বাংলা গদ্য সাহিত্যে শ্রীরামপুর মিশন

কলমে : অনন্যা সাহা, বি.এ ( বাংলা ), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়


     পূর্বে আমাদের নিজেদের বাংলা সাহিত্যের জগতে, বাংলা গদ্য উন্নয়নের যে উদ্যোগ ঘোষিত হয়েছিল, সেই উদ্যোগে, শ্রীরামপুর মিশনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। বলাবাহুল্য বাংলা গদ্য চর্চার ক্ষেত্রে শ্রীরামপুরের মিশনারিদের এক বিশেষ ভূমিকা ছিল। খ্রিস্টান মিশনারিরা ১৮০০ সালে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে, কোলকাতার কাছে হুগলীর শ্রীরামপুরে একটি মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এই মিশনের অবদান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থেকে যায়।
তৎকালীন সময়ে ইংরেজরা যখন ভারতে আসে তখন, শিক্ষা বিষয়টিকে তারা বিশেষ প্রাধান্য দিতে শুরু করে। এবং এর পাশাপাশি ইংরেজ শাসন বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে সবরকম কাজের সাপেক্ষে যথাযথ শিক্ষার প্রয়োজন বেশ প্রখর হয়ে ওঠে। সে সময়ে, বিশেষত জীবিকা নির্বাহের তাগিদেও নানান বিষয়ে শিক্ষা থাকাটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ‍্য করা হতে থাকে।
অন্যদিকে দেশের মানুষের সাথে, শাসন কর্তা ইংরেজদেরও শাসনকার্য সুষ্ঠভাবে চালানোর জন্য বাংলা শিক্ষা প্রয়োজনীয় হয়ে পরে। এই প্রয়োজনকেই মাথায় রেখে ধর্মপ্রচারক ইংরেজ মিশনারিরা বাংলা গদ্য রচনার ক্ষেত্রে, বাংলা গদ্যভাষা গড়ে তুলতে ব্রতী হন। মূলত এই উদ্যোগের জন্যই বাংলা গদ্যের উদ্ভবকাল বিশেষ ভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করে। আমাদের আলোচ্য শ্রীরামপুর মিশন উদ্যোগ গ্রহণকারী সংস্থা সমূহের মধ্যে অন্যতম পদের দাবিদার।

শ্রীরামপুর মিশনের প্রেক্ষাপট :
      উইলিয়াম কেরী এবং টমাস সাহেব বঙ্গদেশে আসেন ১৭৯৩ সালে এবং তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার।পরবর্তীতে ১৭৯৯ সালে কেরীর তত্ত্বাবধানে বার্নসডন, গ্রান্ট, ওয়ার্ড, মার্শাম্যান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ বঙ্গদেশে পদার্পন করেন।
নিজেদের ধর্মকে প্রচারের জন্য প্রথমে এই ব্যক্তিরা কলকাতাকেই মূলত নিজেদের প্রচার কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন। ধর্মপ্রচারের মনোভাবনা নিয়েই এই খ্রিস্টান মিশনারিবর্গ ১৮০০ সালে শ্রীরামপুর মিশনের স্থাপনা করেন। এবং এই সালেরই মার্চ মাস থেকে শুরু হয় প্রেসের সমস্ত রকম কার্যাবলী।
প্রসঙ্গত বাংলা গদ্য সাহিত্যের জগতে শ্রীরামপুর ত্রয়ী তথা উইলিয়াম কেরী, মার্শম্যান এবং ওয়ার্ড এর অবদান অবিস্মরণীয়। কারণ তাঁরা প্রথমদিকে ধর্মচর্চার খাতিরে, বাইবেল অনুবাদের কাজ শুরু করলেও, এই অনুবাদ পরবর্তীতে বাংলা গদ্যের এক স্বচ্ছ দৃষ্টান্তে পরিণতি লাভ করে। সে সময় তাঁরা ভেবেছিলেন তাঁদের তত্ত্বাবধানে,রামায়ণ ও মহাভারতের পাশাপাশি দেশীয় ভাষায় বাইবেল প্রকাশ করলে, দেশীয় জনসাধারণ খ্রিষ্ট ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হবে। ফলত সময়ের সাথে ধীরে ধীরে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে শ্রীরামপুর মিশন থেকে বাংলা সহ প্রায় কুড়িটি ভাষায় বাইবেল প্রকাশিত হতে থাকে। কিন্তু তাঁদের এই উদ্দেশ্য সফল হয়না।
আসলে বাংলা ভাষার ভিত্তি তাঁদের দ্বারা প্রকাশিত এই অনুবাদ গুলির জন্য কখনোই আলগা হয়না বরং তাঁদের এই অনুবাদগুলি, বাংলা গদ্য ভাষার বিবর্তনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে রয়ে যায়।

ছাপাখানা এবং প্রকাশনালয় হিসেবে শ্রীরামপুর মিশনের গুরুত্ব :
     তৎকালীন সময়ে শ্রীরামপুর মিশনারিদের নানান বিষয়ে বিশেষ অবদান ছিল। যে অবদানগুলির মধ্যে অন্যতম হলো শ্রীরামপুর মিশনে প্রকাশনালয় নির্মাণ। এই ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই সময়ে বাঙালি সমাজে সার্থক ভাবে শিক্ষাবিস্তার ঘটে।
শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনটি ১৮০০ সালে মার্শাম্যান, উইলিয়াম কেরী এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এই ত্রয়ী প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে একজনের উদ্যোগে (উইলিয়াম কেরী) ১৮০০ সালেই একটি পুরাতন ছাপা মেশিন শ্রীরামপুর মিশনে আনা হয়। এবং এর কিছু সময় পরে এই ছাপা মেশিনেরই এক উন্নত রূপকে এই মিশনে প্রবেশ করানো হয় এবং এই ভাবেই এই স্থানে ছাপা মেশিনের সংখ্যা বাড়তে থাকে ও ১৮২০ সালের মধ্যে প্রায় ১৮ টি ছাপা মেশিনের অবস্থান শ্রীরামপুর মিশনে পরিলক্ষিত হয়।
প্রথম দিকে ছাপা খানায় ইংরেজি ভাষার হরফের কাঠের ব্লক তৈরি করে বই ছাপার কাজ চালানো হতো। পরবর্তীতে বই ছাপানোর জন্য ধাতুর ইংরেজি এবং বাংলা হরফের নির্মাণ করা হয়। প্রসঙ্গত শ্রীরামপুর মিশনের মুদ্রণ বিভাগের সাথে নিযুক্ত ব্যক্তি বর্গের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন পঞ্চানন কর্মকার, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য প্রমুখ ব্যক্তি সকল। মূলত বিদেশীদের উদ্যোগেই শ্রীরামপুর মিশন থেকে তৎকালীন সময়ে এভাবে বাংলা ও ইংরেজি হরফে নানান ধরণের গ্রন্থ, পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে।

শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত কিছু গ্রন্থাবলি :
•সেন্ট ম্যাথুজ গসপেল এর বাংলা অনুবাদ : মঙ্গলসমাচার মতিউর রচিত (১৮০০) – উইলিয়াম কেরী।
•সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুবাদ :
মুগ্ধবোধ – ব্যোপদেব
অমরকোষ – কলব্রুক সম্পাদিত
Sanskrit grammar (সংস্কৃত গ্রামার) – উইলিয়াম কেরী।
•বাইবেলের অনুবাদ : ধর্মপুস্তক (১৮০১) – রামরাম বসুর সহযোগিতায় উইলিয়াম কেরী অনুদিত।
•সমগ্র বাইবেলের অনুবাদ – ধর্মপুস্তক (১৮০৮)।
•হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুবাদ : কৃত্তিবাসী রামায়ণ (১৮০১), কাশীদাসী মহাভারত (১৮০২) ( মুদ্রিত ও প্রকাশিত)।
•ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষায় লেখা :
ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৮৩১)
বাংলার ইতিহাস (১৮৪৮) – জন মার্শম্যান।
•এছাড়া শ্রীরামপুর মিশন থেকে বাংলা ভাষায় লিখিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় :
দিগদর্শন (১৮১৮), সমাচার দর্পণ (১৮১৮) – জন মার্শম্যান।

শ্রীরামপুর মিশন প্রকাশিত গ্রন্থাবলির গদ্যরীতির বৈশিষ্ট‍্য :
     শ্রীরামপুর মিশন থেকে মুদ্রিত অনুবাদগুলিতে কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট না থাকলেও, বাংলা গদ্যের উদ্ভবের ইতিহাসে এই অনুবাদ গুলির এক বিশেষ গুরুত্ব আছে। মূলত এই অনুবাদ গুলির জন্যই সূচনালগ্নে,বাংলা গদ্যের ভিত্তিমূল নির্মিত হয়।
অনুবাদের ক্ষেত্রে উইলিয়াম কেরী আক্ষরিক অনুবাদের পন্থায় মূলত বেছে নেন। এবং তাঁর অনুবাদে অন্বয়রীতি থাকলেও সেই অন্বয়রীতিও যথার্থ ছিলনা, ছিল দুর্বোধ‍্য এবং অমসৃন। এর থেকে আমরা বলতে পারি এই মিশন থেকে প্রকাশিত গ্রন্থসকলের গদ্য রীতি ব্যাকরণগত দিক থেকে উন্নত না হলেও, ঐতিহাসিক দিক থেকে অনন্য।
শ্রীরামপুর মিশনের উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম প্রচার এবং সেই কারণেই তারা ভারত বাসীকে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি আসক্ত করে তুলতে,তাদের বোধগম্য করে বাংলা গদ্য রচনায় উদ্যোগী হন। যে উদ্যোগ পরে বাংলা গদ্যের স্বতস্ফূর্ত মুক্তির পথকে প্রশস্ত করে তোলে।
এছাড়া গদ্য লিখনের ক্ষেত্রে ছাপা অক্ষরের ব্যবহারও মানুষকে বাংলা গদ্যের প্রতি বিশেষভাবে আকর্ষিত করে।
পরোক্ষভাবে এই প্রতিষ্ঠান বাঙালিকে আত্মসচেতনতায় উদ্বুদ্ধও করে, যার ফলে তারা বাংলা গদ্যের ভবিষ্যত নির্মাণে ব্রতী হতে শুরু করে।
বলাবাহুল্য অতীব সরলতা এবং ভাব বহুল্যতার সাথে রচিত মিশনারিদের লেখাগুলি,পঠন করেই পাঠক সকল বিশেষ ভাবে সাহিত্যের প্রতি আকর্ষিত হয় এবং তাদের মননে, এই সাহিত্যের প্রকরণ হিসেবে বাংলা গদ্যের উন্নয়নের কথা আসে, যা আসলেই বিশেষ তাৎপর্যবাহী।
◆ গদ্যরীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে ১৮০০ সালে প্রকাশিত “মঙ্গলসমাচার মতিউর রচিত” এর কিছু ছত্র পেশ করা হল –

১) “প্রথমে ঈশ্বর সৃজ্জন করিলেন স্বর্গ ও পৃথিবী।”

২) “পরে ঈশ্বর বলিলেন দীপ্তি হউক তাহাতে দীপ্তি হইলো।”

৩) “তখন ঈশ্বর সে দীপ্তি বিলক্ষন দেখিলেন।”

৪) “তৎপরে ঈশ্বর দীপ্তির নাম রাখিলেন দিবস ও অন্ধকারের নাম রাত্রি।”

১৮১২ – ১৮১৩ সালে শ্রীরামপুর প্রেসের কাজ, নতুন ভাবে শুরু হলেও ১৮১২ সালেই এক অগ্নিকান্ডে শ্রীরামপুর প্রেস প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। তবে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পরেও প্রেসটি সে সময় আবার নতুন ভাবে পুনর্গঠিত হয়। এছাড়াও এ সময়ে মিশনারিদের উপর, কোম্পানি দ্বারা চালু করা নিষেধাজ্ঞাও উঠে যায়। ফলত এ সময়ে এই মিশন বিশেষ ভাবে সচল হয়ে ওঠে এবং সাহিত্য, শিল্প, সমাজ ইত্যাদি স্থানে নিজেরদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। বলাবাহুল্য এই ভাবেই শ্রীরামপুর মিশন দ্বারা বাংলা গদ্য সাহিত্যের নবজাগরণ সার্থক ভাবে সাধিত হয়।