স্মরণ করে, ধর্ম-কর্ম বা পূজা পার্বনের মধ্যে রত থাকে তখন সে হয়ে ওঠে এক অন্য জগতের মানুষ, যেন স্বতন্ত্র। সেইদিন কারো সঙ্গে ঝগড়া, বিরোধ বা কারো অনিষ্ট তো করেই না, এমনকি পৃথিবী ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে সে বাঁধনছাড়া হয়ে এক ভিন্ন জগতের মানুষ হয়ে ওঠে। সেদিন তার কথা কথাবার্তায় শুধু মিষ্ঠতায় থাকে না, তার ব্যবহারও দেখা যায় অভিজাতজনোচিত ভদ্রতা ও সাধুতা। ছিরুর ধর্মে ও দেবতার প্রতি ভক্তিতে “পাষণ্ড ছিরুর অন্যায় বা পাপে কোন ভয় নাই। সে পাপ খন্ডনের জন্য কোন ব্যাগ্রতাও নাই। আছে কেবল পরমলোক – প্রাপ্তির জন্য একটি নিষ্ঠা ভরা তপস্যা ও অকপট বিশ্বাস।”
■ ছিরু পাল চরিত্র সম্পর্কে তারাশঙ্করের ভাবনা:
“শ্রী হরিপাল ‘ঘোষ’ হবার জন্য সচেষ্ট ছিল – বাবুদের দিকেই ছিল তার অভিলাষ।”(সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়)
উপন্যাসিক শ্রীহরি ঘোষ বা ছিরু পালের চরিত্রটি শুধুমাত্র উপন্যাসের কাহিনীর প্রয়োজনে ব্যবহার করেননি। তিনি এই চরিত্রের ব্যবহার করে ১৯২০ দশকের একশ্রেণীর গড়ে ওঠা ‘বাবু দলকে’ পাঠকের সম্মুখে তুলে ধরেছেন। যারা বিনা কারণে সহজ সরল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের উপর অকথ্য অত্যাচার চালাত। তারাশঙ্কর গণদেবতার কাহিনীটি নিয়েছিলেন ১৯২০ দশকে যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রেষ তখনো কাটেনি। তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে শহর এমনকি গ্রামগঞ্জেও। এ সময় যে ধনী সে আরো ধনী হচ্ছে, এবং যে গরিব সে আরো গরিব হচ্ছে, ঠিক এর মাঝের অবস্থানে এক উচ্চ অভিজাত্য পরিপূর্ণ ভুইফোঁড় শ্রেণীর অথবা ছিরুপালের মতো চরিত্রের সৃষ্টি হচ্ছে। তৎকালীন শিবকালীপুর গ্রামে ছুতোর, মুচি নিচু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ধানের বিনিময়ে মানুষের কাজ করে দিত কিন্তু বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সবার বাড়িতে ধান থাকতো না, তাই তারা বাকি রেখে দিত,পরে শোধ দেবার জন্য। কিন্তু এর ফলে খেটে খাওয়া মানুষদের সংসার অচল হয়ে যেত, তাই তারা শহরের দোকান দিতে বাধ্য হয়। এর ফলে গ্রামের জমিদার শ্রেণী এবং সাধারণ মানুষেরা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবার ভয়ে সভা ডাকে। এখানে তারাশঙ্কর দেখাতে চেয়েছেন যে তখন সমাজে নীচু শ্রেণীর মানুষেরা কোন ভুল কাজ করলে উচ্চ শ্রেণীর মানুষেরা তার বিচার করতো। কিন্তু উচ্চ শ্রেনীর মানুষদের বিচার হতো না। এছাড়াও তখন যেহেতু বিনিময়ের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হতো তাই টাকার বিনিময়ে পাতু যখন আঙটজুতি না দেয়, তখন শ্রীহরির মতো জমিদার শ্রেণীর লোক তার উপর প্রচুর অত্যাচার চালায়। এমনকি তখনকার প্রশাসনও যে জমিদার শ্রেণীর হাতের মুঠোয় তা জানা যায়, অনিরুদ্ধে যখন শ্রীহরি ধান কেটে নিয়ে যায় তখন জেলে ডায়েরী লেখাতে গেলে অনিরুদ্ধের স্ত্রী তাকে বাধা দেয় কারণ সে জানে শ্রী হরির সঙ্গে পুলিশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে তাই অনিরুদ্ধ শ্রীহরির বিরুদ্ধে ডায়েরি করলে কোন নালিশ গ্রাহ্য হবে না। তারপরে দেখা যায় শ্রী হরি ছলে বলে কৌশলে অনিরুদ্ধকে পনেরো বছরের জন্য কারাদন্ডে পাঠায়। এক কথায়, শ্রী হরি চরিত্রের মাধ্যমে তারাশঙ্করের দেখাতে চেয়েছেন তৎকালীন জমিদাররা কৃষক শ্রেণীর মানুষকে কেমন ভাবে অত্যাচার করত, নিপীড়ন চালাত, এমন কি শিহরির মতো সমাজে নারীরাও সুরক্ষিত ছিল না। তাই সে অনিরুদ্ধের বউয়ের দিকে খারাপ দৃষ্টিতে তাকাতেও দ্বিধা করেনি। শ্রীহরি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক অভিনব সৃষ্টি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের, শরৎচন্দ্র অনেকেই জমিদার শ্রেণীর কথা তুলে ধরেছেন তাঁদের লেখনীতে কিন্তু তারাশঙ্করের মতো এমন বিস্তৃতভাবে, এমন গভীরভাবে, এমন স্পষ্ট ভাবে কেউ প্রকাশ করেননি, যা তারাশঙ্কর গণদেবতা উপন্যাসের শ্রীহরি ঘোষ বা ছিরু পালের চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
তারাশঙ্কর হলেন যুগ পরিবর্তনের সময়ের কথাসাহিত্যিক। সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয় ও নাগরিক সভ্যতার অভ্যুদয় তথা পুঁজিবাদী সভ্যতার গোড়া পত্তনের যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তাঁর সাহিত্য সম্ভার সাজিয়েছেন তিনি। “শুধু চরিত্র সৃষ্টি ও জীবনের মধ্যে মহান, গৌরময় ভাবতরঙ্গের ঘাত প্রতিঘাত ফুটাইয়া তোলার মধ্যে তারাশঙ্করের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ নহে।” তাই তাঁর উপন্যাসে উঠে এসেছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। এই দন্দে বিন্যাস তিনি করেছেন নানা বিভাগে – প্রাচীনের সঙ্গে নবীনদের, ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার দ্বন্দ্ব, প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে প্রগতির দ্বন্দ্ব, এমনকি চরিত্রের মধ্যেও তিনি দ্বন্দ্ব এনেছেন দুই ঘনিষ্ঠ চরিত্রের দ্বন্দ্ব; যেমন দেখা যায়, অনিরুদ্ধের সঙ্গে দেবুর দ্বন্দ্ব, এরা উপন্যাসের প্রথম দিকে খুবই ঘনিষ্ঠ হলেও, শেষেরদিকে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। নায়ক- খলনায়কের দ্বন্দ্বে উপন্যাসে দেখা যায় নায়ক দেবুর সাথে খলনায়ক ছিরুর দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। নারী পুরুষের দ্বন্দ্ব; উপন্যাসে দুর্গার মত নারী থাকলে তো তার সাথে পুরুষদের দ্বন্দ্ব হবেই। সর্বোপরি ঔপন্যাসিকের নিজের সাথে নিজের সাথে দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। তারাশঙ্করের ঔপন্যাসিক প্রবণতা সুখ্যাতিসুক্ষ বিশ্লেষণের দিকে নয়, এমনকি তাঁর যে সৃষ্ট চরিত্রগুলিও অতি জটিল, প্রহেলিকাধর্মী, আত্মকেন্দ্রিকতার বৃত্ত পথে আবর্তনশীলও নয়। সকলেই ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে এগিয়ে চলে, জীবন প্রতিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ এবং সামাজিক ঘাত প্রতিঘাত ও আদান-প্রদানের প্রভাবেই বিকশিত হয়। সেইদিকে তারাশঙ্করের ‘গণদেবতা’ উপন্যাসটি অন্যতম। এই উপন্যাসের খলনায়ক ছিরুপাল সমগ্র উপন্যাসটিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে ভিন্নমাত্রায়। উপন্যাসের শেষের দিকে যদিও তার চরিত্র স্বাভাবিকতা এসেছে। একথা স্পষ্ট যে, ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে ছিরুপালের মতো খলনায়ক চরিত্র পাঠকের মনে দাগ কেটে গেছে।