সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন সিংহ


              জীবন তরীর খেয়া বাইতে বাইতে মাত্র ২৯ বছরে বাংলা সাহিত্যকে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করেছেন যে মহান ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। তিনি তাঁর জীবনের ছোট্ট পরিসরে বাংলা সাহিত্য তথা বাংলার লোকসমাজকে শিক্ষার উন্নীত আলোকময় জীবন প্রবাহে আবহমান থাকার সুযোগ্য সুযোগ করে দিয়েছেন। যা আজও আমাদের অকপটেই স্বীকার করে নিতে হয়। তিনি শহরতলীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলেই তাঁর রচনার মধ্যে তার প্রত্যক্ষগোচর শহরের বাবু সমাজের বেশ কিছু অভিনব চিত্র ধরা পড়েছে। তিনি বাংলার বাবু সমাজের রীতি, নীতি, আচার, ব্যবহারকে বেশ দীপ্তমানভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর রচনার মধ্যে।

জন্ম ও বংশ পরিচয় –
     ১৮৪০ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা শহরের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোর প্রতাপশালী ব্যক্তি বাবু নন্দলাল সিংহ হলেন সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন সিংহের পিতা। তিনি “সাতু সিংহ” নামেও বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কালীপ্রসন্ন সিংহের বয়স যখন মাত্র ছয় বছর সেই সময় তার পিতা নন্দলাল সিংহ মারা যান। অর্থাৎ যে সময় একজন বালকের নির্ভাবনায় উন্মুক্ত মাঠে খেলে বেড়ানোর সময়, সেই সময় থেকেই তার জীবনে নেমে আসে এক নির্দারুণ কষ্টের উপযোগ। যে সময় একজন বালক তার পিতাকে পায় তার  পিতার আদর্শে নিজেকে আদর্শিত করতে, সেই সময় তাকে করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম। অল্প বয়সে তাঁর জীবনে এক অভিশাপের মতো নেমে আসে কঠোর পরিণতি “পিতৃ বিয়োগ”।  জীবন স্রোতের উন্মুক্ত ধারায় সম্পত্তির লোভ বাপ – মা – দাদা – ভাই – বোন – দিদি কাউকে মানে না। এই যুক্তির দিকে তাকিয়েই সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন সিংহের আত্মীয়রাও তার থেকে পিছুপা হয়নি। তাই সাহিত্যিকের মাকেও হতে হয়েছে এই জ্বালামুখী সমস্যার শিকার। এবং সাহিত্যিকের মাতা ত্রৈলোক্যমোহিনী দেবীকেও পতি বিয়োগের মতো নিদারুণ পরিস্থিতির মধ্যেও মোকদ্দমা লড়তে হয়েছে জ্ঞাতিদের বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে সাহিত্যিক শোক প্রকাশ করেছেন ও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তারঁ বিখ্যাত গ্রন্থ “হুতুম পেঁচার নকশা” তে।

       বাল্য বয়সে সাহিত্যিকের পিতৃবীয়োগ হলেও, এই বিষয়টি তাঁর মনে ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং কঠোর পরিশ্রমী। বর্তমান প্রেসিডেন্সি কলেজ নামে পরিচিত তৎকালীন হিন্দু কলেজ থেকে পড়াশোনা করেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। 1857 সালে তিনি কলেজ পরিত্যাগ করেন এবং পড়াশোনা বাড়িতেই শুরু করেন। বাংলা, ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষায় ছিলেন তিনি অত্যন্ত সুদক্ষ এবং মেধাবী। বাড়িতে নিজেই তিনি ইংরেজি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি একজন লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক এবং সামাজিক কর্মী হিসেবে তিনি বাংলার শিল্প, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিতে তাঁর বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি ছিলেন বাংলার বিখ্যাত পন্ডিত বিদ্যাসাগরের এক সুযোগ্য ছাত্র এবং বাংলার পথিকৃৎ রামমোহন রায়ের আদর্শের অনুগত্য। তিনি গুরু বিদ্যাসাগর কর্তৃক বিধবা বিবাহকে সর্বসাকুল্যে সমর্থন করেছেন।

         সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন সিংহ বাগবাজারের লোকনাথ বসুর কন্যা ভুবন মোহিনী দেবীকে বিবাহ করেন ১৮৫৪ সালে। বিবাহ কালে সাহিত্যিকের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। ভুবনমোহিনী দেবীকে বিবাহ করে সাহিত্যিক দাম্পত্য জীবনে বিশেষ সুখী হতে পারেননি। কারণ অতি অল্প সময়েই তার স্ত্রী ভুবনমোহিনী দেবী এই সুন্দর ভুবন ছেড়ে স্বর্গবাসী হন। সাহিত্যিক তাই দাম্পত্য জীবনে সুখী হওয়ার জন্য চন্দ্রনাথ বসুর কন্যা শরৎকুমারী দেবীকে বিবাহ করে দ্বিতীয়বার দাম্পত্য জীবনে আবার পুনঃপ্রবেশ করেন।

সাহিত‍্যজীবন –
         সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকেই লিখতে শুরু করেন। তাঁর অসাধারণ জ্ঞান ও মেধার কারণে তিনি অতি অল্প সময়ে লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তৎকালীন সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি এবং বিভিন্ন বিষয়গুলিকে তুলে ধরে লেখক লিখতে শুরু করলেন। ১৮৫৪ সালে তিনি প্রথম একটি নাটক রচনা করে লেখক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করলেন। নাটকটি হলো “বাবু নাটক” তিনি তাঁর জীবনের স্বল্প পরিসরে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার কে তাঁর মেধার অফুরন্ত কীর্তি ও শ্রমের মাধ্যমে পরিপূর্ণ করেছেন। এরপর তিনি বেশ কিছু নাটক ও প্রহসণ রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি জনপ্রিয় নাটক হল ১৮৫৭ সালে প্রকাশিত “বিক্রমোর্বশী নাটক” এবং ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত “সাবিত্রী সত্যবান নাটক” এবং ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত “মালতি মাধব নাটক”।

          কালীপ্রসন্ন সিংহ নাটক রচনার মধ্য দিয়ে সাহিত্যক্ষেত্রে প্রবেশ করলেও, শুধুমাত্র নাটক রচনার গণ্ডিতেই আবদ্ধ হয়ে থাকেননি তিনি। তিনি নাটক রচনা করেছেন, আবার একজন দক্ষ অভিনেতার মত নাটকের অভিনয় করেছেন। নাটক ছাড়াও তিনি প্রচুর প্রবন্ধ উপন্যাস ও  রচনা করেছেন। এছাড়াও তিনি বাংলার অনুবাদ সাহিত্যেও একজন বিশেষ প্রনেতা হয়ে দণ্ডায়মান রয়েছেন।

         ১৮৬২ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারকে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ উপহার দিয়েছেন তার জন্য বাংলা সাহিত্যের অনুরাগীগণ আজও গর্বিত। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘হুতোমপেঁচার নকশা’ হল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ মৌলিক রচনা। এই রচনায় তিনি কলকাতার বাবু সমাজের সম্পূর্ণ ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন করেছেন। এছাড়াও এই নকশাতে তিনি তৎকালীন কলকাতার কথ্য ভাষাকে এই সাহিত্য কর্মের মধ্যে স্থান দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম এক অবিস্মরণীয় ও অদ্ভুত ঘটনা যেখানে প্রথম কলকাতার যে অশ্লীল পরিবেশ ও অশ্লীল ভাষা তাকে সাহিত্যে নির্দ্বিধায় তুলে ধরেছেন। তার মাত্র ২২ বছরের উপলব্ধিতে তিনি যে এইরকম অসাধারণ সাহিত্যকর্ম রচনা করতে পারেন এমন ঘটনা কল্পনারও অতীত। এই হুতুম প্যাঁচার নকশা বাংলা গদ্যের উন্নয়নের এক বিশেষ ট্রাফিক বাতির নিদর্শন।

      এছাড়াও ১৮৫৮ সাল থেকে ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত এই আট বছর সময় ধরে তিনি সংস্কৃত মহাভারতের বাংলা গদ্য অনুবাদ করেছেন। তিনি ১৭ খন্ডে এই সংস্কৃত ভাষার মহাভারত কে বাংলায় অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যকে এক অবিস্মরণীয় উপহার প্রদান করেছেন। যার কারণে তিনি বাংলার অনুবাদ সাহিত্যে চির অমরত্বের আসন অধিকার করে নিয়েছেন। এটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত যা বাংলার অন্যান্য সাহিত্যিকদেরও সাহিত্যে একনিষ্ঠ থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়।

      সমসাময়িক অন্যান্য সাহিত্যিকদের মধ্যে শিল্প ও সংস্কৃতির একজন মহান অনবদ্য ব্যক্তিত্ব অনন্য ও অসাধারণ সমাজনীতিবিদ এবং দেশপ্রেমিক সম্পাদক ও সাহিত্যিক বাংলার অনুবাদ সাহিত্যের অমরত্বের আসন সুদৃঢ় করে রাখার জন্য শ্রীমদ্ভগবত গীতার ও বাংলা অনুবাদ করেছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। তিনি জীবিত থাকাকালীন তাঁর এই বিশেষ কীর্তি প্রকাশ করে যেতে পারেননি। তাঁর এই বিশেষ কীর্তি প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর দীর্ঘ ৩২বছর পর অর্থাৎ ১৯০২ সালে তাঁর এই অমূল্য সাহিত্য কীর্তি প্রকাশিত হয় এবং বাংলা সাহিত্য মহলে বিশেষ যশ ও খ্যাতি লাভ করে।

          কালীপ্রসন্ন সিংহের নাম বাংলা সাহিত্যে স্বর্ণাক্ষরে আজও লিপিবদ্ধ। তিনি একজন সার্থক বাঙালি সাহিত্যিক হিসেবে খাতি লাভ করেছেন। একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক হিসেবে মৃত্যুর পরও অমরত্ব লাভ করেছেন। বাংলার প্রাচীন সাহিত্যের বিশিষ্ট ও স্বনামধন্য কলাম ধারক হিসেবে তাঁর আত্ম নিয়োজনের মধ্যেই তিনি বাংলা সাহিত্যকে তাঁর জীবনের স্বল্প আয়তনে, মাত্র ২৯বছরে প্রদান করেছেন ২৯ হাজার বছরের বিদগ্ধ সম্পদ। তিনি ১৮৭০ সালের ২৪ শে জুলাই তাঁর জীবনের অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

কলমে:- অভিজিৎ ঘোষ (বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়)