বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তুর্কি আক্রমণের প্রভাব
■ তুর্কি আক্রমণের প্রেক্ষাপট –
মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস যে ঘটনার দ্বারা আগের যুগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল তা হল তুর্কি আক্রমণ। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ রচিত ফরাসি ভাষার গ্রন্থ ‘রিয়াজ-উস-সালাতীন অনুযায়ী ১২০৩ সনে এই যুগান্তরকারী ঘটনা ঘটেছিল। অর্থাৎ দ্বাদশ শতাব্দীর একেবারে শেষে পূর্বভারতে তুর্কী আক্রমণ শুরু হয় এবং তারপর থেকে প্রায় দুশো বছর বাংলায় এই অনিশ্চয়তা ও অরাজকতার ঝড় চলে।
প্রত্যন্ত দেশ বলে বাংলা চিরকাল কেন্দ্রীয় ভারতবর্ষ থেকে দূরে ছিল ; সুতরাং উত্তরাপথে তুর্কি অভিযান শুরু হলেও অনেকদিন পর্যন্ত তা পল্লিবাসী নিশ্চিত বাঙালির শ্রুতিপথে আসেনি অথবা ঈষৎ কর্ণগোচর হলেও তা ভীতি উৎপাদন করেনি। এর আগে বাংলাদেশে কোনো শক্তির ব্যাপক আক্রমণ হয়নি। বহুপূর্বে উত্তরাপথে গ্রিক শক হুন প্রভৃতি বিদেশীর অভিযান হলেও তার ঢেউ বাংলা পর্যন্ত এসে পৌঁছায়নি। কাজেই যখন মহম্মদ বিন বখতিয়ারের অধীনে তুর্কি সওয়ার বাংলা দেশে আতর্কিতে উৎপাত আরম্ভ করল তখন রাজশক্তি বা জনসাধারণ কিছুমাত্র তার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে সময়ে ভারতবর্ষে সিংহাসন আরোহনকারী লক্ষ্মণ সেনের সাংস্কৃতির বিকাশে, ভোগ এবং আদিরসে নিমজ্জিত থাকার ফলে দন্ডশক্তিতে বীর্যহীনতার সুযোগটাই গ্রহণ করেছিলেন বখতিয়ার খলজী। কাজেই সংখ্যায় প্রচুর না হয়েও তুর্কিরা বিনা বাধায় উল্কাগতিতে উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম বঙ্গদেশের উপর দিয়ে ধ্বংসের ঝড় বইয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।
◆ রাজনৈতিক পরিবর্তন – মাত্র দশম থেকে দ্বাদশ শতক – এই দুশো বছরের মধ্যে রাজনীতি ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে। ক্রমে ক্রমে পালবংশ, সেনবংশের রাজত্ব শেষ হয়েছে এবং এক সময়ে বাঙালির ইতিহাসে হিন্দু আধিপত্যের গৌরবময় তিলকচিহ্ন মুছে গেছে। উত্তর ভারত জয়ের পরপর নদীয়া জয়, বরেন্দ্রভূমি দক্ষিণবঙ্গ জয় প্রভৃতি বঙ্গের রাজনৈতিক নকশা অনেকখানি পাল্টে দিয়েছে। রাজপুরুষদের কূটচক্রান্ত, জায়গির প্রার্থী রাজকর্মচারীদের আকস্মিক বিদ্রোহ, ইসলামি ধর্মান্ধতা ও রক্তাক্ত সংঘর্ষে সাধারণ বাঙালির আতঙ্কে কূর্মবৃত্তি অবলম্বন, ভূমধ্যিকার প্রাপ্ত ব্যক্তিদের লোভাতুর ছবিও পাপাচারণের নিরবিচ্ছিন্ন ঘটনা সমগ্র দেশে এক অন্ধকার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।
◆ ধর্মীয় বিপর্যয় – মুসলমান রাজশক্তির বিস্তার এবং ধর্মপ্রচার পৃথিবীর সর্বত্র সমানতালে এগিয়েছে। গ্রামের দূরতম প্রান্ত পর্যন্ত ইসলাম ধর্মের প্রচারের জন্য গাজী পীর ফকিরে দল সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। হিন্দুদের ওপর প্রত্যক্ষ অত্যাচার, রাতারাতি মন্দির, মঠ, হিন্দু শাস্ত্র পুড়িয়ে, হিন্দুধর্মদের উপেক্ষা করে মুসলিমদের রাজকর্মচারী পদে নিয়োগ, ব্রাহ্মণদের গোমাংস খাইয়ে বলপূর্বক কূটনীতির আশ্রয় নিয়ে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করে ইসলাম আধিপত্য সৃষ্টি করেছিল। মুসলমানদের সত্যপীর হয়ে উঠলো হিন্দুদের সত্যনারায়ণ।
◆ সামাজিক পরিবর্তন – তুর্কি আক্রমণের প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ প্রাচীন সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন সমাজ গড়ে উঠেছিল। হিন্দুধর্মের জাতপাত প্রবল অসাম্যকে কাজে লাগিয়ে মুসলমান নিম্নবর্ণের নিপীড়তদের মুসলমানরা নিজেদের দলে টেনেছিল। যে মর্যাদা সম্মান হিন্দুরা হিন্দুধর্মে পায়নি সেই সম্মানের আশায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণে আগ্রহী হয়েছিল। এছাড়া গ্রামকেন্দ্রিক ভারতীয় গণজীবনের সঙ্গে বাঙলার কৃষিজ ও শিল্পজাত সম্পদ বাংলার বাইরে বিক্রীত হওয়ায় অর্থনৈতিক দিকে সূচনা হল। এই বঙ্গদেশের মানুষগুলি যারা মুসলমান ধর্মগ্রহণ করল তারা পরিণত হল ‘বঙ্গীয় ইসলাম’ এ। এদের জন্য তৈরি হল পৃথক সাহিত্য।
■ বাংলা সাহিত্যে প্রভাব –
মুসলমান কবিরা বিদেশীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভারতীয় সাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন। সেইসময় আর্যাবর্তে সাহিত্যের বাহন ছিল দুটি সংস্কৃত ও অপভ্রংশ। সংস্কৃত ছিল সাধুভাষা, পন্ডিতি শাস্ত্রের ধারক। অপভ্রংশ ছিল অশিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত জনগণের প্রিয় গাথাগীতির সহজভাষা। তাই মুসলমান ও নবমুসলমানদের জনসংযোগ নিবিড়তর হয়ে উঠেছিল অপভ্রংশ ভাষাকে কেন্দ্র করে। মুসলমান কবি ‘অদ্দহমান’ এর অপভ্রংশে লেখা ‘সংনেহয়বাসয়’ অর্থাৎ সন্দেশক রাসক সেসময়ের লেখা একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
◆ তুর্কি আক্রমণের প্রেক্ষাপটে লেখা সাহিত্যগুলি হল –
১) হিন্দু সাহিত্য –
৹ মঙ্গলকাব্য
৹ অনুবাদ সাহিত্য
২) ইসলাম সাহিত্য –
৹ নবীবংশ ও রসুলবিজয়
৹ জঙ্গনামা
৹ পীর মাহাত্ম্যমূলক কাব্য
৩) প্রণয় আখ্যান কাব্য
৪) সূফীকাব্য
৫) ফকির বা বাউল গান
৬) দোভাষী পুঁথি সাহিত্য
১) হিন্দু সাহিত্য –
তুর্কি আক্রমণের পর অবক্ষয়কালে মধ্যযুগের প্রধান সাহিত্য হল মঙ্গলকাব্য এবং অনুবাদ সাহিত্য। একজনের আশ্রয় লৌকিক সাহিত্য অপর জনের আশ্রয় পুরাণ ও সংস্কৃত সাহিত্য।
সংস্কৃত সাহিত্য উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু তুর্কি আক্রমণের পর হিন্দুকাঠামো ভেঙে গেলে উচ্চবর্ণের মানুষ নীচু বর্ণের মানুষের সঙ্গে মিলিত হতে বাধ্য হল। হিন্দু ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তীকরণ থেকে রক্ষা করতে তারা হিন্দু ধর্মের মাহাত্ম্য প্রচারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। তাঁদের আশ্রয় হয় রামায়ণ মহাভারত শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ। এই তিনটি মহাগ্রন্থেরই অংশবিশেষের সংক্ষিপ্তাকৃতির ভাবানুবাদ বাংলায় অনূদিত হয়েছিল। এই অনুবাদগুলি রচিত হয়েছিল সমকালীন সমাজের সম্মুখে আদর্শ মানবরূপটি ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজনেই। রামায়ণে ভ্রাতৃপ্রেম, পিতৃভক্তি, প্রজাবাৎসল্য প্রভৃতি মানবিক গুণের বিকাশ লক্ষ্য করি।
যে কাব্য পাঠ করলে আমাদের গৃহস্থে লৌকিক ও পরলৌকিক মঙ্গল লাভ হয় তাকে মঙ্গলকাব্য বলে। হে ঠাকুর আমাদের রক্ষা কর – এটাই মঙ্গলকাব্যের বার্তা; অর্থাৎ এ থেকে উপলব্ধ হয় কোনো এক ক্রান্তিকালেই মঙ্গলকাব্যের উদ্ভব হয়েছে। সামাজিক প্রয়োজনে, রাজনৈতিক উৎপীড়নের বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণের মানুষেরা নীচু বর্ণের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্য স্থাপন করতে তাদের দেবদেবীর কৃপালাভের আগ্রহ বোধ করল। ‘নাগাম্মা’ দ্রাবিড় জাতির উপাসিত দেবীই অনার্যদের ‘মনসা’। আবার শিব যখন শাস্ত্রপন্থী আর্যদের দেবতা তখন তিনি যোগীশ্রেষ্ঠ, আর যখন তিনি ভাববিলাসী অনার্যদেবতা তখন তিনি ভোলানাথ। অর্থাৎ নবাগত দেবদেবীদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায়েই মঙ্গলকাব্য রচনার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল – মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল প্রভৃতি।
২) ইসলামি সাহিত্য –
ইসলাম ধর্ম একেশ্বরবাদী ; আল্লাহ জগৎ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ প্রেরিত দূত হলেন নবী ; আর যারা আল্লাহর প্রেরিত এবং আল্লাহর বাণী প্রচার করেন তারা হলেন রসুল। বাঙালি হিন্দুর পুরাণ পাঁচালীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইসলামি লেখকেরা বেশিদিন এড়িয়ে চলতে পারলেন না। তাঁরা ইসলাম ধর্ম প্রচারকদেরজীবন চরিত্র ও কাফের দলন কাহিনি ঢালাই করলেন হরিবংশ পান্ডব বিজয়ের ছাঁচে। এই রচনাগুলি দুই শ্রেণীর – ১) পয়গম্বরদের কাহিনি, এগুলি সপ্তদশ অষ্কাদশ শতাব্দীতে রচিত নবীবংশ, রসুলবিজয় বা মোহম্মদবিজয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ‘কাছাছোল অম্বিয়া’ অর্থাৎ নবীদের কেচ্ছা।
২) হজরত নবীর পরবর্তী খলিফাদের বিজয় অভিযান ও গৃহবিবাদের বর্ণাঢ্য কাহিনি। এগুলির সাধারণ নাম জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাহিনি।
‘নবীবংশ’ – ‘রসুলবিজয়’ রচনা করেছিলেন চাটিগাঁয়ের সৈয়দ সুলতান, জৈনুদ্দিন ও শেখ চাঁদ এবং উত্তরবঙ্গের হায়াৎ মামুদ। সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ সমাপ্ত হয়েছিল ১০৬৪ হিজরিতে (১৬৫৪খ্রি:)। জৈনুদ্দিন কাব্য রচনা করেছিলেন ইউসুফ খানের অনুরোধে। হায়াৎ মামুদের কাব্যের নাম ‘অম্বিয়াবাণী’, রচনাকাল ১১৬৫খ্রি (১৭৫৮হিজরি)। রচনা বাহুল্যে হায়াৎ মামুদ উত্তরবঙ্গের পুরানো কবিদের প্রধান। এঁর অপর রচনা ‘জঙ্গনামা’ (১৭২৩খ্রি:)।
‘জঙ্গনামা’ যুদ্ধকাহিনি বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম প্রচারক আদি ইমামদের ইরান বিজয় এবং আত্মকলহ কাহিনি। কয়েকখানি জঙ্গনামার বিষয় কারাবালার করুণ কাহিনি। সবচেয়ে পুরানো বাংলা জঙ্গনামা হল মোহম্মদ খানের মুক্তাল হোসেন (১৬৪৬খ্রি:)। বড় জঙ্গনামা কাব্যের মধ্যে সর্বশেষ রচনা বোধ হয় সাদা আলী ও আব্দুল ওহারের ‘শহীদে কারাবালা’। এক হিন্দু কবি রাধাচরণ গোপ এর জঙ্গনামাও পাওয়া যায় – ‘ইমামের জঙ্গ (১৮২৭খ্রি:)।
কোনো কোনো রূপকথা কাহিনি পশ্চিমবঙ্গের কবিদের হাতে পীরমাহাত্ম্য কাহিনিতে উন্নীত হয়েছিল। আরিফের ‘লালমোহনের কেচ্ছা’ এই ধরণের কাহিনির সূচনা। মক্কার রহিমকে অযোধ্যার রাম বলে স্বীকার করে বহু হিন্দু কবি সত্যপীর বা সত্যনারায়ণের পাঁচালী লিখেছেন। মুসলমানদের লেখা পাঁচালীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ফৈজুল্লার ‘সত্যপীরের পুস্তক’। কাব্যে মুসলমান ও হিন্দুদের উপাস্য সমানভাবে বন্দিত হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ধর্ম ও সংস্কৃতিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান যে কতকটা এক হয়ে এসেছিল তার মূল্যবান প্রমাণ ফৈজুল্লার কাব্যের এই বন্দনায়। সত্যপীরের পাঁচালীর মধ্যে বৃহত্তম ও বিচিত্রতম উত্তরবঙ্গের কৃষ্ণহরি দাসের কাব্য।
৩) প্রণয় আখ্যান কাব্য –
প্রণয় আখ্যান কাব্য মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিকতাকে ভঙ্গ করে এক অভিনব আদর্শের পথ খুলে দিয়েছে। বাংলা ভাষার আদি প্রতিষ্ঠা পর্বে পঞ্চদশ শতকে রোমান্টিক মানব মানবী ইউসুফ জোলেখার প্রেমের কথা নিয়ে প্রথম কাব্য রচনার কৃতিত্ব শাহ মুহম্মদ সাগিরের। ষোড়শ শতকে ইউসুফ জোলেখার ন্যায় প্রেমের আবেগতপ্ত কাহিনি নিয়ে রচিত হল দৌলত উজির বাহারাম খানের ‘লায়লী মজনু’ তবে বাংলায় হিন্দি ফরাসী রোমান্টিক কাব্যধারার ভগীরথ হচ্ছেন রোসাঙ রাজদরবারের দুজন সভাকবি – দৌলত কাজী ও সৈয়দ আলাওল।
দৌলত কাজী রাজা শ্রীসুধর্মার প্রধান আমত্য আশারফ খানের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দি কাব্য ‘মৈনাসৎ’ কাহিনির বাংলা অনুবাদ করেছিলেন দুটি খন্ডে ‘লোরচন্দ্রানী’ এবং ‘সতীময়না’। একইভাবে দৌলতকাজীর অনুজ এবং রোসাঙ রাজসভার শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ অবলম্বনে রচনা করলেন ‘পদ্মাবতী’ কাব্য। অনুবাদ হলেও কাব্যগুলি মৌলিকতার সাক্ষর বহন করেছে।
৪) ফকির বা বাউল গান –
তৎকালীন বাংলাদেশের সামাজিক অত্যাচার ও অনুশাসন এড়াতে নাথ ও সহজিয়া পন্থীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন কেউ ইসলাম ধর্মে কেউ বৈষ্ণব ধর্মে। এঁদের মধ্যে যারা মুসলমান ছিলেন তাদের পক্ষে কোরান অনুমোদিত পথের পরিবর্তে তন্ত্র নির্ভর দেহ সাধনা সম্ভব ছিল না। যাঁরা হিন্দু সহজিয়া রসসাধক তাঁরাও সম্পূর্ণভাবে পূর্বেকার সম্প্রদায়গত সাধনা ত্যাগ করেননি। হিন্দু মুসলমান উভয়েই নিজ নিজ বিশ্বাসের আওতায় থেকে বাউল সাধনা করতে থাকেন। কার্যত বাউলমত কোনো নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের মত নয়। বাউল মত ঔপনিষদ অধ্যাত্মিকতা তান্ত্রিক যোগসাধন সহজিয়া রসসাধনা এবং গৌড়ীয় প্রেমতত্ত্ব সংমিশ্রণে এক মিশ্র মতবাদ। পরবর্তীকালে লালন ফকির বাউল সম্প্রদায়ের এক অন্যতম পুরোধা।
৫) দোভাষী পুঁথি সাহিত্য –
যে পুঁথিতে অথবা বইতে দুই বা ততোধিক ভাষার মিশেল থাকে তাকে দোভাষী পুঁথি বলে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত হাওড়া, হুগলি, ভূরশূট, মান্দারন ও কলিকাতার এক শ্রেণির মুসলিম কবি রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান এবং দেশীয় বা ধর্মীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেন্দ্রিক কাহিনি অবলম্বনে আরবী, ফারসি, উর্দু, হিন্দি বহুল বাঙলা ভাষায় এক বিশেষ ধরণের কাব্য প্রণয়ন করে পশ্চিমবঙ্গের এমনকি ঢাকা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি এলাকার নগরকেন্দ্রিক অশিক্ষিত এবং অল্পশিক্ষিত মুসলিম জনগণের সাহিত্যরস পিপাসা নিবৃত্ত করার প্রয়াস পান।
৬) আঠারো ভাটির পাঁচালি –
হিন্দু দেবদেবীর মাহাত্ম্য কাহিনিকে মুসলমান পীর পীরানির মাহাত্ম্য কাহিনিতে ঢালাই করার প্রচেষ্টা প্রকট হল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে। ফকির মোহম্মদের মানিক পীরের গানে দেখেছে শিবেরই ছদ্মবেশে যেন মানিকপীর। মৎসেন্দ্রনাথের ইসলামি প্রতিরূপ হল পীর মছন্দাল। দেবী মঙ্গলচন্ডী হলেন বনবিবি। কোথাও পীর হয়েছে হিন্দু দেবতার প্রতিপক্ষ। যেমন সুন্দরবন অঞ্চলের দক্ষিণরায়ের প্রতিপক্ষ বড় খাঁ গাজী। কোন কোন দেবতা দুসম্প্রদায়ের ভাগে সমানভাবে পড়েছেন। যেমন হিন্দুর কুম্ভীর দেবতা কালু রায় ও মুসলমানের মগর পীর কালু সাহা। কচ্চিৎ হিন্দুর ঠাকুর সম্পূর্ণ রূপে মুসলমান পীর হয়ে গেছেন কিন্তু নাম বদলাননি। যেমন বর্ধমান ও ২৪পরগণা জেলার গোরাচাঁদ। বনবিবির জহুরানামা লিখেছেন বয়নুদ্দিন।