আরাকান রাজসভার সাহিত‍্য


আরাকান রাজসভা –
       বর্তমান মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ, যার আগে নাম ছিল আরাকান। এই আরাকান পূর্বে চট্টগ্রামের অন্তর্ভূক্ত ছিল। এখানেই আরাকান রাজসভার রাজন‍্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজকবিদের হাতে যে বিশেষ সাহিত‍্য সৃষ্টি হয়, তাই আরাকান রাজসভার কাব‍্য নামে পরিচিত।

আরাকান রাজসভার কাব‍্য –
        মধ‍্যযুগের বাংলা সাহিত‍্যে লোকসাহিত‍্য রূপে পরিচিত হবার যোগ‍্যতা একটি শাখার আছে – এই লোকসাহিত‍্যের তিনটি ধারা – ১) কিসসা সাহিত‍্য  ২) পল্লী গীতিকা
৩) লোক সঙ্গীত – মুসলমান কবিরা এই সাহিত‍্যের স্রষ্টা। মুসলমানী সাহিত‍্য তথা কিসসা সাহিত‍্যর আলোচনা প্রসঙ্গে রোসাঙ রাজ দরবারের উল্লেখ অপরিহার্য।
           আরাকানের বৌদ্ধ নৃপতিদের অনেকেই মুসলমান উপাধি ব‍্যবহার করতেন। আরাকানের অধিবাসীরা নিজেদের ‘রখ‌ইঙ’ নামে অভিহিত করে এবং তা থেকেই ‘রোসাঙ’ কথাটির উৎপত্তি হয়েছে। বাংলাদেশে মুঘল পাঠান সংঘর্ষের ফলে বহু সম্ভ্রান্ত মুসলমান‌ও রোসাঙদের রাজদরবারে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। এভাবে কালক্রমে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম ধর্মের এবং বর্মি ও বাঙালি জাতির সংমিশ্রণে এক বিশিষ্ট সভ‍্যতা গড়ে উঠেছিল। এই রোসাঙ রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙলাদেশের মধ‍্যযুগে এক বিশিষ্ট সাহিত‍্য সম্পদ সৃষ্টি হয়েছিল – এই সাহিত‍্য লোকসাহিত‍্যের অন্তর্ভূক্ত, মানবিক ভাবযুক্ত একজাতীয় রোমান্স সাহিত‍্য। অর্থাৎ আরাকান রাজসভার কবিরা মূলত মনোনিবেশ করেছিল সাধারণ নরনারীর প্রণয় মূলক কাহিনির অনুবাদে। আর সেই অনুবাদের মধ‍্যে প্রোথিত হয়েছিল তৎকালীন লোকসংস্কৃতি।
এই সাহিত‍্য ধারার স্রষ্টা অর্থাৎ মুসলমান কবিরা মৌলিক সাহিত‍্য রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়নি, তারা অনুবাদকার্যে মনোনিবেশ করেছিল। ফারসি সাহিত‍্যের দ্বারস্থ হলেও মূলত হিন্দি সাহিত‍্যের আখ‍্যান থেকেই অনুবাদে অধিক ব‍্যাপ্ত হয়েছিল।

আরাকান রাজসভার কবি –
            সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান রাজসভার দু’জন উল্লেখযোগ‍্য কবি হলেন –
১) দৌলত কাজী      ২) সৈয়দ আলাওল

১) দৌলত কাজী – সপ্তদশ শতাব্দীতে বাঙলা ভাষার ব‍্যাপক ব‍্যবহার ও কাব‍্যাদির রচনার সূত্র ধরে বাঙালি মুসলমান সাহিত‍্যিকগণ বাংলা সাহিত‍্যকে এমন এক বস্তু দান করলেন যা অনাস্বাদিতপূর্ব, জীবনরসে ভরপুর, মানবীয় প্রেমের আবেগে তপ্ত।  বাঙালিকে সেদিন অভিনব রসপ্রাশনে যিনি এগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি দৌলত কাজী।
দৌলত কাজীর ব‍্যক্তি পরিচয় সম্পর্কে বিশেষ তথ‍্য পাওয়া যায় নি। কিন্তু তাঁর আত্মপরিচয় দান সম্পর্কে যে তথ‍্যটি উঠে আসে সেটি হল রোসাঙ রাজা থিরি-থু-ধম্মা বা বুদ্ধচারী রাজা শ্রী সুধর্মার লস্কর উজির আশারফ খান হিন্দি কবি মিয়া সাধন রচিত মৈনাসৎ কাব‍্যের কাহিনি শুনে দেশী ভাষায় রচনার অনুরোধ করেন –
“দেশী ভাষা কহ তাকে পাঞ্চালীর ছন্দে।
  সকলে শুনিয়া যেন বুঝয়ে আনন্দে॥
তবে কাজী দৌলতে সে বুঝিয়া আরতি।
পাঞ্চালীর ছন্দে কহে ময়নার ভারতী॥”
        শ্রীসুধর্মার রাজত্বকাল ১৬২২ – ১৬৩৮খ্রি:। অত‌এব এইসময় দৌলত কাজী মিয়া সাধন রচিত ‘মৈনাসৎ’ কাব‍্যের বাংলা অনুবাদ ‘সতীময়না’ বা ‘লোরচন্দ্রাণী’ নামে কাব‍্য রচনা আরম্ভ করলেন। প্রথম খন্ড রচনার পর দ্বিতীয় খন্ডে বারোমাস‍্যার এগারো মাস রচনার পর দৌলত কাজীর অকাল প্রয়াণ ঘটে। কবির মৃত‍্যুর প্রায় ত্রিশ বছর পর এই রাজসভার অপর এক কবি সৈয়দ আলাওল তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করেন।
বাংলা সাহিত‍্যে সপ্তদশ শতাব্দীর কবি দৌলত কাজী লৌকিক সাহিত‍্য ধারার শুধুমাত্র প্রথম কবি নয়, মুসলমান কবিদের মধ‍্যে প্রাচীনতম এবং শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে বিবেচিত।

২) সৈয়দ আলাওল রোসাঙ রাজসভার দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক জনপ্রিয় কবি হলেন সৈয়দ আলাওল। সৈয়দ আলাওল নানা বিষয়ে প্রচুর কাব‍্য রচনা করেছেন।
তাঁর কাব‍্যের বিচিত্রতার মতো তাঁর জীবন‌ও বৈচিত্রময়। দৌলত কাজী নিজের জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলেননি, কিন্তু আলাওল সেদিকে আমাদের মনে কোনো খেদ রাখেননি। আলাওল তাঁর ‘সেকেন্দরনামা’ ও ‘সয়ফুলমুলকে’ নিজের সম্পর্কে যে পরিচয় দিয়েছেন তা থেকে জানা যায় – ফতেয়াবাদের শাসনকর্তা মজলিস কুতুবের অমাত‍্য পুত্র আলাওল চট্টগ্রামে ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে আনুমানিক ১৫৯২ খ্রি: (মতান্তরে ১৬০৮খ্রি:) জন্মগ্রহণ করেন। পিতার সঙ্গে ভ্রমণকালে জলদস‍্যুর হাতে পড়ে পিতার মৃত‍্যু হয়। এরপর আলাওল রোসাঙ রাজসভায় এসে অশ্বারোহী সৈন‍্যদলে যোগদান করেন। পান্ডিত‍্যের খ‍্যাতিতে রোসাঙ রাজসভার মুখ‍্য পাটেশ্বরী আমত‍্য মহাজন মগন ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয় এবং তার কাছে তিনি আশ্রয় পান।
           এখানে সৈয়দ মুসা, সৈয়দ মুসাদ শাহ, রাজা শ্রীসুধর্মার নির্দেশে তিনি মধ‍্যযুগের শ্রেষ্ঠ কাব‍্য ‘পদ্মাবতী’ রচনা করেন ১৬৪৬খ্রি:। পদ্মাবতী সৈয়দ আলাওলের মৌলিক রচনা নয়, হিন্দি কবি মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ কাব‍্য অবলম্বনে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। দ্বিতীয় কাব‍্য ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জমাল‘ রচনা করেন ১৬৭২খ্রি:। অপর এক রূপকথা জাতীয় গ্রন্থ ‘সপ্তপয়কর’, ‘হপ্তপয়কর’ যা শ্রীচন্দ্র সুধর্মার সেনাপতি সৈয়দ মুহম্মদের আদেশে রচনা করেন। য়ুসুভ গদা কর্তৃক ফারসি ভাষায় রচিত গ্রন্থ অবলম্বনে আলাওল ‘তোহফা‘ রচনা করেন। এছাড়া ইউসুফ জোলেখা, লায়লা মজনু, আজিজ কুমার রসতী নামক অন‍্যান‍্য প্রণয়মূলক কাব‍্য রচনা করেছিলেন। কাব‍্যের আধিক‍্য, সরল ও সাবলীল শব্দ ব‍্যবহার, অনায়াস সরসতা সৈয়দ আলাওলকে জনপ্রিয়তা দান করেছে। সৈয়দ আলাওলের মৃত‍্যু হয় ১৬৭৩ খ্রি:।

রোসাঙ / আরাকান রাজসভার গুরুত্ব –
আরাকান রাজসভায় আমরা বাংলা ভাষার প্রথম শক্তিশালী মুসলমান কবির দর্শন পাই এবং মানবীয় প্রণয় কাহিনির পরিচয় লাভ করি। বাংলা সাহিত‍্যের ইতিহাসে দুটি বস্তুর‌ই যথেষ্ট গভীর অর্থ আছে।
৹ মুসলমান বিদজ্জন আরবি, ফারসির চর্চা সত্ত্বেও বাংলার সৃষ্টিক্ষেত্রে প্রবেশ করল।
৹ বাংলা সাহিত‍্য তখন কেবল হিন্দু সংস্কৃতির মধ‍্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয় পাদ থেকে হিন্দু মুসলমান বাঙালির সাংস্কৃতিক সংযোগের সাহিত‍্য হয়ে উঠল।
৹ বাংলা সাহিত‍্য এতদিন দেবদেবীর মাহাত্ম‍্য নিয়ে ব‍্যস্ত ছিল, প্রকাশ‍্যে মানবীয় মহিমা নিয়ে কাব‍্য লেখা হয়নি অথচ সংস্কৃত সাহিত‍্যে প্রণয় কাহিনির অভাব ছিল না। কিন্তু মধ‍্যযুগের কবিরা রোমান্সের বিস্ময়রস পার্থিব জীবনে না খুঁজে খুঁজেছেন দেবদেবীর অলৌকিকতায়।
৹ রোসাঙ রাজসভার লৌকিক প্রণয় কাহিনির অনুশীলনে ধর্ম সংস্কারমুক্ত মানবতার ধারণাও জন্ম লাভ করল। কবি দৌলত কাজীর ‘লোরচন্দ্রাণী’ বা ‘সতীময়না’ এই হিসাবে বাংলা সাহিত‍্যে আত্মপ্রতিষ্ঠার নতুন প্রয়াস তার ধর্ম সংস্কারমুক্ত মানবীয় প্রণয় কাহিনির প্রথম কাব‍্য।

– – – – –