আলালের ঘরের দুলাল: বাবুসমাজ

পূজা দাস, এম.এ (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)


“বাংলা গদ্যের ভূবনে এক তুমুল বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র।… তিনি হৈচৈ বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন।”(হুমায়ুন আজাদ)।

       বাংলা সাহিত্যে প্যারিচাঁদ মিত্র অধিক কথিত কিন্তু স্বলালোচিত  গ্রন্থাকারদের মধ্যে অন্যতম। তিনি উনিশ শতকের ভারতীয় রেনেসাঁসের অন্যতম সংগঠক প্রগতি পন্থী অধ্যাপক ডিরোজিওর ছাত্র। তাঁর মানস গঠিত হয়েছে ইয়ংবেঙ্গলদের সাথে, রাজা রামমোহনের ব্যক্তিত্বের আলোকে।  তিনি সচ্ছন্দে ইয়ং বেঙ্গলের উশৃঙ্খলতাকে পরিহার করে উদার ও সংস্কার মুক্ত মননের অধিকারী হয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে বাংলা উপন্যাস প্রতিষ্ঠার আলোতে আলোকিত হবার আগে যিনি সর্বপ্রথম উপন্যাস তৈরির সাজ-সরঞ্জাম জোগাড় করেছিলেন, তিনি হলেন ঔপন্যাসিক প্যারীচাঁদ মিত্র বা অনেকেই তাঁকে তাঁর ছদ্মনাম “টেকচাঁদ ঠাকুর” নামেও চিনে থাকি। এই ছদ্মনাম নিয়ে তিনি বাঙালি সমাজে পরিচিত হয়ে আছেন শুধুমাত্র একখানি গ্রন্থের জন্য-  সেটি হলো “আলালের ঘরের দুলাল”।  এই আলাল বাংলা সাহিত্যে প্রথম যথার্থ উপন্যাস নামে পরিচিত বলে তিনিও প্রথম ঔপন্যাসিকের খ্যাতি লাভ করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।  এই গ্রন্থটি ঊনবিংশ শতাব্দীর সম্পূর্ণ মৌলিক, সামাজিক, এককথায়,  বাঙালির জীবনাশ্রিত কথ্য আখ্যান।

‘আলালের ঘরে দুলাল’ নকশার (উপন্যাসটির) পরিচয়: 
       অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা গদ্য ভাষায় লেখা প্রথম সফল উপন্যাস হলো প্যারীচাঁদ মিত্রের “‌আলালের ‌ঘরের দুলাল”। তিনি এই আলালের ঘরের দুলাল উপন্যাসটি ১৮৫৭সালের টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে রচনা করেন। কলকাতার সমকালীন সমাজ ছিল এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। কথ্যভঙ্গির গদ্য ব্যবহার করে লেখক উপন্যাসটিকে যথার্থভাবেই বাস্তবধর্মী করে তুলেছেন। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় একটি নতুন সম্ভাবনা আবিষ্কৃত হয়েছে, আমরা যেমন বাংলা সাহিত্যে কালীপ্রসন্ন সিংহের “হুতোম প্যাঁচার নকশা” ‌উপন্যাসে ‘হুতোমী’ ভাষার পরিচয় পাই; তেমনি প্যারীচাঁদ মিত্র প্রথমবারের মতো এই উপন্যাসে যে কথ্যচলিত ভাষার ব্যবহার করেছেন তা বাংলা সাহিত সাহিত্যে ‘আলালী’ ভাষা নামে পরিচিতি লাভ করে। কাহিনী ও চরিত্রের যথাযথ পরিস্ফুটনের উদ্দেশ্যে ঔপন্যসিক উপন্যাসে প্রচুর তদ্ভব , চলিত ও বিদেশী শব্দের ব্যবহার করেছেন।

উপন্যাসটি প্রথম দিকে ১৮৫৪ সালের তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ‘মাসিক পত্রিকায়’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। অবশেষে ১৮৫৮ সাল সালে ছাপা হয়। এই উপন্যাসে নিমতলা নিবাসী গিরীন্দ্রকুমার দত্তের অঙ্কিত ছয় খানা লেখ চিত্র আছে। পরবর্তীকালে ১৮৭৫ সালে উপন্যাসটি হীরালাল মিত্র নাটকের পরিণত করেন।  ১৬ই জানুয়ারি ১৮৭৫ সালে বেঙ্গল থিয়েটারে মঞ্চস্থ করেছিলেন নাটকটি। এছাড়াও উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয় নরেন্দ্রনাথ মিত্রের “দ্য স্পয়েন্ড চাইল্ড” নামে।

‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসটি ৩০ টি অধ্যায়ে লেখা হয়েছিল। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে শীর্ষে মূল ঘটনাগুলি কয়েকটি টিকা আকারে বলে দেওয়া হয়েছে।  এই ঘটনাগুলোকে এমন ভাবে লেখা হয়েছে দেখতে মনে হবে ছোট ছোট ৩০টি গল্প। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,
এক,  বাবুরাম বাবুর পরিচয় – মতিলালের বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি শিক্ষা।
দুই, মতিলালের ইংরেজি শেখাবার ও বাবুরাম বাবুর বালীতে গমন।
তিন, মতিলালের বালীতে আগমন ও তথায় লীলাখেলা পরে ইংরেজি শিক্ষা বহু বাজারে অবস্থিত।
এবং সর্বশেষে আমরা দেখতে পাই –
ত্রিশ নং পরিচ্ছেদে,  মতিলালের বারানসী গমন ও সংসদ লাভের চিত্রশোধন তাহার মাতা ও ভগিণীর দুঃখ, রামলাল ও বরদাবাবুর সহিত সাক্ষাৎ। পথে ভয় ও বৈদ্যবাটিতে প্রত্যাগমন। আসলে প্যারি বাবু উপন্যাসটিকে মধ্যযুগের অনুবাদ সাহিত্যে কৃত্তিবাসী রামায়নের আদলে সাজিয়েছেন।

‘আলালের ঘরে দুলাল’ নকশার (উপন্যাসটির) বিষয়বস্তু:
‘আলালের ঘরের দুলালের’  মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজকে নীতিশিক্ষা দান। সামাজিক রীতি-নীতি ও বিভিন্ন চরিত্রের বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে উপন্যাসটি রচিত হয়েছে।  উপন্যাসটির কাহিনী শুরু হয়েছে বৈদ্যবাটি বাবুরামবাবুর বিশ্লেষণের দ্বারা।  তিনি টাকার জন্য হেন কাজ নেই যা তিনি করতে পারেন না। প্রথমদিকে দেখা যায়, তার একমাত্র পুত্র মতিলাল ও দুই কন্যা। পিতা-মাতার অত্যাধিক আদরে মতিলাল বাল্যকালেই অবাধ্য হয়ে ওঠে। প্রথম প্রথম বিদ্যা অভ্যাস করতে গিয়ে কান্নাকাটি করে গুরু মশাইকে আঁচড়ে কামড়ে দেয়। ফলত গুরু মশাই বাবুরামবাবুর অনুরোধ ও মতিলালের দৌরাত্ম্যের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য মতিলালের কথামত বাবুরামবাবুর কাছে মতিলালের সুখ্যাতি করেন। বাবুরামবাবু এতে আনন্দিত হন এবং পুত্রের পড়াশোনায় অগ্রগতির জন্য মুন্সির কাছে ফারসি পড়ানোর জন্য পাঠায়। মতিলাল একদিন মুন্সির দাঁড়িতে জ্বলন্ত টিকে ফেলে পালিয়ে যায়। পুত্রের কুকর্মের জন্য বাবুরাম তার ছেলেকে শাসন না করে মুন্সিকেই দোষারোপ করেন। তারপর ইংরেজি শিক্ষার গ্রহণের জন্য বালীর বেনিবাবুর বাড়িতে মতিলালকে পাঠানো হয়।  সেখানেও মতিলালের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বালির প্রতিটি গৃহস্থ্য ও বেনিবাবু তাকে নিঃসন্তান বেচারাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে। প্রথমে শরবোরণ সাহেবের স্কুলে, পরে কালুস সাহেবের স্কুলে ভর্তি হয়। বেচারাম বাবুর দুজন মাতৃ-পিতৃহীন ভাগ্নে ছিল তাদের সঙ্গী হিসেবে পেয়ে সে আর অধঃপতনে যায়। কুসঙ্গ ও কুকর্মের জন্য মতিলালকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। এই সংবাদ পেয়ে বাবুরামবাবু গৃহিণী সঙ্গে পরামর্শ করে ছেলেকে ছাড়াতে ঠকচাচাকে সঙ্গে নিয়ে যাই,  যে ছিল মামলা মোকদ্দমায়, আইন আদালতে ধড়িবাজ। শেষ পর্যন্ত ঠকচাচার প্রচেষ্টায় মিথ্যা সাক্ষীর মাধ্যমে তত্ত্ব, তদ্বির করে মতিলাল বেকসুর খালাস হয়। লক্ষণীয় বিষয় হল পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর‌ও মতিলালের স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হল না। বরং পিতা মাতার আদর বেড়ে যাওয়ায় তার দৌরাত্মের পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। পরে দেখা যায়, ঠকচাচার পরামর্শে মানিকপুরের দাঙ্গাবাজ লোক মাধববাবুর কন্যার সাথে মতিলালের বিবাহ স্থির হয়। অন্যদিকে বরদাপ্রসাদ বাবুর সান্নিধ্যে বাবুরামবাবুর ছোট ছেলে রামলাল হয়ে ওঠে মতিলালের ঠিক বিপরীত। সৎচরিত্র, ন্যায়পরায়ণ ও সত্যনিষ্ঠ। ফলে বাবুরামবাবুর বিষয় রক্ষাকল্পে রামলালকে নিয়ে সন্দেহ হয়। সেই সন্দেহে ঘি ঢালে ঠকচাচা। অবশেষে ঠকচাচার পরামর্শে সবার অমতে বংশ ও বিষয় সম্পত্তি রক্ষার্থে তিনি দ্বিতীয় বিবাহ করেন। বিবাহের কিছুদিন পরে বাবুরামবাবুর মৃত্যু হলে পুরো সম্পত্তির ভার এসে পরে মতিলালের ওপর। ঠকচাচার কুপরামর্শ অনুযায়ী জীবন-যাপনের ফলে মতিলাল তার জমিদারি ও আত্মীয়-স্বজন সবাইকে হারাই। আঘাতে, অর্থাভাবে, বাবুয়ানির খোলস হারিয়ে মতিলালের চেতনা ফেরে। মতিলাল পদব্রজে কাশিতে গমন করে, সেখানে এক সাধু্র সান্নিধ্যে তার মনের কালিমা দূর হয়। তার যেন নব জন্ম হয়। শেষে দেখা যায়, মতি লালের সুমতি দেখে যিনি তার বাড়ির দখল করেছিলেন তিনি স্বেচ্ছায় বাড়ি ফিরিয়ে দেন। মা, ভগিনী ও ভ্রাতাকে নিয়ে সুখের সংসার করতে থাকে।

■ তৎকালীন সমাজব্যবস্থা :

“উনবিংশ শতাব্দীর একমাত্র বাঙালি লেখক যিনি আকাঁড়া  বাস্তবকে উপন্যাস উপস্থাপিত করতে পেরেছিলেন।” (সরোজ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়) 

আমরা যদি বাংলা সাহিত্যের ‌ইতিহাসে মধ্যযুগের সাহিত্যের নিদর্শন দেখি তাহলে আমাদের চোখে পড়বে শুধুমাত্র ধর্মীয় বা রোমান্টিক আখ্যান-উপাখ্যান। অর্থাৎ তৎকালের কবি বা সাহিত্যিকগণ ধর্মের আশ্রয়ে তাঁদের রচনাকে সমৃদ্ধ করেছেন।  কিন্তু ঊনবিংশ শতকের সাহিত্যে প্যারীচাঁদ নিয়ে এলেন সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা, নানা কুপ্রথা, সীমাবদ্ধতা ও দুর্নীতির জিগির। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তিনি যখন সাহিত্যক্ষেত্রে প্রবেশ করেন, তখন ভারতবর্ষের একটি সদ্য পরাধীন দেশ। দেশের সংস্কৃতি, রীতি-নীতিতে অবাধে মিশে যাচ্ছে শাসক শ্রেণীর সংস্কৃতি। কোর্ট-কাছারি, আইন-কানুন ঢেলে সাজানো হচ্ছে।  বাঙালিরাও এগুলিকে আশ্রয় করে নতুন পেশার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, ধুতি ছেড়ে প্যান্ট পড়েছে, পাম্প সু ছেড়ে বুট ধরেছে। ঠিক এইরকম একটি সময়কে প্যারীচাঁদ বেছে নিলেন তার ‘আড়ালের ঘরে দুলাল’ উপন্যাসে। একদিকে ইংরেজদের প্রশ্রয়ে যেমন জমিদার-তহশিলদার-জমিদার শ্রেণীর উত্থান হচ্ছে, তেমনি ইংরেজদের তৈরি আদালতকে ঘিরে – মুহুরী, পেশকার, উকিলের সহকারী প্রভূত সম্প্রদায়ের মানুষদের সমাজ। ঔপন্যাসিক মূলত উপন্যাসে সামাজিক সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি করে। তিনি উপন্যাসে তুলে ধরেছেন তৎকালীন কলকাতার আর্থসামাজিক অবস্থা ও বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবন যাত্রার ধরনকে।  ঔপন্যাসিক বাঙালীর বাংলার প্রতি উদাসীনতাকে তুলে ধরেছেন ফারসির চল এবং ইংরেজির প্রতি নব আগ্রহের মাধ্যমে। উপন্যাসে ঔপন্যাসিক কিঞ্চিৎ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতদের কদর ও চাকরিতে অগ্রাধিকারের বিষয়কে অবলম্বন করে। আর দুর্নীতির বিষয় ‘আলালের ঘরে দুলাল’ উপন্যাসের একটি বড় আকর্ষণীয় বস্তু। টাকার বিনিময়ে মিথ্যা সাক্ষ্য, মিথ্যা মামলা সত্যে পরিণতকরনের মধ্য দিয়ে লেখক যেন চির পরিচিত সামাজিক সমস্যা গুলিকে পাঠকের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।

উপন্যাস সম্পর্কে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন- “যে স্বদেশ ও সংস্কৃতিবোধ সার্থক উপন্যাসে  পরোক্ষে সদাই উপস্থিত থাকে ‘আলালের ঘরে দুলালের’ রসমন্ডলে তার জাগ্রত প্রয়াস প্রথমাবধি বিদ্যমান।”

■ ‘আলালের ঘরে দুলাল’ নকশার সমাজচিত্র:  ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসের সমাজ মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক। কলকাতার মানুষদের আচার-ব্যবহার, শিক্ষা-দীক্ষা, রীতি-নীতি নিয়েই উপন্যাসটি পূর্ণতা পেয়েছে। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ নামকরণ থেকেই আমরা বুঝতে পারি বড়লোকের বকে যাওয়া ছেলে। প্যারীচাঁদ আলালী ভাষার মাধ্যমে উপন্যাসটি রচনা করেছেন, তবে উপন্যাসটির মধ্যে কিছু ব্যঙ্গ বিদ্রুপ লক্ষিত হয়েছে।
বাবুসমাজ :  বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি বা প্রতিফলন উপন্যাসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ‘আলালের ঘরে দুলাল’ উপন্যাসে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কলকাতা ও তার নিকটবর্তী মফঃস্বল অঞ্চলের হিন্দু সমাজের বাস্তব রূপ অঙ্কিত হয়েছে। উনিশ শতকের প্রথম দিকে বাবুরামবাবুর মতো আলালরা নানাভাবে অপরিমিত ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়ে বাবুগিরিতে গা ভাসিয়েছে। নৈতিকতা ও মনুষ্যত্বের কোন স্থান ছিল না এইসব সর্পাষদ বাবুদের মনের মধ্যে। আর এই সমস্ত আলালের ঘরে বেড়ে উঠত  মতিলালের মতো দুলালেরা। একদিকে বাবারা তাদের নিজস্ব সম্পদ, সম্পত্তি ও বাবুগিরিতে মত্ত, অন্যদিকে ছেলে হয়ে ওঠে অসভ্য, অশিক্ষিত ও অমানুষ। এদের দ্বারা কোনদিনও না শেখা হতো লেখাপড়া। এমনকি এদের মধ্যে জমিদারি চালানোর মতো কোনো বিষয়বুদ্ধিও ছিল না। এরা নিজেদের বাবুয়ানাগিরি বজায় রাখতে গিয়ে ইয়ার বা বকশিদের বুদ্ধিতে সর্বনাশের অতলে তলিয়ে যেত। উপন্যাসে বাবুরামবাবুর সম্পর্কে ঔপন্যাসিক ব্যক্ত করেছেন- “বৈদ্যবাটির বাবুরামবাবু বড় বৈষয়িক ছিলেন। তিনি মাল ও ফৌজদারি আদালতে অনেক কর্ম করিয়া বিখ্যাত হন।” ‌ঔপন্যাসিক ‘বিখ্যাত’ শব্দটিকে বিদ্রুপাত্মক রূপে ব্যবহার করেছেন।

● কৌলিন্য প্রথা:  প্রাচীন পন্থী হিন্দুদের পরিবারের নারী জীবন কৌলিন্য প্রথার নিষ্পেষনে যে কি দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল ‌ঔপন্যাসিক এই উপন্যাসে সেই চিত্রকেই তুলে ধরেছেন বাবুরামবাবুর দুই মেয়ে মোক্ষদা ও প্রমোদার মাধ্যমে। প্রচলিত সংস্কার ও প্রথা অনুযায়ী বাবুরামবাবু মোক্ষদা ও প্রমোদাকে – “বাবুরামবাবু বলরাম ঠাকুরের সন্তান, এইজন্য জাতি রক্ষার্থে কন্যাদ্বয় জন্মিবামাত্র বিস্তর ব্যয় ভূষণ করিয়া তাহাদের বিবাহ দিয়াছিলেন,…”। কূলকৌলিন্য রফার ফলে বড় মেয়ে মোক্ষদা বিধবা। ছোটো মেয়ে প্রমোদা কুলীনের স্ত্রী।  প্রমদার জবানীতে কুলীন স্ত্রীর বিড়ম্বিত জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। তার কুলীন স্বামী শুধু অর্থের প্রয়োজন হলে ক্ষণিকের জন্য তার কাছে আসে। “…এ কথা- শুনবা মাত্র আমার হাতের বালাগাছা জোর করে খুলে নিলেন। আমি একটু হাত বাগড়াবাগড়ি করেছিনু,  আমাকে একটা লাথি মারিয়া চলিয়া গেলেন, তাতে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিনু,…”। আসলে ঔপন্যাসিক স্ত্রীজাতি সম্পর্কে যে সংকীর্ন দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত, তা তিনি অতিক্রম করতে পারেননি। শাণিত ভাষায় তাকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

● ইংরেজি শিক্ষা উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে যখন ইংরেজরা কলকাতায় বাণিজ্য করতে আসে, তখন শেঠ বসাক বাবুরা সওদাগরী করত, কিন্তু কলকাতায় কেউ ইংরেজি জানতো না। এই ইংরেজদের সঙ্গে ইশারা ইঙ্গিতে কথাবার্তা হতে থাকতো। এতে কিছু কিছু মানুষ ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হতে থাকে। কিন্তু ক্রমে যখন ইংরেজরা আইন, আদালত, সুপ্রিম কোর্ট গড়ে তুলল, তখন ইংরেজি শিক্ষার খুব দরকার হয়ে পড়ল। ফলে ইংরেজি শিক্ষায় একটা রেওয়াজ পড়ে গেল। তা ক্রমেই যেন একটা ফ্যাশনে পরিণত হল। যাদের অর্থ আছে তারা ইংরেজি বিদ্যা আহরণের জন্য ইংরেজি স্কুল কলেজে ভর্তি হতে লাগলো। এখানে ইংরেজি শিক্ষাকে কিছুটা ব্যঙ্গ করে বলেছেন – “…বিবাহে ও ভোজের সময় যে ছেলে আইন ঝাড়িতে পারিত, সকলে তাহাকে চেয়ে দেখিতেন ও সাবাস বাহবা দিতেন।”

● আইন ব্যবস্থা: ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসে প্যারীচাঁদ মিত্র ইংরেজ শাসনে তৈরি কলকাতা ও হুগলি দুটি স্থানের আদালতের দৃশ্যকে পাঠকের সামনে উপস্থিত করেছেন।  ইংরেজ শাসনের বিচার ব্যবস্থার বাস্তব রূপকে তিনি বিদ্রুপাত্মক চিত্রনের মাধ্যমে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরে যথাক্রমে সুপ্রিম কোর্ট স্থাপন, এদেশের ভাষা ও রীতির ব্যবহার, ফৌজদারি আইন, সুপ্রিম কোর্টের ভাষ্যকার মোকদ্দমা পরিচালনা ইত্যাদির পরিচয় দিয়েছেন এই উপন্যাসে। তিনি আদালতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন- “গীর্জার ঘড়িতে ঢং ঢং করিয়া দশটা বাজিল। সারজন, সিপাই, দারোগা, নায়েব, ফাঁড়িদার, চৌকিদার ও নানা প্রকার লোকে পুলিশে পরিপূর্ণ হইল।” – আদালতকে যেন ‘সাক্ষাৎ যমালয়ে’ রূপকেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। অতি দরিদ্র ইংরেজিওয়ালা দরখাস্ত লেখক, শলাপরামর্শগত সাক্ষী, তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষারত পেশাদার জামিনদার, শিকার ধরার জন্য ওৎপেতে বসে থাকা উকিলের দালাল, বুকের ছাতি ফুলিয়ে উদ্ধত ভঙ্গিতে পরিভ্রমণরত পুলিশ-সার্জেন্ট-আইনি সংক্রান্ত এই সমস্ত বিষয়কে লেখক নিপুন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আদালতের পরিবেশকে পাঠকের সম্মুখে তুলে ধরেছেন।

● সাহেব বাবু-জমিদার প্রজা সম্পর্ক :  দীনবন্ধু মিত্র ‘নীলদর্পণ’ লেখার আগেই প্যারীচাঁদ নীলকর সাহেব- জমিদার এবং রায়তদের পারস্পরিক সংঘাতের চিত্র এঁকেছেন ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসে। নীলকরদের অত্যাচার এবং ইংরেজ বিচারকদের চূড়ান্ত অন্যায় ও পক্ষপাতিত্বকে তিনি ধিক্কার দিয়েছেন। উপন্যাসে জমিদার প্রজার সম্পর্কও অনেকটা অভ্রান্ত। তিনি শোষণের কথা অস্পষ্ট ইঙ্গিতে ব্যক্ত করেছেন কিন্তু তীক্ষ্ণ ভাষায় উচ্চারিত। তবে এই উপন্যাসে ইংরেজ বিচার ব্যবস্থা খুব বেশি স্পষ্ট। বেশ কয়েকবার কোর্ট, কাছারি, বিচারক, উকিল, মুহুরী, থানা, পুলিশ, হাজত-এর প্রসঙ্গ আছে‌। এছাড়াও দ্বীপান্তরের কথা উল্লেখিত হয়েছে।

এছাড়াও নাপিতের স্ত্রীর, কথোপকথন, ঠকচাচা-চাচির কথোপকথনে সমাজের নীচুস্তরের নরনারীর মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে।  সামাজিক সামাজিক জীবনের বিবিধ উপকরণের পরিচয় প্রসঙ্গে কাহিনীর সূত্রকে তিনি নানা পথে ঘুরিয়েছেন। সামাজিক রীতি-নীতির মধ্যে বিয়ের খোঁট, বৃদ্ধের দ্বিতীয় বিয়ে বা বিবাহজিবি কুলীনের আচরণ নিয়ে রঙ্গের মাধ্যমে বিদ্রুপ করেছেন। প্রসাদলোভী ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্য করেও তাঁর বিদ্রুপ অনেক বেশি ক্ষুরধার।

“It sketches a Rake’s progress by means of the story of a rich man’s spoilt son named Motilal and his ultimate reform.(সুশীল কুমার দে) 

     সমসাময়িক জীবন বোধ নিয়েই গড়ে ওঠে নভেল জাতীয় সাহিত্য। নীতি শিক্ষাদানে ও সমসাময়িক জীবনচিত্রন‌ই ‘আলালের ঘরের দুলালের’ অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। এই রচনার বিষয়বস্তু সমসাময়িক কলকাতাকে কেন্দ্র করে রচিত। কিন্তু তা জীবনরস সমৃদ্ধ হতে পারেনি। এই জীবনের রূপায়ণ ঘটেছে বহিরঙ্গকে নির্ভর করে।  অথচ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অন্ত্যজ জীবনের পরিচয় উদ্ঘাটনই উপন্যাস শিল্প শৈলীর বিশেষত্ব।

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস সম্পর্কে ব্যক্ত করেছেন- “উহার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট গ্রন্থ তৎপর কেহ প্রণীত করিয়া থাকিতে পারেন।  অথবা ভবিষ্যতে কেহ করিতে পারিবেন, কিন্তু “আলালের ঘরের দুলাল’ দ্বারা বাংলা সাহিত্যের যে অশেষ কল্যাণ সাধিত হইয়াছে তাহা আর কোন বাংলা গ্রন্থে সেই রূপ হয় নাই।”

সবথেকে লক্ষণীয় বিষয় যে ‘আলালের ঘরের দুলালের’ রূপক ধর্মী উপসংহার। উপন্যাসের শেষবাক্য – “আমার কথাটি ফুরাল, নটে গাছটি মুড়াল।” ‌এইরূপ উপসংহার ঠাকুরমার ঝুলির মতো লোককথা দ্বারা রচিত প্রান্তিক গল্পগুলিকে আমাদের মনে করিয়ে দেয়। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসকে অনেক সমালোচকই সম্পূর্ণ উপন্যাস বলে মনে করেন না। কিন্তু তাহলেও বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে ‘আলালের ঘরের দুলালে’র ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। নীতি শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে রচিত হলেও এর মধ্যে সমকালীন শহর গঞ্জের, স্কুল আদালতের, পারিবারিক, সামাজিক, উৎসব-পার্বনের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। 

তাছাড়াও – “তিনিই প্রথম দেখাইলেন যে, সাহিত্যের প্রকৃত উপাদান আমাদের ঘরেই আছে, তাহার জন্য ইংরেজি বা সংস্কৃতের কাছে ভিক্ষা করিতে হয় না।”(বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

বাংলা কথা সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম চেতনা ও কালপ্রবাহের সম্পর্ক অনুধাবন করেছিলেন। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ যথার্থ উপন্যাসের কোঠায় উঠতে না পারলেও সরস কৌতুক, বাকরীতির চাপল্য ও চাঞ্চল্য, টাইপ ধরনের চরিত্র সৃষ্টি, বাস্তবধর্মী ঘরোয়া কাহিনী হিসেবে উপন্যাসের পূর্বাভাস বলেই গৃহীত হবে। মোটকথা উপন্যাসের উদ্ভবে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এর ভূমিকা ছিল,  সূর্যোদয়ের পূর্বে ঊষা মুহূর্তের মত।