ঐতিহাসিক নাটক রচনায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অবদান
বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে নাটকের উল্লেখযোগ্য গোত্র ঐতিহাসিক নাটক। বাংলা সাহিত্যে প্রথম ঐতিহাসিক নাটক লেখেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি কর্ণেল টডের রাজস্থানের ইতিহাসকে পটভূমি হিসাবে গ্রহণ করে রচনা করলেন কৃষ্ণকুমারী নাটক। এই নাটকে প্রেক্ষাপট হিসাবে ইতিহাস এলেও তা নাটকের মূল বিষয়বস্তু থেকে বিচ্ছিন্নরূপে অবস্থান করেছে। পরবর্তী ঐতিহাসিক নাট্যকার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, যার নাটকে স্বদেশিকতার সুর এবং জাতীয় ভাবোদ্দীপনা বিশেষভাবে যুক্ত হয়েছে কিন্তু আবেগের আতিশয্য এবং মেলোড্রমাটিক হয়ে উঠেছে তাঁর নাটকের ত্রুটি বা দূর্বলতা। মধুসূদন – জ্যোতিরিন্দ্র সূচিত ঐতিহাসিক নাটকটিকে তার শিল্পসার্থকতা ও গৌরবময় পর্বে উত্তীর্ণ করলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। তাঁর ঐতিহাসিক নাটকের দেশপ্রেম বিশেষরূপে স্থান পেয়েছে কারণ ঐ পর্বের সমকালীন রাজনীতিতে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ইত্যাদি এমন একটা গণমুখী প্রসার লাভ করেছিল সে ইতিহাস চর্চা তখন আর কেবল রোমান্সচর্চা মাত্র হয়ে থাকল না, হয়ে উঠল বাস্তবতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। রোমান্স ও রিয়্যালিটির এই মিলন তাঁর নাটকগুলিকে পূর্ববর্তী নাটকের তুলনায় স্বতন্ত্র্য করেছে এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য দান করেছে।
এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে প্রকাশসাল অনুযায়ী দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ঐতিহাসিক নাটকের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হল –
১) তারাবাঈ (১৯০৩)
২) প্রতাপসিংহ (১৯০৫)
৩) দূর্গাদাস (১৯০৬)
৪) নূরজাহান (১৯০৮)
৫) সোরব রুস্তম (১৯০৮)
৬) মেবার পতন (১৯০৮)
৭) সাজাহান (১৯০৯)
৮) চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১)
৯) সিংহল বিজয় (১৯১৫)
‘তারাবাঈ’ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রথম ঐতিহাসিক নাটক যেখানে তিনি মোগল রাজপুতদের নিয়ে লিখেছিলেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখার ফলে নাটকটি খানিকটা ত্রুটিমুক্ত হয়েছে। নাটক হিসাবে তারাবাঈ ততটা সার্থক না হলেও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাট্য প্রয়োগে এই নাটকটির গুরুত্ব কাব্য সংলাপ বর্জন করে কাব্যধর্মী গদ্য সংলাপ ব্যবহারের গুরুত্ব অনুধাবনে। তাঁর পরবর্তী নাটকগুলি থেকে রচনারীতির বৈশিষ্ঠ্য নিম্নরূপ –
১) মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ –
এক অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেই নাট্যকার বারবার মোগল রাজপুত সম্পর্ককে চিহ্নিত করতে চান। ‘প্রতাপসিংহ’ বা ‘দূর্গাদাস’ নাটকে যেমন হিন্দু চরিত্রের অতুলনীয় দেশপ্রেম অসামান্য ত্যাগ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে অচপল নিষ্ঠার কথা ব্যক্ত করেছেন তেমনি ‘সাজাহান’ ও ‘নূরজাহান’ নাটকে মুসলমান চরিত্রকে পিশাচরূপে অঙ্কন না করে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের ট্রাজেডিকে যথেষ্ট সহমর্মিতার সঙ্গে চিত্রণ করেছেন।
২) ধর্মীয় পুনরুজ্জীবন ও আধ্যাত্মিক মুক্তির পরিবর্তে মানব আচরণ ও নিয়তির প্রতি আস্থাজ্ঞাপন –
দ্বিজেন্দ্রলাল কোনো নাটকেই ঐতিহাসিকতাকে আশ্রয় করলেও আধ্যাত্মিকতাকে সঙ্গী করেননি। ‘দারা’, ‘চাণক্য’ প্রভৃতি চরিত্রগুলি নাস্তিকতার নিদর্শন। ধর্মভাবের প্রকাশ নাটকে যেটুকু এসেছে তা সম্পূর্ণত মানবধর্ম। মনুষ্যধর্মের এই প্রকাশের আওতা থেকে তিনি নারী চরিত্রগুলিকেও বাদ দেননি। আর তাই ‘মহামায়া’, ‘হেলেন’, ‘জাহানারা’, ‘নূরজাহান’ প্রভৃতি নারী চরিত্রগুলি তেজস্বিনী ও ব্যক্তিত্বময়ী করে অঙ্কন করেছেন। তাঁর ইউরোপীয় শিক্ষা তাকে শিখিয়েছিল জাতীয়তাবোধ বিকাশের জন্য জাতীয় চরিত্রের উত্থান প্রয়োজন। আর তাই নাটকে তিনি কখনো চন্দ্রগুপ্ত কখনো বিজয়সিংহ এর মতো বীর চরিত্রের অবতারণা করেছেন।
৩) বীররসের প্রভাব –
ঐতিহাসিক নাটকের অনুকূল পরিবেশ সৃজন করতে দ্বিজেন্দ্রলালের ন্যায় আর কেউ সক্ষম হয়নি। তাঁর নাটকের পাত্রপাত্রী সব অসাধারণ উপাদানে গঠিত, তাদের কথাবার্তা, চালচলন, হৃদয় ও মনের লীলা এক সমুন্নত মহিমা এবং অনুপম ঐশ্বর্যমন্ডিত হয়ে উঠেছে। সেইসব চরিত্রগুলি প্রেমে অপ্রতিম, শৌর্যে সীমাহীন আবার ক্রোধে প্রচন্ড, হিংসায় দূর্বার। তাদের উত্থান, পতন আমাদের হৃদয়ে মৃদু কম্পন জাগায় না, সজোর আঘাতে দ্রুত স্পন্দন সৃষ্টি করে।
প্রতাপসিংহের স্বদেশপ্রেম, দূর্গাদাসের মহত্ত্ব, গোবিন্দদাসের সুদৃঢ় সংকল্প, মহবৎ খাঁর কর্তব্য পরায়ণতা, কাশিমের প্রভুভক্তি – মানবজীবনের এক একটা আদর্শকে অভ্রান্তভাবে রূপায়িত করেছে। ঐতিহাসিক নাটকে বীররস ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা দ্বিজেন্দ্রলালের সমধিক পরিমাণে ছিল বলে নাটকগুলি এরূপ সার্থক হয়ে উঠেছে।
তবে এই বীররসের আধিক্য অনেকস্থলে নাটকের গুরুত্ব নষ্ট করেছে, অনেকসময় অকারণে বীরত্ব দেখাতে গিয়ে চরিত্রগুলি হালকা ও হাস্যকর হয়ে পড়েছে।
ড. সুকুমার সেনের কঠোর মন্তব্য এখানে উল্লেখ্য –
“এই নাটকগুলি উপেন্দ্রনাথ দাসের নাটকের মতো অত্যন্ত melo dramatic, প্রায় প্রত্যেকটিতে গোলাগুলি ছোঁড়া আছে।”
আঙ্গিক ও শিল্প কৌশলের দিক থেকেও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটকের অভিনবত্ব অনেকখানি –
ক. চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের রূপায়ণ –
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ নিয়েই দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর চরিত্রের অন্তর্লোকে প্রবেশ করেন। জীবনের মূল ও মৌল আবেগগুলির সংঘাতে যে বৃহৎ নাট্যের সৃজন ঘটে তার সাক্ষ্য দেয় দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের অধিকাংশ চরিত্র। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বাংলা নাটকে শেক্সপীয়রীয় নাট্যরীতিকে চুড়ান্ত সার্থকতা দান করেন। তাঁর পূর্বে বাংলার নাটকের চরিত্রগুলি ছিল অবিমিশ্র ভালো বা নিরবিচ্ছিন্ন মন্দ। কিন্তু তার নাটকের চরিত্রগুলিতে মিশে থাকে এমন কিছু যা ভালো মন্দের সহজ সরলের বাইরে।
নূরজাহান, আরংজেব, সূর্যকমল, চাণক্য – প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ চরিত্র বিচিত্র ভালোমন্দ দোষগুণের মিশ্রিত উপাদানে গঠিত। তাহাদের মধ্যে স্বর্গীয় সুষমা নেই, নারকীয় কালিমা নেই, তা সম্পূর্ণ মানবীয় মহিমার অপূর্ব স্বাভাবিক শ্রীতে মন্ডিত হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে প্রতিটি চরিত্রে নিংসঙ্গতা বাঁধ যুক্ত হয়।
যেমন – ‘সাজাহান’ নাটকের প্রথম অঙ্ক দ্বিতীয় দৃশ্যে সিংহাসন লোভী ঔরঙ্গজেবের মুখেই শোনা যায় –
“আমার হাত ধরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ খোদা ; আমি সিংহাসন চাইনি।”
খ. ইউরোপীয় নাট্যরীতির আদর্শে মঞ্চসজ্জার অনুপুঙ্খ নির্দেশ দান –
‘প্রতাপসিংহ’ নাটকে প্রথম দ্বিজেন্দ্রলাল ইউরোপীয় নাট্যরীতির আদর্শে মঞ্চসজ্জার অনুপুঙ্খ নির্দেশ দানের রীতি ব্যবহার করেন। বিস্তৃত মঞ্চ নির্দেশের ফলে স্থান কাল পরিবেশ যেমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে তেমনি উপন্যাসের আঙ্গিক নাটকে গৃহীত হয়, যেমন – “নূরজাহান দাঁড়াইয়া উঠিয়া কহিলেন – কখনও না। সম্রাজ্ঞী নূরজাহান এ সমুদ্রে ডুববে, না হয় তার বক্ষ পদতলে দলিত করে চলে যাব…। এই বলিয়া সিংহাসন হইতে লাফাইয়া পড়িলেন।”
গ. কাব্যময় গদ্য সংলাপের প্রচলন –
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নিজেই বলেছিলেন, “কবিতায় আমার অত্যধিক আসক্তি থাকায় আমি গদ্যের ভাষাকে কবিতার আসনে বসাইবার প্রলোভন পরিত্যাগ করিতে পারি নাই।”
মূলত সেই কারণেই তাঁর ভাষার মধ্যে সুললিত শব্দ পরিপাট্য, সুষমছন্দ মাধুর্য এবং সুমনোহর অলঙ্কার সৌন্দর্য এত অধিক পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ‘তারাবাঈ’ নাটকের অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রয়োগের ব্যর্থতার পর তাঁর জনপ্রিয় নাটকগুলি গদ্য সংলাপে রচিত হয়। তবে চরিত্রের সংলাপের মধ্যে সংগীতের ন্যায় আকস্মিক ভাবোচ্ছাস এবং গূঢ় ব্যঞ্জনা দেখা যায়। মালোপমা অলঙ্কার ব্যবহার করে তিনি যেমন বাক্যের মধ্যে ক্লাইম্যাক্স সঞ্চার করেছেন, তেমনি উৎপ্রেক্ষা এবং সমাসোক্তি প্রভৃতি অলঙ্কারের দ্বারা ইহাকে জীবন্ত করে তুলেছেন। যদিও শেষ জীবনে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নাট্য সংলাপ রচনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চলিত ভাষার দিকে ঝুঁকেছিলেন।
ঘ. অনবদ্য ভাষার ব্যবহার –
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটক সার্থক এবং জনপ্রিয় হবার প্রধান কারণ হল এর অপরূপ অনবদ্য ভাষা, তাঁর আগে এমন শক্তিশালী কবিত্বপূর্ণ এবং নাটকীয় ভাষা আর কেউ ব্যবহার করতে পারেননি। নাটকের ভাষা নিরাবেগ কথার সমষ্টি নয়, তার দ্বারা চরিত্র বিশ্লেষণ এবং ঘটনার গতিবিধান করতে হবে দ্বিজেন্দ্রলালের তা অবগত ছিল।
এই প্রসঙ্গে অজিত ঘোষ বলেছেন –
“সংলাপের প্রতিটি কথা যেন একটা তীক্ষফলা ছুরিকার ন্যায় ঝকমক করিতেছে। যেমন নিমেষ গতিতে দর্শকের হৃদয়ে ইহা আমূল বিদ্ধ হইয়া যাইবে।”
শব্দ ভান্ডারে প্রতি তাঁর অবিচল অধিকার ছিল বলে ভাষাকে তিনি নানা রত্ন আভরণে সাজিয়ে অনিন্দ্যসুন্দরী করে তুলেছিলেন। একই ভাবাত্মক শব্দ পর পর বসিয়ে বাক্যটিকে আবেগপূর্ণ করে তুলেছিলেন। যেমন, ‘সাজাহান’ নাটকের প্রথম অঙ্কের ৭মদৃশ্য, “…নিয়তির মতো কঠিন হৌন, হিংসার মতো অন্ধ হোন, শয়তানের ক্রূর হৌন।”
ঙ. সংগীতের সাহায্যে বিবৃতির সর্বস্ব কাহিনিকে নাটকীয়তা দান –
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আগে নাটকে আনন্দময় বিরতি দানের জন্যই গান প্রয়োগ করা হত। কিন্তু ‘মেবার পতন’, ‘সাজাহান’, বা ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে ‘সিচ্যুয়েশন’ সৃষ্টিতে সঙ্গীতের প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন –
১) ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকের পঞ্চম অঙ্ক দ্বিতীয় দৃশ্যে – “ঐ মহাসিন্ধুর ওপার হতে কি মহাসঙ্গীত ভেসে আসে” – গানটি নাট্যচরিত্রের নিঃসঙ্গতার পরিচয় বহন করেন।
২) ‘সাজাহান’ নাটকে চারণ বালকদের কন্ঠে ধ্বনিত হয় – “ধনধান্যপুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা” গানটির মাধ্যমে জন্মভূমির প্রতি টান ও স্বদেশ প্রীতিকে নাট্যকার ফুটিয়ে তুলেছেন।
চ. স্বগতোক্তি বর্জন –
নাটকীয় সংলাপে অন্য চরিত্রের উপস্থিতি সত্ত্বেও স্বগতোক্তিকে অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম বলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বর্জন করেছেন। এবং তার পরিবর্তে একাত্মভাষণ বা মনোলোগকে স্থান দেন। অবশ্য প্রথম যুগে লিখিত তাঁর প্রহসনগুলিতে এই স্বগতোক্তির ব্যবহার স্থানে স্থানে থেকে গেছে।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ঐতিহাসিক নাটকগুলির সম্পর্কে পন্ডিতমহলের বিতর্কের শেষ নেই। অভিযোগ, ঐতিহাসিক তথ্যাদিকে বর্জন তিনি নাটকে যথেষ্ট সুরক্ষা দান করতে পারেননি। স্মর্তব্য ঐতিহাসিক ঘটনা যুদ্ধ বিগ্রহের কাহিনি মানুষের বহিরঙ্গের ঘটনাবৃত্তের পরিচয় দান করে। কিন্তু মানুষের অন্তর্জীবনের সত্যকে যে নাট্যকার সন্ধান করেন তার ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করার কোনো দায় নেই। ঐতিহাসিক তথ্য দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের উপাদান মাত্র, পরিণাম নয়। এই বিশ্বাসের আলোকে বিচার করলেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটকের অভিনবত্ব আলোকিত হবে ; আর সে আলো স্পর্শ করবে পরবর্তী নাট্যকার ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (আলমগীর), অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (অযোধ্যার বেগম), বা শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (রাষ্ট্রবিপ্লব) এর মতো ঐতিহাসিক নাট্যকারদের।