বাংলা গদ্যসাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান
কলমে : অনন্যা সাহা, বি.এ ( বাংলা ), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রথমেই বলা চলে, এই লেখার মুখ্য যিনি তিনিই আমাদের সর্বপ্রথম, শিশুবেলার বর্ণ পরিচয় পাঠ প্রদান করেন। আসলে মূল কথাটি এটাই যে,তাঁর রচিত অক্ষর পুস্তিকার সান্নিধ্যেই আমরা আমাদের ছেলেবেলার অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন করি। তবে এই পরিচয়টির পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্বের নানা পরিচয় তথা,দিক আছে যে দিক গুলির মধ্যে, একটি দিক না উল্লেখ করলেই নয়, সেটি হলো তিনি ছিলেন আমাদের বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক। শুধু মাত্র লিখতে পারতেন বলেই যে তিনি লেখা লিখতে শুরু করেন তা নয়। তিনি লিখতে শুরু করেন মূলত বাংলা গদ্যকে এক সংযত এবং বিশিষ্ট রূপ প্রদানের উদ্দেশ্যে। যে উদ্দেশ্য সময়ের সাথির সার্থকভাবে সাফল্যতাও লাভ করে।
এই কারণ বশত স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্মন্ধে বলেছিলেন, তিনিই ছিলেন তৎকালীন বাংলা গদ্য নির্মাণের এক যথার্থ শিল্পী।
প্রসঙ্গত আমরা ব্রাহ্মসমাজের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার কথা বলতে পারি। ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র স্বরূপ এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন অক্ষয়কুমার মহাশয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই সময় এই পত্রিকার সম্পাদকীয় দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, বিদ্যাসাগর মহাশয়। বলাবাহুল্য এই সময়েই তাঁর অসাধারণ সাহিত্যিক ও কাব্যিক মনোভাবের প্রমাণ মেলে এবং ১৮৪৭ থেকে ১৮৬৫ সালের সময় পর্বটি তাঁর পর্ব অর্থাৎ “বিদ্যাসাগর পর্ব” হিসেবে বৃহৎ পরিচিতি লাভ করে, যে পরিচিতির প্রাধান্য আজও ক্ষুন্ন হয়নি।
■ জন্ম ও তাঁর পারিবারিক-কর্ম জীবন :
২৬শে সেপ্টেম্বর ১৮২০ সালে বিদ্যাসাগর মহাশয় জন্মগ্রহণ করেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের, বীরসিংহ গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। অপেক্ষাকৃত এক দরিদ্র পরিবারেই তাঁর বড়ো হয়ে ওঠা। বলাবাহুল্য অসহনীয় দুঃখ ও দারিদ্রতা, তাঁর আবাল্য সঙ্গী ছিল। তবে নিজেকে এই দুঃখের জঞ্জালে না জড়িয়ে তিনি নিজ বুদ্ধিমত্তার জোড়ে,এক মেধাবী এবং উদার চিন্তক মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এছাড়া তাঁর সমাজ সংস্কারক সত্তাও তাঁকে এক ভিন্ন, তকমা প্রদান করে। প্রথম জীবনে, ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হওয়ার সুবাদে তিনি সংস্কৃত কলেজেই যোগদান করেন।
১৮৪১ সালে “বিদ্যাসাগর” উপাধি তিনি লাভ করেন, বিপুল শাস্ত্র অধ্যায়নের দরুণ এবং ১৮৪১ সালেই তিনি ফোর্ট উইলাম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পন্ডিত হিসেবে যোগদান করেন। এবং এর পরে ১৮৪৬ সালে সংস্কৃত কলেজের সহকারী অধ্যক্ষপদে যোগদান করেন এবং ১৮৫০ সালে তিনি অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন। জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তই তিনি, শিক্ষাবিস্তার এবং সমাজ সংস্কারে অতিবাহিত করেন।
তাঁর লিখিত রচনা গুলিকে দুইভাগে ভাগ করা চলে, যথা অনুবাদমূলক এবং মৌলিক। তাঁর লিখিত মৌলিক রচনা গুলি মূলত তর্কবিতর্কমূলক। এবং অন্যদিকে তাঁর অনুবাদমূলক রচনার গুলিতে আছে বিচিত্রতা এবং অনন্যতার আভাস। গদ্যভাষাকে আরও রসবহুল এবং লঘুচালের করে তুলতে তাঁর হিন্দি, সংস্কৃত এবং ইংরেজি ভাষায় অনুদিত গদ্যগ্রন্থগুলির বিশেষ ভূমিকা বিদ্যমান।
■ বিদ্যাসাগর মহাশয় লিখিত রচনাসমূহ :
নিম্নে বিদ্যাসাগর মহাশয় রচিত এবং সম্পাদিত কিছু গ্রন্থ সমূহের এক সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা হলো :
•বর্ণপরিচয়
•ঋজুপাঠ
•সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমিকা
•ব্যাকরণ কৌমুদী
•বেতাল পঞ্চবিংশতি
•শকুন্তলা
•সীতার বনবাস
•মহাভারতের উপক্রমিকা
•বামনাখ্যানম
•বাঙ্গালার ইতিহাস
•জীবনচরিত
•বোধদয়
•কথামালা
•চরিতাবলি
•ভ্রান্তিবিলাস
•ব্রজবিলাস
•রত্নপরীক্ষা
•শব্দমঞ্জরী
•অন্নদামঙ্গল
•শিশুপালবধ
•কুমারসম্ভব
•বাল্মীকি রামায়ণ
•মেঘদূতম
•উত্তরচরিতম
•হর্ষচরিতম
■ বাংলা গদ্য রীতিতে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অবদান :
•তাঁর হাতেই প্রথম,প্রায় সরল গদ্য সাহিত্যের জন্ম হয়।
•তাঁর রচিত গদ্য ছিল, আতিশয্যহীন ও মধ্য পন্থা অনুসারি।
•তিনি মূলত গদ্যের ভরসাম্য রক্ষার খাতিরে, মধ্য পন্থা অবলম্বন করেন।
•এছাড়া বঙ্কিমচন্দ্রের আগেই তিনি, রচনার বিষয়ের প্রয়োজন অনুসারে ভাষা সরল এবং জটিল করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।
•তিনি নিজ রচিত গদ্যের মধ্যে সাবলীল গতিময়তা আনেন, লয়, যতি এবং ছন্দ আনার মাধ্যমে।
•বাংলা গদ্যে নিহিত বোধের ভাষাকে, কাব্য রসের পর্যায়ে উত্তরণ করতেও তিনি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন।
•এছাড়া নিয়ন্ত্রিত, শাসিত এবং সংশোধিত বাক্য পুঞ্জ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি বাংলা গদ্যে সার্থক সম্পূর্ণতা আনেন।
•বাংলা গদ্য বুননের ক্ষেত্রে, বাংলা ভাষায় অসমাপিকা ক্রিয়ার দ্বারা জটিল বাক্যবন্ধ নির্মাণ এর পাশাপাশি ভাষার সহজ স্বরূপ উদ্ঘাটনেও তাঁর কৃতিত্ব লক্ষ্য করা যায়।
•বাক্যের মধ্যে, বাংলা ফ্রেজ ও ক্লজ প্রয়োগ করে বাংলা ভাষার ব্যবহারযোগ্যতাকে আরো সমৃদ্ধ করেন।
•’গমন করিলেন’, ‘শ্রবণ করিলেন’ ইত্যাদি ধরণের সংযুক্ত ক্রিয়াপদের ব্যবহারও তাঁর গদ্য রীতিতে পরিলক্ষিত।
•বাক্যগঠন রীতি এবং কমা-সেমিকোলনের যথার্থ ব্যবহার তাঁর রচনাতেই সেই সময় প্রথম চোখে পরে।
■ বাংলা গদ্যসাহিত্য ও বিদ্যাসাগর মহাশয় :
আমাদের বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অবদান নিয়ে অনেকেই অনেক ধরণের বক্তব্য রাখেন, যে বক্তব্য গুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে আমরা ধরতে পারি স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্যটি, তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয় সম্মন্ধে বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজ লিখিত গদ্যভাষার দ্বারাই বাংলা সাহিত্যের উৎশৃঙ্খল জনতাকে ‘সুশৃঙ্খল, সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত এবং সুসংগত’ করে তুলেছিলেন এবং তিনিই বাংলা গদ্য সাহিত্যকে সহজ গতি ও কার্যকুশলতা প্রদান করেছিলেন। এছাড়া কবিগুরু এও বলেন যে, বিদ্যাসাগর মহাশয়ই বাংলা গদ্যের ভাষার অভ্যন্তরীণ ভাবকে ক্ষেপন করেন, পলিমৃত্তিকা ক্ষেপণের ন্যায়। সেই সময় কালে রামমোহন রায়ের দ্বারা বাংলা সাহিত্যের মূল ভিত্তি প্রস্তর নির্মাণের পরে, বিদ্যাসাগর মহাশয় এই দৃঢ় ভিত্তি যুক্ত বাংলা গদ্য সাহিত্যের মধ্যে আনেন ভাব বাহুল্যতার সার্থক প্রকাশ। অর্থাৎ তাঁর ছোঁয়ায় বাংলা গদ্য বিবিধ ধরণের ভাব প্রকাশের কান্ডারীতে পরিণতি লাভ করে।
বাংলা গদ্য রীতির মধ্যে উপযুক্ত যতিচিহ্ন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এক বিশেষ ভূমিকা ছিল। বলাবাহুল্য তিনি অতীব নিখুঁত ভাবে, যেকোনো বাক্যের ধ্বনিঝংকারকে অনুধাবন করেই মূলত গদ্যছন্দের আবিষ্কার করেন।
তথাপি,বাংলা ভাষাসাহিত্যিক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় গদ্যসাহিত্যিক বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে যথার্থই বলেছিলেন,
“মৃত্যুঞ্জয় এই নবজাত ভাষাশিশুকে সূতিকাগৃহে স্তন্য দিয়েছিলেন; রামমোহন ইহাকে কৈশোরক্রীড়ার ক্ষেত্রে আপন নৈপুণ্য ও শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে শিখাইয়াছিলেন ; ঈশ্বরচন্দ্র ইহাকে পূর্ণ যৌবনের গারহস্তাশ্রমে প্রতিষ্ঠিত করিয়া জীবনের বিচিত্র কর্তব্য পালনের উপযোগী দীক্ষায় অভিষিক্ত করিয়াছেন।”
নিম্নে তাঁর লিখিত কিছু গদ্য ভাষার দৃষ্টান্ত দেওয়া হলো :
“অতি অল্প হইলো” / “আবার অতি অল্প হইলো” (তাঁর রচনায় গল্প শোনানোর ভাষার দৃষ্টান্ত)
১) “বাছা শুনিলাম, আজ তোমার বড় অসুখ হয়েছিল…”
২) “…আজ বড় অসুখ হয়েছিল, এখন অনেক ভালো আছি।”
৩) “লক্ষণ বলিলেন, আর্যে! এই সেই জনস্থান মধ্যবর্তী প্রস্রবন গিরি।”
শেষে বলা চলে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনিশ শতকের এক বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন । সেই সময় তিনি একাধারে, একজন শিক্ষাবিদ, গদ্যকার এবং সমাজ সংস্কারক ছিলেন। এক কথায় বলতে গেলে তিনিই ছিলেন বাংলা গদ্যের সর্বপ্রথম সার্থক রূপকার। তবে তত্ত্বগত দিক থেকে বলতে গেলে তিনি বাংলা গদ্যের জনক নন। এর কারণ তাঁর আবির্ভাবের অনেক পূর্বকাল থেকেই বাংলা গদ্য রচনার শুরু হয়। কিন্তু পূর্বের গদ্যগুলির মধ্যে অসংলগ্নতার ছাপ স্পষ্ট ছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয় এসেই মূলত বাংলা গদ্যের এই অসংলগ্নতাকে দূর করে,বাংলা গদ্যের এক সাধু মান্য রূপ নির্দেশ করেন এবং এই সাধু রূপের সাথে বাংলা গদ্য সাহিত্যে চলিত রূপেরও প্রবেশ তিনি ঘটান। এছাড়া সে সময়ে তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে, সেই লিপি গুলিকে সহজবোদ্ধ করে তোলেন। ফলত আমরা এ কথা বলতেই পারি যে, তাঁর বহুমাতৃক গুণ তাঁকে, বাংলা গদ্য সাহিত্যের জগতে এক অনন্য স্থান প্রদান করে। যে স্থানটির গুরুত্ব আজও বর্তমান।