বাংলা গদ্যসাহিত্যে স্বামী বিবেকানন্দ
কলমে : অনন্যা সাহা, বি.এ ( বাংলা ), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলা সাহিত্যের জগতে নানান গুণী ব্যক্তির মাঝে বিবেকানন্দ মহাশয়ের নামটিও বেশ উজ্জ্বল। তাঁকে একজন ধর্মগুরু তথা সন্ন্যাসীর বদলে যদি একজন গদ্য সাহিত্যিক এবং প্রাবন্ধিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়, তবে তাতে খুব একটা আমাদের অবাক হতে হয়না কারণ তাঁর লিখিত রচনা গুলির এক বিশেষ গুরুত্ব আছে।
আমাদের বাংলার উনিশ শতকীয় নবজাগরণ এক বিশেষ দূত ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ মহাশয়। তিনি একদিকে যেমন সমকালীন সংস্কারাচ্ছন্ন এবং সংকীর্ণ মানব চিত্তে উদারতার জাগরণ ঘটিয়েছিলেন তেমনি পরাধীন ভারতবাসীর অন্তরে তিনি জাগিয়েছিলেন নবজাগরণের চেতনা।
এছাড়াও সর্বজন খ্যাত কালীপ্রসন্ন সিংহ তথা হুতোম,খাঁটি কলকাতার ভাষার রূপ নির্মাণের যে পথ প্রসস্ত করেছিলেন, সেই পথ স্বামী বিবেকানন্দ মহাশয়ের লেখনীর রীতিতে আরও বিস্তার এবং প্রসস্তি লাভ করে।
■ নরেন্দ্রনাথের জীবন-প্রবাহ :
স্বামী বিবেকানন্দ ওরফে, নরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয়ের জন্ম হয় ১২-ই জানুয়ারি ১৮৬৩ সালে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তিনি সামগ্রিক ভাবে উন্নত এবং উর্বর ছিলেন, একাধারে লেখক, দার্শনিক, সন্যাসী, সঙ্গীতজ্ঞ প্রভৃতির তকমা তাঁর উপর সহজেই আরোপ করা চলে। এছাড়া তিনি ছিলেন পরম গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রধান শিষ্য সকলের মধ্যে অন্যতম। নিজ জীবৎকালে তিনি নানা ধরণের কার্য সাধন করেন, যে কার্য গুলির মধ্যে অন্যতম হলো তাঁর বিলেত যাত্রা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে গিয়ে ভারতীয় বেদান্ত এবং যোগ এর দর্শনকে তিনি প্রচার করেন। যা সে সময় পরিধিতে দাঁড়িয়ে, করাটা খুব একটা সহজ বিষয় কোনোভাবেই ছিলনা। এছাড়া অনেক সমালোচক গণের মতে, তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতকের এক অন্যতম ধর্মপ্রচারক, মূলত তাঁর তত্ত্বাবধানেই সে সময়ে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে পারস্পরিক ভাতৃত্বমূলক যোগসূত্রের সৃষ্টি হয় এবং বিশ্বের দরবারে হিন্দু ধর্মকে অন্যতম এক ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তথাপি আমরা বলতে পারি তিনি ছিলেন, তৎকালীন সময়ের হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণের অন্যতম একজন উদ্যোক্তা।
এরই পাশাপাশি পরাধীন ভারতে সত্যার্থ জাতীয়তাবাদী জয়গানও তিনি সে সময়ে গেয়ে যান। তিনি বলে যান “ওঠো জাগো লক্ষ্যে না পৌঁছনো পর্যন্ত থেমোনা।”
কলকাতার এক উচ্চ হিন্দু পরিবারে তাঁর জন্ম হয়।পরিবারের সান্নিধ্যে নির্দিষ্ট ভাবে বলতে গেলে নিজ মাতার সান্নিধ্যে তাঁর জীবনের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটে। এর পরে তিনি আসেন রামকৃষ্ণদেবের সংস্পর্শে, তাঁর তত্ত্বাবধানে নরেন্দ্রনাথের মননের আর এক বিশেষ ধরণের বিকাশ ঘটে যে বিকাশে ছিল অলৌকিক ঈশ্বরিক সাধনার প্রকাশ। পরবর্তীতে রামকৃষ্ণদেবের মৃত্যুর পরে তিনি বিশ্ব ভ্রমণে বেরোন এবং ১৮৯৩ সালে তিনি বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় ভারত এবং হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তাঁর নানা ধরণের বহুমুখী কার্যকলাপের কারণে, যুগের সাপেক্ষে তাঁকে “বীর সন্ন্যাসী” নামে আখ্যায়িত করা হয়।
■ বিবেকানন্দ রচিত কিছু রচনার আঙ্গিকগত কথা :
“বর্তমান ভারত” প্রবন্ধে, ভারতবর্ষের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, জীবনদর্শন, রাষ্ট্রশক্তির বিবরণ, রামকৃষ্ণদেবের বাণী ইত্যাদির কথা বর্তমান আছে। এছাড়া মানবজাতির ওঠা-পরার এক সুচিন্তিত সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসও এর মধ্যে নিহিত ছিল। নিম্নে এই রচনার ভাষার নমুনা দেওয়া হল –
“সিংহের সর্বনাশেচ্ছা পুরোহিতহস্তধৃত আধ্যাত্বরূপ কশার তাড়নে নিয়মিত।”
এই বর্তমান ভারত প্রবন্ধেই ভাষার আরও এক ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট দেখা যায় তা হলো চলিত ভাষার সাথে সাধু ভাষার যুগলমিলন ঘটানো, যে ভাষা, ছিল সহজ,সরল এবং সাবলীল –
“ভুলিও না তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত…”।
এছাড়া তাঁর লিখিত ভ্রমণ কাহিনী, চিঠি, ডায়েরি এগুলিতে ছিল, দুই বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট-এর সহাবস্থান। একদিকে দীপ্তি অন্য দিকে নমনীয়তা এ সকলই তাঁর রচনার পটভূমিতে ছিল।
ভক্তি, আবেগ, ভাবাকুলতা, মনন এই সবকিছুও তাঁর লেখনীর মধ্যে বর্তমান ছিল।
এই কারণে তাঁর সম্মন্ধে অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসু বলেছিলেন, –
“স্বামীজীর বাকরীতি ও রচনারীতির মধ্যে আশ্চর্য সরস গভীরতা ছিল, যা তাঁর ব্যক্তিত্বেরই রূপ।”
এর পাশাপাশি চলিতের ক্লাসিক ঝংকার সৃষ্টিতেও তিনি এক বিশেষ ভূমিকা অবলম্বন করেন। বলাবাহুল্য তিনি ছিলেন বাংলা চলিত গদ্যের এক শ্রেষ্ঠ শিল্পী।
এই কারণ বশত প্রমথনাথ বিশী তাঁর লিখিত চলিত ভাষা সম্বন্ধে বলেছিলেন, “এ হচ্ছে ‘A young man in a hurry’- এর ভাষা।”
তবে তাঁর লিখিত ভাষার এই গতিশীলতার মধ্যেও ছিল ব্যক্তিত্বের উষ্ণতা।
অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন,
“স্বামীজী প্রতিদিনের প্রচলিত মুখের কথাকে কোনদিন অসম্মান করেননি, চলিত বাংলায় নাগরিক ইডিয়ম তাঁর রচনায় যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে।”
১৮৯৯ সালে স্বামীজী যখন দ্বিতীয়বারের মতন বিলেতে যান তখন, স্বামী ত্রিগুনাতীতানন্দের অনুরোধে স্বামীজী তাঁর ভ্রমণের বিবরণ নিয়মিত লিখে পাঠাতে থাকেন। যে,পত্রকারে লিখিত ভ্রমণ কাহিনী গুলি সে সময় উদ্বোধন পত্রিকায় “বিলাতযাত্রীর পত্র” শিরোনামে প্রকাশিত হত।
এবং পরিবর্তীকালে পত্রিকাটির প্রত্যেকটি সংখ্যা থেকে লেখা গুলিকে, সংগ্রহ করে একত্রে পরিব্রাজক নাম দিয়ে প্রকাশিত করা হয়। এই রচনা রীতির একটি নমুনা নিম্নে দেওয়া হলো –
“আর আমরা উদগ্রীব হয়ে, পায়ের ডগায় দাঁড়িয়ে বারান্দায় ঝুঁকে, ঐ আসে ঐ আসে…”।
■ স্বামী বিবেকানন্দের রচনাসমূহ ও তার পটভূমিকা :
স্বামী বিবেকানন্দের লেখনী বৈশিষ্টকে অনুধাবন করার জন্য যে বিষয়টিকে আমাদের বিশেষ ভাবে খেয়াল করতে হবে, সেটি হল তাঁর রচিত প্রবন্ধ সমূহের মূল বিষয় আখ্যান। যে বিষয় আখ্যানে ছিল ভক্তি, মনন, আবেগ, ভাবকুলতা এবং ধর্ম।
তবে শুধু প্রবন্ধ নয়, তাঁর লিখিত অসংখ চিঠি পত্র এবং বক্তৃতা সমূহেও তাঁর গদ্য সাহিত্যিক সত্তার, অসামান্য লেখনী দক্ষতার পরিচয় মেলে। প্রসঙ্গত নিম্নে আমরা তাঁর লিখিত কিছু প্রবন্ধের নাম করলাম,
◆ “প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য”(১৯০২),
◆ “পরিব্রাজক”(১৯০৫),
◆ “বর্তমান ভারত”(১৯০৫),
◆ “ভাববার বিষয়”(১৯০৭)।
এছাড়া তাঁর অসংখ্য ইংরেজি ভাষায় লিখিত চিঠির মাঝে,বাংলা ভাষায় লিখিত চিঠিগুলির পটভূমিতে আছে বাংলা গদ্য সাহিত্যের কিছু বিশেষ উপাদানের অস্তিত্ব। যে উপাদান গুলির মূলে বাংলা ভাষার ঐশর্যশীলতা এবং ভাবের প্রাঞ্জল প্রকাশ বর্তমান।
আমরা সকলেই জানি স্বামীজী একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন, তবে শুধুমাত্র ধর্মই যে তাঁর মূল উপজিব্য ছিল তা কিন্তু নয়। বলাই বহুল্য তাঁর লেখনীর আনাচে-কানাচে ধর্মের প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর দক্ষ গদ্য সাহিত্যিত্তিক সত্তার,কলমের আঁচড়ে।
তিনি সারা ভারত পরিক্রমা করে, ভক্তি ও সত্যের যে সাধ্যসার উপলব্ধি করেছিলেন তাই তিনি ফুটিয়ে তোলেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। ফলত আমরা এ কথা বলতে পারি যে,তাঁর জীবন অভিজ্ঞতাই আসলে তাঁর, গদ্যের ভাষাকে আরও ভাবময় করে তোলে।
■ বিবেকানন্দের লেখনীতে বাংলা গদ্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য :
•তাঁর লেখনীতে চলিত ভাষার সাথে ছিল তৎসম শব্দাবলীর সার্থক সামঞ্জস্যপূর্ণ মিশ্রণ।
•এছাড়াও তাঁর লিখিত কিছু , ভাষারীতিতে ছিল কথোপকথনের ভঙ্গি।
•তাঁর গদ্য রীতি ছিল সাবলীল এবং গতিময়।
•প্রবন্ধিক হিসেবে তাঁর গদ্য ভাষায়, পরিহাস রসিকতাও লেখনী বহির্ভুত ছিলোনা।
•ক্লাসিক রীতির সাধু ভাষার প্রকাশও তাঁর লেখনী বৈচিত্রে বিদ্যমান।
•ভাবের এবং সাবলীলতার সার্থক বহিঃপ্রকাশও তাঁর গদ্য রীতির অন্যতম বৈশিষ্ট।
•সজীব, সতেজ এবং প্রাণবন্ত ভাষার দৃষ্টান্ত তাঁর লেখনীর অন্তর্গত।
•তিনি নিজের দক্ষতার জোড়ে, বিশ শতকের বাংলা গদ্যের চলিত ভাষায়,এক অপূর্ব ধ্বনিগম্ভীর ক্লাসিক ঝংকার সৃষ্টি করেন।
•তৎসম, তদ্ভব, দেশি এই প্রত্যেক রকমের শব্দের ব্যবহার তিনি তাঁর লেখায় যথার্থ ভাবে করেন।
•তাঁর লিখিত ধ্রুপদী গদ্যরীতি , এ কথায়,
প্রমান করে যে, সবসময় বেশি তৎসম শব্দের ব্যবহারে যে, ভাষা জটিল ও কৃত্তিম হয়ে ওঠে এ কথা সর্বকালের প্রেক্ষিতে কিন্তু সঠিক নয়।
•প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ভাষা সম্মন্ধে তিনি তাঁর এক প্রবন্ধে একদা বলেছিলেন, “ভাষা ভাবের বাহক। ভাবই প্রধান, ভাষা পরে”।
৪ ই জুলাই ১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দ পরলোক গমন করেন। মৃত্যু অনিবার্য হলেও, সে সময়ে এ মৃত্যুর ফলে আমাদের বাঙালি সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ মনীষীর বিয়োগ ঘটে এবং যে বিয়োগের বিকল্প কিছু ছিলনা। জানা যায় তিনি নিত্য কর্ম সেরে, মহাসমাধিতে নিমগ্ন হয়ে নিজ মৃত্যু বরণ করেন। তবে এই মৃত্যু তাঁর শারীরিক সত্তার বিলোপন ঘটালেও, তাঁর কৃতকর্মের মাহাত্মকে বিলোপ করতে পারেনি। তাঁর জীবৎকালে করে যাওয়া প্রত্যেক কর্মই অতীব উজ্জ্বলতার সাথে সেকালের ন্যায় এ কালেও রয়ে গিয়েছে।