ঈশ্বর গুপ্ত – যুগসন্ধিক্ষণের কবি


     ভারতচন্দ্রের মৃত‍্যুর পর বাংলা কাব‍্য জগত ‘গোধূলি আকাশের পতঙ্গের মত’, তারপর বাংলা কাব‍্যে আধুনিকতার প্রথম সার্থক মুক্তি যদিও মধুসূদনের হাতে তবুও কবি ঈশ্বর গুপ্ত বাংলা কবিতায় নিয়ে এলেন এক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গী, যা তাঁর পূর্বের কবিদের কাব‍্যে ছিল না।

ব্রজেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ‍্যায় তাই যথার্থ‌ই বলেছেন,
“কাব‍্য সাহিত‍্যে পুরাতন ধারায় তিনি শেষ কবি এবং নতুন ধারার তিনি উদ্বোদ্ধা”

     কবিওয়ালাদের অবক্ষয়ের যুগে কলকাতাকে কেন্দ্র করে মধ‍্যযুগ থেকে বাঙালি ক্রমশ নবযুগের পথে পদক্ষেপ ফেলতে শুরু করে। একদিকে যেমন গদ‍্যের বিকাশ, সাময়িক পত্রের প্রকাশ, হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা নবযুগোচিত ঘটনা ঘটে চলেছিল, ঠিক তার‌ই পাশাপাশি পাঁচালি, কবিগান, আখড়াই প্রভৃতি অবলম্বন করে বাঙালির কাব‍্যচর্চা একটা নিম্নতর খাতে প্রবাহিত হচ্ছিল। ঠিক এই সময় গুপ্ত কবির আগমন বাংলা কাব‍্যজগতে এক নতুন সাড়া ফেলে দিয়েছিল। উনিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে প্রায় মধ‍্যভাগ পর্যন্ত বাংলা সংস্কৃতি ও কাব‍্যকবিতায় বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

কবিওয়ালাদের অনুবর্তন করেই বাংলা কাব‍্যজগতে ঈশ্বর গুপ্তের প্রথম আবির্ভাব। গুপ্ত কবির আখড়াই, হাফ আখড়াই জাতীয় ছয়টি কবিতা বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সঙ্কলনে উদ্ধার করেছেন।

ঈশ্বর গুপ্ত সম্পর্কে তাই বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন – “সেকাল আর একালের সন্ধিস্থলে ঈশ্বর গুপ্তের প্রাদুর্ভাব”

কবিওয়ালাদের প্রতি সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধার্থে ঈশ্বরচন্দ্র তাঁদের জীবনী ও গান সংগ্রহ করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র যদিও তাঁকে ভারতচন্দ্রের অনুগামী বলেছেন, কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের উপর রামপ্রসাদের প্রভাব বরং বেশি।

    তবে, পুঁথিগত বিদ‍্যা ঈশ্বর গুপ্তের বিশেষ না থাকলেও জীবনের ব‍্যবহারিক ও বাস্তব ক্ষেত্রে তাঁর সাধারণ জ্ঞান খুব তীক্ষ্ণ ছিল। ব্রাহ্মসমাজের প্রতি তাঁর খুব শ্রদ্ধা বিশ্বাস ছিল। ঈশ্বর গুপ্ত ব্রাহ্মসমাজের অধিবেশনে প্রায়‌ই যোগদান করতেন, বেদান্ত তত্ত্বের প্রতি তাঁর অন্তরের আকর্ষণ ছিল। ইংরাজি না জানলেও ঊনবিংশ শতাব্দীর আবহাওয়া থেকে দূরে ছিলেন না। বিদ‍্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলন ঈশ্বর গুপ্ত পছন্দ করতেন না, সিপাহি বিদ্রোহে সিপাহিদের চেয়ে তিনি ইংরেজদের বেশি গুণগান করেছিলেন। কিন্তু এসব মনোভাব পোষণ করার জন‍্য তৎকালীন অন‍্যান‍্য জ্ঞানীগুণী ব‍্যক্তিদের খেয়াল করে তাঁকে পুরাতন পন্থী বলা ঠিক হবে না। কবিতার এবং সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয় নিবন্ধে তিনি ইংরাজি শিক্ষা, ভারতীয় রীতিতে স্ত্রী শিক্ষা, বিশ্ববিদ‍্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রগতিশীল ব‍্যাপারে সর্বদা সমর্থন করেছেন। এই প্রভাকরের পাতাতেই প্রাচীন কবিওয়ালাদের জীবনী ও গান সংগ্রহ করে ঈশ্বর গুপ্ত মধ‍্য ও আধুনিক যুগের কাব‍্যধারার যে মিসিং লিঙ্ক খুঁজে বের করেছিলেন তা এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। ভারতচন্দ্র ও কবিওয়ালাদের হানিকর প্রভাব তাঁর কবিত্বকে মাটি করে দিয়েছে। কিন্তু প্রায় অশিক্ষিত হয়েও আধুনিক জীবনের ভাবধারা সম্পর্কে সচেতন থাকা, কবিতাতে পুরাতন পন্থী হয়েও বাস্তব চিত্র অঙ্কন করা, স্বদেশিক মনোভাব ও রঙ্গব‍্যঙ্গের তীক্ষ্ণতা সৃষ্টি এবং নতঙন পুরাতনের যুগপৎ প্রভাব স্বীকার করে নেওয়া ঈশ্বর গুপ্তের কবি প্রতিভার এক বড় বৈশিষ্ঠ‍্য। বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু, রঙ্গলাল, অক্ষয়কুমার, দ্বারকানাথ অধিকারী, মনমোহন বসু – নবযুগের অনেকেই তাঁর শিষ‍্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

বঙ্কিমচন্দ্র গুপ্তকবি সম্পর্কে বলেছেন –
“মধুসূদন, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ শিক্ষিত বাঙালি কবি, ঈশ্বর গুপ্ত বাংলার কবি। এখন আর খাঁটি বাঙালি কবি জন্মে না, জন্মিবার জো নাই, জন্মিয়া কাজ নাই।”
(ঈশ্বরগুপ্তের জীবন চরিত ও কবিত্ব : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ‍্যায়)

      ঈশ্বর গুপ্তের ব‍্যক্তিচেতনার মূলে ছিল এক দ্বৈতরূপ, তাঁর সাহিত‍্যকর্মে গদ‍্যে ও পদ‍্যে সে দুটি রূপ পৃথক মূর্তি নিয়ে লেখা গিয়েছে। গদ‍্য লেখক ঈশ্বর গুপ্ত ছিলেন সেকালের অনেক আধুনিকের অগ্রণী – পরবর্তীকালের পুষ্টতর আধুনিকতার পথিকৃৎ, কিন্তু পদ‍্য লেখক গুপ্ত কবি ছিলেন একান্ত অনাধুনিক ; প্রাচীনের স্বকীয়তাহীন অনুবর্তীমাত্র।

বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন, “ঈশ্বর গুপ্তের কাব‍্য চালের কাঁটায়, রান্নাঘরের ধূয়ায়, নাটুরে মাঝির ধ্বজির ঠেলায়, নীলের দাদনে, হোটেলের খানায়, পাঁঠার অস্থিস্থিত মজ্জায়”
(ঈশ্বরগুপ্তের জীবন চরিত ও কবিত্ব : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ‍্যায়)

গুপ্ত কবি ঈশ্বর, নীতি, প্রকৃতি, স্বদেশপ্রেম ও সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে অসংখ‍্য কবিতা লিখে সংবাদ প্রভাকরে প্রকাশ করেছিলেন, যার অতি অল্প‌ই রক্ষা পেয়েছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঈশ্বর গুপ্তের স্বদেশ প্রেম কবিতা রচিত হয়েছিল যা সাধারণ মানুষকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল –
     “জননী ভারতভূমি           আর কেন থাক তুমি
                     ধর্মরূপ ভূষাহীন হয়ে
     তোমার কুমার যত         সকলেই জ্ঞানহত
                  মিছে কেন মর ভার বয়ে ?”
আবার বলেছেন, “মাতৃসম মাতৃভাষা        পুরালে তোমার আশা
                                    তুমি তার সেবা কর সুখে”

    সাংবাদিক হিসাবে সমকালীন সমাজ জীবন সম্পর্কে যে তীক্ষ্ণ সচেতনতার পরিচয় তিনি দিয়েছেন, তা মধ‍্যযুগের কাব‍্যে স্থান পায়নি। তবে সমাজ চেতনার প্রকাশে তাঁর দ্বৈততা ছিল। ইংরাজি শেখা মেয়েদের প্রতি মন্তব‍্য নিক্ষেপ –
                “আগে মেয়েগুলো ছিল ভাল ব্রতধর্ম কর্তো সবে
            একা বেথুন এসে শেষ করেছে আর কি তাদের তেমন পাবে॥
                যত ছুঁড়িগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হতে নিচ্ছে যবে।
              তখন এ.বি শিখে বিবি সেজে বিলিতি বোল কবেই হবে॥”

সমকালীন সমাজের বিরোধী রূপ দেখে ভাবী সমাজের কথা ভেবে তার কাব‍্যে চিত্রিত হয়েছে –
            “একদিকে কোশাকুশি আয়োজন নানা
              আর দিকে টেবিলে ডেবিল খায় খানা।”
আবার বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে বিদ‍্যাসাগরকে আক্রমণ করে লেখেন –
                 “অগাধ সাগর বিদ‍্যাসাগর তরঙ্গ তায় রঙ্গ নানা
                  তাতে বিধবাদের কুলতরী অকূলেতে কূল পেল না।”

মেয়েদের ইংরাজি শিক্ষা বা বিধবাদের বিবাহ যেমন ঈশ্বর গুপ্ত মেনে নিতে পারেননি তেমনি ভিক্টোরিয়ার ভক্ত মার্শম‍্যানকে ব‍্যঙ্গের কশাঘাতে বিদ্ধ করতে ছাড়েননি –
              “শুনিতেছি বাবাজান এই তব পণ।
              সাক্ষ‍্য দিতে করিতেছ বিলাতে গমন॥”

কৌলিন‍্য প্রথাকে কবি সমর্থন জানাননি, তাই ‘কৌলিন‍্য’ কবিতায় হিন্দু সমাজের বহু বিবাহ কূল প্রথার বিরুদ্ধে কবির শাণিত উক্তি –
                      “মিছে কেন কুল নিয়ে কর আঁটা আঁটি
                       এ যেন কুল কুল নয় সরামাত্র আঁটি॥”

ঈশ্বর গুপ্ত সমকালীন যুগসমস‍্যার যে রূপকার ছিলেন তার উল্লেখ করে বিষ্ণু দে বলেছেন – “তিনি মুখ ফিরিয়ে কাব‍্য সাধনা করেননি এইটাই বড়ো কথা।”

      ঈশ্বর গুপ্ত রচিত কবিতার অতি অল্প‌ই রক্ষা পেয়েছে তা থেকে দেখা যাচ্ছে জীবনের রঙ্গরসে আকন্ঠ মগ্ন কবি ঈশ্বর নীতি প্রকৃতি বিষয়ে কয়েকটি গম্ভীর ধরণের কবিতা লিখেছিলেন। ঈশ্বর ও নীতিতত্ত্ব বিষয়ক কবিতার প্রতি আধুনিক কালের পাঠক বিরূপ হবেন। তিনি করুণ, গভীর স্নিগ্ধ রসের কবি ছিলেন না, আবেগের ছিলেন পরম শত্রু। জীবনের নানা অসংগতির প্রতি অম্লমধূর ব‍্যঙ্গের বাণ নিক্ষেপে তিনি ছিলেন সব‍্যসাচীর মতো। অব‍্যর্থলক্ষ‍্য ভাবাবেগে আর্দ্র বাংলা সাহিত‍্যে তিনি বুদ্ধির চমক এনেছেন, এলায়িত প্রেম প্রণয়ের স্থলে সামাজিক জীবনের হাস‍্যকর চিত্র এঁকেছেন – এর জন‍্য তিনি বাংলা কাব‍্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

     ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় ভাবের দুর্বলতার সঙ্গে শব্দ ও অর্থালঙ্কারের চটক রচনার প্রয়াস লক্ষ করার মতো। ঈশ্বর গুপ্তের সমস্ত কবি কর্মের মধ‍্যেই লঘু সুরের চপলতা আর ভঙ্গি নির্ভর কথার চটক একান্ত হয়ে আছে। বঙ্কিমচন্দ্র একে ইয়ার্কি বলেছেন। জগদীশ্বরের সঙ্গেও একটু ইয়ার্কির পরিচয় দেওয়া হল –
          “কহিতে না পার কথা – কি রাখিব নাম ?
           তুমি হে আমার বাবা – হাবা আত্মারাম।”
গুপ্ত কবির কবিতার অন্তরঙ্গে বিষয় নিরপেক্ষতা লঘুতা বা ইয়ার্কি এবং বহিরঙ্গে ভঙ্গি সর্বস্ব বাক চাতুর্য‌ই তাঁর কবি লক্ষ্মণকে প্রধানত চিহ্নিত করেছে।
      কেবলমাত্র বিষয় বিন‍্যাসে নয়, রচনার প্রাঞ্জলতা এবং আনুপূর্বিক সংসক্তির বিচারে ও প্রথম প্রকারের কবিতাগুচ্ছের দ্বিতীয়োক্ত কবিতাবলীই বরং উৎকৃষ্টতর। কাজেই গুপ্তকবির কবিতালোচনা অসার্থক নয়।
      স্মর্তব‍্য, তিনি ছিলেন উদীয়মান নব‍্যবঙ্গের একদা বলিষ্ঠতম সাংবাদিক। কেবলমাত্র সংবাদপত্রের স্তম্ভে নয়, সরস্বতীর কাব‍্যকুঞ্জেও সেই নবযুগ সংক্রমণের সংবাদ পৌঁছে দিয়ে গেছেন তিনি ছন্দোবদ্ধভাষায়, আধুনিক বাংলা কাব‍্যের প্রস্তুতি পর্বে তিনি সার্থক কবি সাংবাদিক।

     ঈশ্বর গুপ্তের প্রতিভায় মধুসূদন বা দীনবন্ধুর প্রতিভা খোঁজা ন‍্যায়সংগত নয়। কবির ব‍্যক্তিগত দূর্ভাগ‍্য এবং যুগের প্রভাব ও চাহিদার মধ‍্যে কবির সীমাবদ্ধতা লুকিয়ে আছে। তবুও তাঁর কবিপ্রতিভা ছিল স্বাতন্ত্র‍্য। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এ দেশ রঙ্গে ভরা, তাই তিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রঙ্গ ব‍্যঙ্গ করেছেন। বিষ্ণু দে এই রঙ্গ ব‍্যঙ্গকে বলেছেন, “বস্তু নির্ভর সাধারণ সুস্থবুদ্ধির সরসতা।”
বৈষ্ণব কিংবা শাক্ত পদাবলীর যে ধারা বহিরঙ্গের দিক দিয়ে কবিগণের কাল পর্যন্ত চলেছিল তার নিশ্চিন্ত অবসান হল ঈশ্বর গুপ্তের হাতে, এখানেই গুপ্ত কবির কৃতিত্ব। ঈশ্বর গুপ্তের কবিতাতেই প্রথম জাতীয় জীবন ও ঐতিহ‍্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি নব‍্য মানবতাবোধকে তিনি বুদ্ধি দিয়ে বাইরের দিক থেকে গ্রহণ করেছিলেন, তবুও তাঁর কাব‍্য বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর জন‍্য স্বতন্ত্র‍্য মর্যাদা পেতে পারে।

বিষ্ণু দে তাঁর কবিত্বের ঐতিহাসিক মূল‍্যায়ন করতে গিয়ে যথার্থ‌ই বলেছেন,
“গত শতাব্দীর কন্টকিত সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ঈশ্বর গুপ্ত এই ঐতিহ‍্য রক্ষার এক দিকপাল… পুরাতন ঐতিহ‍্যে বাঁধা তাঁর লেখনী নতুন সমাজের পটে যে আঁচড় কেটেছিল সেটাই বিস্ময়কর ঘটনা”

আধুনিকতা ও প্রাচীনতা তাঁর কাব‍্যে যে বর্তমান তার কারণ অনুসন্ধান করে তারাপদমুখোপাধ‍্যায় লিখেছেন, “ঈশ্বরচন্দ্র যুগের‌ই সৃষ্টি, তিনি যুগ স্রষ্টা নন।… তাঁহার মধ‍্যে আধুনিকতার যে লক্ষ্মণগুলি প্রকাশ পাইয়াছে তাহা ঐ যুগের‌ই লক্ষ্মণ, ঈশ্বরচন্দ্রের নিজস্ব সৃষ্টি নয়।”