|| পেরিগ্যাল রিপিটার ||

পর্ব – ১

নীলাদ্রি রায়

গোরস্থানে সাবধান গল্পটিতে সত্যজিৎ রায় পেরিগ্যাল রিপিটার যে ফ্রান্সিস পেরিগ্যালের তৈরী একটি ঘড়ি, তাতো বলেই গেছেন | কিন্তু এই রিপিটার ঘড়ি কী বস্তু তা বলে দেবার তেমন সুযোগ গল্পে আর হয়ে ওঠেনি |
রিপিটার ব্যাপারটা হলো ঘড়ির যান্ত্রিক কলকব্জার ভাষায় যাকে বলে একটি ‘কমপ্লিকেশন’ | ঘড়িতে দুই অথবা তিন কাঁটায় কেবলমাত্র সময় বলার চাইতেও আরও কিছু প্রয়োজনীয় সুবিধা উপলব্ধ থাকলে সেই সুবিধা -প্রস্তুতকারী যন্ত্রাংশের নাম কমপ্লিকেশন | যেমন, ঘড়িতে যদি ক্রোনোগ্রাফ থাকে, সেটা একটা কমপ্লিকেশন | তারিখ, ক্যালেন্ডার, চাঁদের কলা, এগুলি সব কমপ্লিকেশন | কমপ্লিকেশন যত বাড়ে, ততই বেশি যন্ত্রাংশ লাগে, নির্মাণ হয়ে ওঠে দুরূহ, আর সাথে সাথে বাড়তে থাকে ঘড়ির দাম | তুবিয়ঁ (tourbillon) নামক এক আধুনিক কমপ্লিকেশন সবচেয়ে – হেঁ-হেঁ – কমপ্লিকেটেড | কিন্তু জটিলতায় তার অত্যন্ত নিকট আত্মীয় এই রিপিটার |
ভনিতা তো অনেক হলো, কিন্তু রিপিটার ব্যাটা করেটা কি? রিপিটার ঘন্টা বাজিয়ে সময় ঘোষণা করে | সাধারণ বাজনাওলা ঘড়িতে যা কল ভাবছেন তার তুলনায় অনেক, অনেক উচ্চস্তরের কল এই রিপিটার | তার কারণও আছে : রিপিটার কমপ্লিকেশন পাওয়া যায় কেবল ট্যাঁক্ঘড়িতে আর হাতঘড়িতে | ঘন্টা বাজাবার প্রয়োজনের উৎস হলো, ইলেকট্রিক লাইটের চল যখন ছিলনা তখন বাড়িতে মোমবাতি অথবা রাস্তায় প্যারাফিনের আলোয় ছোট ঘড়ির কাঁটা ঠিক কোথায় তা ঠাওর করতে অসুবিধা হতো বলে | বুঝতেই পারছেন, ট্যাঁকে বা মণিবন্ধে দফায় দফায় ঘন্টা বাজানো ঘড়ি থাকলে সে যুগেও লোকে হাসতো, তাই রিপিটারের কলকব্জা সাধারণ ঘন্টা বাজানো ঘড়ির কলকব্জার চাইতে অনেক আলাদা | রিপিটারের ঘন্টা তখনই বাজে, যখন ঘড়ির মালিক ঘড়ির কাছে সময় জানতে চান |
কী ভাবে? না, যখন সময় জানার প্রয়োজন হয় তখন একটি ঘোড়া টিপলে বেজে ওঠে রিপিটার | রিপিটারের পুরো নাম মিনিট-রিপিটার | অর্থাৎ, একেবারে কটা বেজে কত মিনিট হয়েছে, রিপিটার তা ঘোষণা করতে সক্ষম ! অবশ্য তিনটে বেজে ঊনষাট মিনিট বোঝাতে মিনিটের জন্য ঊনষাটবার ঘন্টা বাজেনা – তার জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে | তিন রকম ধ্বনির ঘন্টা থাকে রিপিটারে : ঘন্টা বা আওয়ারের জন্য একরকম ধ্বনি, সোয়া-ঘন্টা বা কোয়ার্টারের জন্য আরেকরকম এবং মিনিটের জন্য তৃতীয় রকম | অর্থাৎ, তিনটে বেজে ঊনষাট মিনিট বোঝাতে প্রথমে তিন বার বাজে ঘন্টা বা আওয়ারের ধ্বনি, তারপর তিনটি সোয়া-ঘন্টা পার হয়ে গেছে বোঝাতে তিন বার বাজে কোয়ার্টারের ধ্বনি, আর সবশেষে ঊনষাট থেকে তিন কোয়ার্টার, মানে পয়ঁতাল্লিশ মিনিট বাদ দিয়ে, চৌদ্দ বার বাজে মিনিটের ধ্বনি | সাধারণত, যন্ত্রাংশ কমানোর জন্য কোয়ার্টার ধ্বনিটা একটির বদলে হয়ে থাকে পরস্পর চটজলদি দুটি ধ্বনি – ঘন্টা আর মিনিটের ধ্বনির সংযোগে | কোয়ার্টারের বদলে দশ মিনিটে ভাগ করা রিপিটারও আছে অবশ্য, তবে তা বিরল |

আধুনিক হাতঘড়ির রেডিয়াম পুরানো হয়ে গেলে তা অন্ধকারে পড়া দুস্কর, রিপিটার ঘড়ি থাকলে সে ভাবনা নেই !
রিপিটার কিন্তু এমন কল নয় যা ঘড়ির বাকি কলকব্জার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সর্বক্ষণ চলে | এই কমপ্লিকেশনের সবচাইতে আশ্চর্য্য ব্যাপার এই, যে ঘড়ির কাছে সময় জানতে চাইলে, রিপিটার প্রথমে ‘ঘড়ি দেখে’ তারপর সময়টা বাতলায় | রিপিটারের যন্ত্রাংশ ঘড়ির বাকি যন্ত্রাংশকে ছুঁয়ে দেখে নির্ণয় করতে সক্ষম যে কটা বাজে | রিপিটারের ‘ঘড়ি দেখার’ এই প্রক্রিয়াটার নাম, সঙ্গত কারণেই, স্যাম্পলিং | ঘড়ির বাকি কলকব্জার তৎকালীন অবস্থান চেখে দেখে তবেই না রিপিটার বাতলাতে পারে সময় !
কেবলমাত্র রিপিটারটি বানাতেই লাগে একশোটিরও বেশি যন্ত্রাংশ | এতই সূক্ষ্য এগুলির নির্মাণ যে দেখা গেছে অনেকসময় ঘড়ি নির্মাণকালে অসাবধানতার কারণে যন্ত্রাংশ সামান্য বেঁকে গিয়ে রিপিটার নির্মিত হবার আগেই অকেজো হয়ে গেছে ! এমন ঘড়ির যে অমন দাম হবে, তা বুঝতে কষ্ট হয় না | তার ওপর ফ্রান্সিস পেরিগ্যালের তৈরী ঘড়ি হলে তো কথাই নেই | 🙂