বাংলা সাহিত্যে জয়দেবের প্রভাব

কলমে – নম্রতা বিশ্বাস, এম.এ, বি.এড


    মধ্যযুগের সংস্কৃত সাহিত্যের একজন অন্যতম প্রসিদ্ধ কবি হলেন জয়দেবের গোস্বামী। তাঁর রচিত কাব্যের নাম ‘গীতগোবিন্দ’ । জয়দেব গোস্বামীর পিতার নাম ভোজদেব গোস্বামী ও  মাতার নাম রামাদেবী। প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে বলা যেতে পারে যে, কবি জয়দেব গোস্বামী অপর কয়জন প্রতিষ্ঠিত কবিসহ দ্বাদশ শতকের শেষ পর্যায়ে গৌরাধিপতি রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভাকে অলংকৃত করেছিলেন। জয়দেব ছিলেন লক্ষ্মণসেনের রাজসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম একজন, অপর চারজন ছিলেন গোবর্ধন আচার্য, শরণ, ধোয়ী ও উমাপতিধর। বাংলা, উড়িষ্যা ও দাক্ষিণাত্যের সংস্কৃতিতে জয়দেবের প্রভাব অনস্বীকার্য।

    মেবারের রানা কুম্ভ, প্রখ্যাত বৈষ্ণবসন্দর্ভকার সনাতন গোস্বামী এবং ‘শেষশুভোদয়া’ গ্রন্থে জয়দেব গোস্বামী যে লক্ষ্মণসেনের সভায় উপস্থিত ছিলেন তার উল্লেখ পাওয়া যায়। জয়দেব গোস্বামী যে লক্ষ্মণসেনের সমসাময়িক ছিলেন এই কথা বলা যায়। লক্ষ্মন সেন দীর্ঘজীবী পুরুষ ছিলেন এবং শেষ জীবন পর্যন্ত তিনি রাজকার্য করেছিলেন। ঐতিহাসিকগণদের অনুমানে লক্ষ্মণ সেন সম্ভবত ১১৭৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। দ্বাদশ শতকের শেষদিকে যে জয়দেব গোস্বামী বর্তমান ছিলেন সে বিষয়ে কোনো সংশয় লক্ষ করা যায় না। সুতরাং বলা যায় জয়দেব গোস্বামী কালের বিচারে সংস্কৃত সাহিত্যের অবক্ষয় যুগের কবি ছিলেন। মূলত জয়দেব গোস্বামীর সময়ে দেশব্যাপী সাহিত্য সাধনায় তখন প্রাকৃত – অবহটঠের স্রোতও মন্দীভূত হয়ে এসেছিল, বরং প্রতিটি রাজ্যেই তখন সর্বভারতীয় আর্যভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপের নিদর্শন লক্ষ করা যাচ্ছিল। জয়দেব গোস্বামী যখন সংস্কৃত ভাষায় তাঁর রচিত কাব্য ‘গীতগোবিন্দ’ রচনা করেছিলেন ঠিক তখনই গৌড়বাংলাতে সরহপাদ প্রমুখ সিদ্ধাচার্য অবহটঠ ভাষায় দোহা রচনা করেছিলেন। সাহিত্যের বিচারে জয়দেবের আবির্ভাব কালটি ‘যুগসন্ধি’ কাল, একদিকে যেমন রীতির সংস্কৃত সাহিত্যের ধারা ক্রমক্ষীয়মাণ অন্যদিকে তেমনই নবোদ্ভূত বাংলা ও অপরাপর নব্যভারতীয় আর্য সাহিত্যের শুভারম্ভ। এই যুগসন্ধিক্ষণের কালে দাঁড়িয়েও কবি জয়দেব গোস্বামীর রচিত ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্য সংস্কৃত ভাষায় রচিত শ্রেষ্ঠ কাব্যের দাবি রাখে। আলোচ্য কাব্যটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েও বাংলা সাহিত্যের আরম্ভ, সশ্রদ্ধভাবে এই স্বীকৃতিটুকু কাব্যটির প্রাপ্য।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে,
“Jayadeva sang not only the swan song of the age which was passing away, but he also sang in the advent of a new age in Indian literature the ‘vernacular’ age. He thus sands at the jugasandhi a conference of two epochs, with a guiding hand for the new epoch that was coming. Jayadeva can fully be called ‘the last of the ancients and the first of the modern in indian poetry’ ”

অন্যদিকে আচার্য সুকুমার সেনের মতেও এই প্রতিধ্বনি শোনা যায়,
“জয়দেবের হাতে, এই গানগুলিতে, সংস্কৃত ভাষার শেষবারের মতো নূতন শক্তি দেখান হইল এবং সংস্কৃত সাহিত্যের শেষ বিকাশ ঘটিল। অতঃপর সংস্কৃতে আর সত্যকার নূতন বলিয়া কিছু সৃষ্ট হয় নাই।…….. গীতগোবিন্দ যেমন সংস্কৃত সাহিত্যের শেষ কাব্য এবং ইহার গানগুলি সংস্কৃত সাহিত্যে প্রথম গান, তেমনি বাংলায় তথা অপর সব আধুনিক ভারতীয় ভাষায় সভাসাহিত্যের উদ্বোধক। বাংলা,‌গুজরাটি প্রভৃতি আধুনিক ভারতীয় আর্যভাষায় সাহিত্যের আলোচনা জয়দেবের গীতগোবিন্দ লইয়াই শুরু করিতে হয়।”

গীতগোবিন্দ পরিচয় –
দ্বাদশ সর্গে বিরচিত “গীতগোবিন্দ” মূলত চব্বিশটি গানের একটি পালা এছাড়া কাহিনী সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার জন্য রয়েছে বিভিন্ন ছন্দে রচিত কতকগুলি শ্লোক। কবি জয়দেব গোস্বামী তাঁর কাব্যটিকে কৃষ্ণ রাধা এবং সখীদের উক্তি প্রত্যুক্তির মধ্য দিয়ে এমন ভাবে নির্মাণ করেছেন যে কাব্যটি নাটকের রূপ নিয়েছে। গীতগোবিন্দের বারোটি সর্গেরই একটি করে অর্থবহ নাম আছে।
● প্রথম সর্গ – ‘সামোদ দামোদর’ : কৃষ্ণ সন্ধানে তৎপর শ্রীমতি রাধিকা এক সখীর সহায়তায় দেখতে পেলেন অপর এক নায়িকার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ আমোদে মত্ত।
● দ্বিতীয় সর্গ – ‘অক্লেশকেশব’ : নিজের উৎকর্ষ আর রইল না ভেবে শ্রীমতি নির্জনে এক লতাকুঞ্জে ক্ষুব্ধ হয়ে সখীকে বললেন, শ্রীকৃষ্ণ অপর যুবতীর প্রতি আসক্ত হওয়া সত্ত্বেও আমর মন তাঁরই প্রতি অনুরক্ত কেন ? শ্রীকৃষ্ণ গোপীদের বিলাসকলা দেখে হয়তো বা রাধার কথাই স্মরণ করছেন, তাঁর সঙ্গে রাধা মিলন কল্পনা করছেন ।
● তৃতীয় সর্গ – ‘মুগ্ধ মধুসূদন’ : শ্রীকৃষ্ণকে অপর ব্রজাঙ্গনাদের ত্যাগ করায় রাধার সন্ধানেই তৎপর হলেন। নিজের অপরাধবোধে তিনিও রাধাভাবে তন্ময় মুগ্ধ মধুসূদন রাধার সঙ্গে মিলনের কথাই ভাবছেন।
● চতুর্থ সর্গ- ‘স্নিগ্ধ মধুসূদন’ : মাধবের বিরহে রাধা অতিশয় কাতর হয়ে পড়েছেন। একমাত্র স্নিগ্ধ মধুসূদনের কথা ভেবেই তিনি এখনো জীবিত।
● পঞ্চম সর্গ- ‘সাকঙ্ক্ষ পুণ্ডরীকাক্ষ’ : এদিকে রাধার জন্য বিরহে কৃষ্ণ ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে রাধার নাম ধরে কাঁদছেন অবিলম্বে রাধা এসে যেন শ্রীকৃষ্ণের আশা পূর্ণ করেন।
● ষষ্ঠ সর্গ- ‘ধৃষ্ট বৈকুণ্ঠ’ : কিন্তু খবর এল সখী মারফৎ শ্রীমতির দেহ কৃষ্ণ বিরহে বিকল, অবিলম্বে কৃষ্ণ যেন রাধাকুঞ্জে গমন করেন।
● সপ্তম সর্গ- ‘নাগর নারায়ণ’ : কৃষ্ণের প্রতীক্ষায় সময় কাটে শ্রীমতির । বিপ্রলব্ধা শ্রীমতী বহুবল্লভ কৃষ্ণের নাগর রূপের কল্পনায় অতিশয় মন:পীড়া বোধ করতে লাগলেন।
● অষ্টম সর্গ- ‘বিদক্ষ লক্ষ্মীপতি’ : যামিনী অবসানে কৃষ্ণ শ্রীমতির কুঞ্জদ্বারে উপনীত হলে তাঁর দেহে অপর নারীর সম্ভোগ চিহ্ন দর্শন করে শ্রীমতি তীব্র ভাষায় তাঁকে বিদ্ধ করতে লাগলেন।
● নবম সর্গ- ‘মুগ্ধ মুকুন্দ’ : সখীরা বুঝালেন কৃষ্ণ যখন স্বয়ং এসেছেন তখন রাধার আর মান করা চলে না ।
● দশম সর্গ- ‘মুগ্ধ মাধব’ : সন্ধ্যার দিকে রাধার মান কিছুটা প্রশমিত হলে অনুতপ্তচিত্তে অত:পর শ্রীমতির চরণ যুগল মস্তকে স্থাপন করে শ্রীকৃষ্ণ রাধার মান ভাঙালেন।
● একাদশ সর্গ- ‘সানন্দ গোবিন্দ’ : কুঞ্জ থেকে সখীরা বেরিয়ে গেলে অত:পর কৃষ্ণের সাহচর্যে অভিসারিকা রাধারও লজ্জা অপসৃত হল।
● দ্বাদশ সর্গ- ‘সুপ্রীত পীতাম্বর’ : সখীরা চলে গেলে শ্রীকৃষ্ণ সাদরে রাধিকাকে গ্রহণ করলেন, স্বাধীন ভর্তৃকা শ্রীমতি রাধা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হলেন। এমন ভাবে গীতগোবিন্দমের‌ কাহিনী বিশ্লেষিত হয়েছে।

গীতগোবিন্দের গুরুত্ব:-
১/ আঙ্গিকের অভিনবত্ব – এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোনস্ ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যটিকে বলেছেন ‘রাখালী নাটগীতি’ (Pastoral Drama) । Lassen – এরঁ মতে আলোচ্য কাব্যটি অসাধারণ গীতিনাট্য ( Lyric Drama), Von Schroeder ‘গীতগোবিন্দ’ সম্পর্কে বলেছেন শিল্পসমৃদ্ধ যাত্রাগান ( refined yadra), Pischen ও Levi -এর মতানুসারে আলোচ্য গ্রন্থটি সংগীত ও নাটকের মধ্যবর্তী শিল্পরূপে ( category between song and drama)। Pischel -এর মতে , গীতগোবিন্দে Melodrama -এর লক্ষণ রয়েছে। সাহিত্য, দর্শন, সংগীত ও অধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ এ আখ্যান কাব্যের কলাকৌশল নি:সন্দেহে অভিনব।
২/ ভক্তিভাবের প্রকাশ – Literary , Devatinal, Musical, Mystical এই চারটি উপাদান C.R. Srinivasa Iyengar জয়দেব রচিত ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যে লক্ষ করেছেন। উক্ত কাব্যে দার্শনিক তত্ত্ব ও ভক্তিভাবের সন্ধান পাওয়া যায় শৃঙ্গার রসের সূক্ষ্ম ইঙ্গিতপূর্ণ আবরণের অন্তরালে স্বয়ং মহাপ্রভু এ কাব্যের রসাস্বাদন করতেন ফলে বৈষ্ণব ভক্তদের কাছে ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যটি কৃষ্ণকথা পাঠের অন্যতম আকর্ষণের ক্ষেত্র।
৩/ মধুরকোমলকান্ত পদাবলী – জয়দেব রচিত ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যটি হৃদয়স্পর্শী। এই কাব্যে Divine Love -এর শেষ লক্ষণ দেখা যায়: “ ত্বমসি মম ভূষণং ত্বমসি মম জীবনং ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম্” ।
৪/ অপূর্ব কাব্যভাষা – সংগীতময় ধ্বনির সংযোজনার সঙ্গে অলঙ্কারের ( অনুপ্রাস, যমক, উপমা ) অসাধারণ প্রয়োগ ও প্রসাদগুণ সংস্কৃত ভাষায় প্রায় দুর্লভ। জয়দেবের রচনা প্রমদ প্রদ জন্যই মনোহারিনী। কিথ আলোচ্য কাব্যে পেয়েছেন ‘ complete a harmony of sound and sense.” – “রতিসুখসারে গতমভিসারে”৷
সংস্কৃত ভাষায় রচিত শেষ বড়ো কাব্য – রূপে গীতগোবিন্দ প্রকাশ পেলেও জয়দেবের রচনার মধ্যে সংস্কৃতের ভিতর বাংলার ছোঁয়া লক্ষ করা যায়। জয়দেব তাঁর রচনায় সংস্কৃত ভাষার দুরূহ জটিল সমাসবদ্ধ পদকে অনায়াসে নমনীয়, তরল, কোমল , দেশীয় ভাষার নিকটবর্তী করে তুলেছিলেন। জয়দেব রচিত “ ধীরসমীরে যমুনাতীরে বসতি বনে বনমালী”; “ বিহরতি হরিরিহ সরসবসন্তে; “ত্বমসি মম ভূষণং ত্বমসি মমজীবনং ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম ” প্রমুখ সংস্কৃত পদগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এইগুলো অনেকাংশেই বাংলা সাহিত্যের ধাঁচে গঠিত।
৫/ ছন্দ সৌকুমার্য –  গীতগোবিন্দের ছন্দ নিয়ে বিচার করলে দেখা যায় এখানে সংস্কৃতে প্রচলিত ছন্দের বদলে তৎকালীন প্রচলিত অপভ্রংশ অবহটঠ ছন্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। চরণাস্তিক মিল স্থাপনের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায় কবি জয়দেব, বাংলায় আদি যুগ থেকে যে রীতি প্রচলিত হয়ে আসছে সেই রীতি অনুসরণ করেছেন।
ছন্দের সঙ্গে ভাবের অবিভক্ত সম্পর্ক স্থাপন করে এবং যতটা সম্ভব যুক্তাক্ষর বর্জন করে সরল ধ্বনিযুক্ত শব্দের ব্যবহার করে যে অমৃতমধুর বৈষ্ণবপদাবলী পদে দীর্ঘকাল বাংলা ভাষায় রচিত হয়ে আসছে তার আদর্শ হলেন জয়দেব গোস্বামী।

গীতগোবিন্দের প্রভাব –
    সমগ্র ভারতীয় সাহিত্যে জয়দেবের গীতগোবিন্দের যে প্রভাব বাংলা সাহিত্যে তার প্রভাব কোনাংশে কম বলা চলে না বরং জয়দেবর প্রভাব বাংলা সাহিত্যের এতো গভীর ও ব্যাপক যে বাংলা সাহিত্যে তাঁর অন্তর্ভুক্তি আবশ্যিক বিবেচিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জয়দেবের রূঢ় সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কাছে জয়দেব গোস্বামী ‘বাঙালী কবি’ এবং ‘বাংলার প্রাচীন কবি’ রূপে আখ্যায়িত।

      বড়ুচণ্ডীদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় জয়দেব রচিত ‘গীতগোবিন্দের’ সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের অনেক সামঞ্জস্য আছে। গীতগোবিন্দের মতো শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটিও রাধা কৃষ্ণ বড়াই তিন জনের উক্তি প্রত্যুক্তির মধ্য দিয়ে নাট্যগীতের কাহিনী অগ্রসর হয়েছে। ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের বহু পদের আক্ষরিক অনুবাদও ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে লক্ষ করা যায়।

      মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রধানত দুটি ধারা লক্ষ করা যায় – গীতিকাব্য ও মঙ্গলকাব্য। গীতিকাব্যের মধ্যে পরে মূলত ‘ বৈষ্ণবপদাবলী ’ আর এই বৈষ্ণবপদাবলীর সূচনা গীতগোবিন্দের হাত ধরেই। বৈষ্ণবপদাবলীর গঠন ও বিষয় – উভয়দিক থেকে বৈষ্ণবপদে জয়দেবেরই অনুসৃতি লক্ষ করা যায়।

      শুধু যে গীতিকাব্যেই জয়দেবের প্রভাব পরেছিল তার নয়, কাহিনী – কাব্যধারায় জয়দেবের প্রভাব লক্ষ করা যায়, তারই নিদর্শন হল মঙ্গলকাব্যগুলি। মঙ্গলকাব্যগুলির পালাগানের রীতিতে যে দল বেঁধে গান করার রীতি লক্ষ করা যায় সেটি মূলত ‘গীতগোবিন্দ’-কে অনুসরণ করেই করা হয়েছে। বাংলায় সে কীর্তন গানের সূচনা সেটিও জয়দেবের প্রভাবেই সম্ভব হয়েছে।

ড. সুকুমার সেন জয়দেব গোস্বামী সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন,
“ ইনি এক হিসাবে বাঙ্গালা প্রভৃতি আধুনিক আর্যভাষার আদি কবিও বটেন। ইহারই গীতিকবিতার আদর্শে বাঙ্গালাদেশে, মিথিলায় ও অন্যত্র রাধাকৃষ্ণ পদাবলী ও অনুরূপ গীতিকবিতার ধারাস্রোত নামিয়াছিল।”

অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী মতে,
“সংস্কৃত দেবায়ত প্রেম কবিতার অব্যবহিত সার্থক উত্তরাধিকারী বাংলা বৈষ্ণব পদাবলী। প্রেমের কবিতা লৌকিক ভাবের অধিবাসনে জয়দেব আসিয়া রাধাকৃষ্ণের লীলা – বর্ণনায় যে রূপে পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, সেই রূপেরই যথাযথ প্রকাশ ও বিকাশ দেখা যায় বাংলা বৈষ্ণব কবিতায়। বাংলার বৈষ্ণবপদের গঙ্গোত্রী জয়দেব। আকারে প্রকারে, হাবে – ভাবে, ঝঙ্কারে অলঙ্কারে, রসের প্রকাশে ও আস্বাদনের লক্ষ্যে বাংলা পদাবলী জয়দেব গোস্বামীর  ‘মধুরকোমলকান্তপদাবলী’র প্রতিরূপ। এমন কি জয়দেব ব্যবহৃত ‘পদাবলী’ শব্দটির রূঢ়ার্থও ইহাতে পরিগৃহীত। …. এই জয়দেব সংস্কৃত প্রেমকবিদেরও অন্যতম উত্তরসূরী। …. তাঁহার রাধাপ্রেম যুগ-যুগান্তবাহিত প্রেম প্রবাহের এক তুষশীর্ষ চলোমি। বাংলায় বৈষ্ণব কবিতা এই রাধা ও রাধাপ্রেমের নিকট ঋণী।”

জয়দেব রচিত গীতগোবিন্দের প্রভাব বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে সর্বাধিক ও সুদূরপ্রসারী তা বলাই যায়। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে গীতগোবিন্দের যেন অচ্ছেদ্য যোগ। আর এই যোগ বহিরঙ্গ রূপগত, অন্তরঙ্গ ভাবগত এবং সর্বোপরি কবিদের উপর প্রভাবগত।