বাংলার মন্দিরের গাত্রচিত্র – আল হাসান

পশ্চিমবাংলায় একসময় মন্দির গাত্রচিত্র ব্যাপক প্রচলিত ছিল।এখন প্রায় অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে,তিনটি মন্দিরে এখন শুধু গাত্রচিত্র এয়ে গেছে।আদিম যুগ থেকেই মানুষ গুহাচিত্র এঁকেছে এবং তার নিদর্শন রয়েছে ফ্রান্সের দোর্দান বা স্পেনে যেগুলো প্রস্তর যুগের।ভারতে গুহাচিত্রের নিদর্শন রয়েছে মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা,উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর,পশ্চিমবাংলার ঝাড়গ্রামের কাছে লালজল-সবমিলিয়ে ১০০১ টি গুহাচিত্র।প্রাক ইতিহাসের পরবর্তী যুগের গুহাচিত্র পাওয়া গিয়েছে সুরগুজার যোগীমায়া গুহায়,সময় প্রথম খ্রিষ্টপূর্ব।মহারাষ্ট্রের অজন্তা গুহার ৯,১০ নাম্বার গুহার কাজ হয়েছিল সবার আগে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে।দক্ষিন ভারতে বাতাপিপুরে চারটি গুহাচিত্র ছিল,এখন একটি অবশিষ্ট আছে।দক্ষিন ভারতে মন্দির গাত্রচিত্র প্রথা অনেক আগে থেকে চলছে তার দৃষ্টান্ত হলো লিপাক্ষী,তিরুনান্দিক্কর,মাদুরা,পদ্মনাভপুরম,কাঞ্চিপুরমের চিত্রগুলো।এখানে গুহাচিত্র ও মন্দিরগাত্রচিত্রগুলোকে একই পর্যায়ে ফেলা হয়েছে।ভারতীয় চিত্রকররা মধ্য এশিয়া ও চীনে গিয়েছিলেন সেখানেও তারা গাত্রচিত্র এঁকেছিলেন।এর নমুনা রয়েছে খোটান,কুচা,কিজল,কাশগড়,তুমচুক,সেরচুক,
ইয়ারখন্দ প্রভৃতি গুহাগুলোতে।ভারতীয় মধ্য এশিয়া চৈনিক অঙ্কনশৈলীর সূচনা খ্রিস্টীয় সপ্তম,অষ্টম শতকে যার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সানসি প্রদেশের তিয়েন লুন সান,কানসুর তুন হুয়াং,হোনান প্রদেশের গুহাচিত্রগুলোতে।এই ধারা ক্রমশ কোরিয়া,জাপান,সিংহল,বার্মায় ছড়িয়ে পড়ে।সিংহলের সিরিগিয়া,জাপানের হরিয়ুজি,কোরিয়ার সক্কলঅমে এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায়।নালন্দার ধ্বংসস্তুপ থেকে তিন্টি চিত্রিত পাথর পাওয়া গিয়েছে।বাংলার শিল্পকলা পালযুগে ব্যাপক উৎকর্ষ লাভ করেছিল।নালন্দা বিহারেও পাল রাজাদের অবদান রয়েছে।তাই অনুমান করা যেতেই পারে কিছু কিছু বৌদ্ধবিহারেও গাত্রচিত্রের ব্যবহার ছিল।পালযুগের তিনটি প্রধান বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর,মহাস্থানগড়,মোগলামারি তে প্রচুর রিলিফের কাজ পাওয়া গিয়েছে যার সাথে পালযুগের পুথিচিত্রের রুপকল্পনা ও আকৃতিগত অনেক সাদৃশ্য আছে।হিউয়েন সাং বাংলায় অনেক মন্দির, বৌদ্ধবিহার দেখেছিলেন সেগুলোতে প্রচুর গাত্রচিত্র ছিল।ফা হিয়েন তাম্রলিপি চিত্রকরদের কথা বলেছেন।তবে স্তুপের প্যানেলগুলো থেকে, বুদ্ধদেবের সময়ের বা তারো আগে হয়তোবা গাত্রচিত্র অঙ্কিত হতো কিন্তু তা পাওয়া যায়নি।

বাংলার চিত্রকলার সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন হলো পালযুগে প্রাপ্ত চিত্রগুলো যার সাথে অজন্তার চিত্রগুলোর মিল সহজেই দেখা যায়।অনেকে মনে করেন বাংলার পরবর্তীকালের পুথিচিত্র,পটচিত্র এগুলোর সূচনা গাত্রচিত্র থেকেই। পালযুগের যেসব শিল্পীদের নাম জানা যায় তারা হলেন বিতপাল,ধীমান,রণক প্রমুখ।বাংলায় মধ্যযুগে এসে দেখা যায় যেসব শিল্পীরা গাত্রচিত্র আঁকতেন তারা পটচিত্র,পুথিচিত্র আঁকতেন।তাই এটা হতেই পারে যে ধীমান,রণক তারাও পটচিত্র আঁকতেন।অজন্তা শৈলীর সাথে পূর্বভারতীয় চিত্রশৈলীর মিশ্রন ঘটেছে পালযুগে।

বাংলায় চৌদ্দ শতকে মন্দির বা বিহার নির্মিত হয়নি।এসময় অধিকাংশ শিল্পীরা নেপাল চলে গিয়েছিলেন। তবে পনের শতক থেকে কাজ আবার শুরু হয়, তার প্রমান পাওয়া গিয়েছে বিহারের আরা থেকে তবে সেসময় খানিকটা রুপান্তর ঘটেছে।দেবপ্রসাদ ঘোষ ১৪৯৯ সালে একটি পুথি পাটায় অঙ্কিত দশাবতার চিত্রে পালযুগের শৈলীর ছায়া দেখিয়েছেন।

চৈতন্যদেবের সময়ে বাংলার চিত্রকলা যে বহুল প্রচলিত ছিল তার প্রমান তো পাওয়াই যায়।আরো বিবরন পাওয়া যায় “গৌরলীলামৃত” তে । একদিন গৌরাংগ ভক্তগণসহ শ্রীবাস মন্দিরে এসেছেন তখন সেখানে এক ভাস্কর এলো এবং ব্রজলীলার পট দেখালো।

“এক চিত্রকর লই ভাস্কর ঠাকুর।
গৌরাংগে দেখায়ে মেলি চিত্র সুমধুর।।
গোদোহন যে যে স্থানো যে রুপমাধুরী।
পৃথক পৃথক সব আছে চিত্র করি।।
তাহা দেখি গৌরচন্দ্র সুখে ভরি গেল।
নিত্যানন্দ করে ধরি নৃত্য আরম্ভিল।।”

এই বিবরন থেকে দেখা যায়-১/নবদ্বীপে শিল্পীদের বাসস্থান ছিল।২/চৌকোপটের অস্তিত্ব সম্ভবত ছিল।

মঙ্গলকাব্য থেকে মধ্যযুগের গাত্রচিত্র সম্পর্কে জানা যায়-

“আজ্ঞা পায়্যা আনন্দে অচ্যুত চিত্রকর।
চপল নির্মান করে চারিদ্বার ঘর।।
উত্তর দুয়ারে লেখে কৃষ্ণ অবতার।
দান ছলে মনোভংগ হইল রাধার।।
কোনখানে পুতনাবধ কেশীবোধ কোথা।
কৃষ্ণ গেল মথুরায় কংশের বিতথা।।”

পশ্চিমবাংলার গাত্রচিত্র বিশিষ্ট মন্দির তিনটি আঠারো শতকের শেষে তৈরি করা৷তিনটির শৈলী তিনরকম তবে হুগলি জেলার বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির বৈচিত্র্যময়।মন্দিরের চিত্রগুলোতে তিনটি শৈলী দেখা যায়।

১/লোকায়ত শৈলী।

২/মিশ্র মুঘল শৈলী যার উৎস মুর্শিদাবাদ।

৩/ রাজপুত শৈলীর সাথে কোম্পানি স্কুল শৈলীর মিশ্রণ।

একটি কৃষ্ণলীলা চিত্র দেখা যায় ডিম্বাকৃতির জলাশয় তাতে নৌকা ভাসছে।এই চিত্রটি ডাচ ও ফ্লেমিশ শৈলীর। কৃষ্ণলীলার কৃষ্ণ ও সখীসহ রাধার চিত্র রাজপুত মিনিয়েচার ঘরানার।মুর্শিদাবাদে প্রাপ্ত একটি চৌকোপটে শিল্পীর নিভাস হিসেবে জয়পুর লেখা আছে।অনেক সময় একই মন্দিরে লোকশিল্পী ও পেশাদার শিল্পীদের কাজের প্রভেদ চোখে পড়বে।যেমনঃ কৃষ্ণলীলার চিত্রের রাধাকৃষ্ণের অবয়ব।দেয়ালচিত্রগুলো দেশি পদ্ধতিতে প্রস্তুত ভূমির উপর আস্তরন দিয়ে এবং দেশি আঠা ব্যবহার করা হয়েছে।ইতালীয় ফ্রেস্কোরীতিতে গ্রাউন্ড কোটিং ব্যবহার করা হয়নি।এগুলোই বাংলায় সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল।হুগলি জেলার আরেকটি মন্দির হল মহানাদের ব্রহ্মময়ী মন্দির।তবে ১৩০৩ বাংলা সনে এক ভূমিকম্পে মন্দিরের অধিকাংশ চিত্রই নষ্ট হয়ে যায়।এখন মাত্র দুটো চিত্র আছে।মহানাদ একটি প্রাচীন প্রত্নক্ষেত্র।গুপ্ত থেকে শুরু করে পাল সেন যুগ পর্যন্ত নিদর্শন এখানে পাওয়া গিয়েছে।কথিত আছে রাণী রাসমনি দক্ষিণেশ্বর মন্দির তৈরির আগে এখানে এসেছিলেন এবং দক্ষিণেশ্বর মন্দির এই ব্রহ্মময়ী মন্দিরের আদলে তৈরী।

কালিদাস দত্ত মন্দির গাত্রচিত্র সম্পর্কে জানাচ্ছেন,”এই চিত্রগুলো বেশি পুরাতন না হলেও বাঙলাদেশের প্রাচীন চিত্রাঙ্কন প্রথার সহিত এক্ষনে আমাদের পরিচিত হইবার প্রধান অবমম্বন। কিন্তু দুঃখের বিষয় কেবলমাত্র বাঁকুড়া জেলা ব্যতীত বাংলার আর কোনো অংশের এই প্রকার চিত্রের বিবরন ও প্রতিলিপি প্রকাশিত হয়নি।”

বাঁকুড়ার রাউতখন্ড গ্রামে একটি ভগ্ন মন্দিরে কয়েকটি দেওয়ালচিত্র পাওয়া যায়।এগুলো বাঁকুড়া জেলার পুথিপাটা চিত্রের শৈলী এবং উৎকৃষ্ট।

মন্দির গাত্রচিত্র শিল্পীরা জানতেন এগুলো সংরক্ষনের উপায়,বহডুতে একটি খাতা ছিল তাতে পরিষ্কার লেখা ছিল এগুলো কীভাবে সংরক্ষন করতে হবে।শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসু,বিনোদবিহারী মুখার্জি এ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন।শেষ পর্যন্ত রাজস্থান থেকে ভিত্তিচিত্র বিশেষজ্ঞ ও দুজন কারিগর এসে কাজ শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো,নন্দলাল বিনোদবিহারী কি বাংলায় ভিত্তিচিত্রকারদের সন্ধান পান নি? কেন রাজস্থান থেকে আনতে হলো? নাকি তা বিংশ শতকের শুরুতেই বিলুপ্ত গেছে?

তথ্যসূত্রঃ

১/বাংলার চিত্রকলা মধ্যযুগ থেকে কালিঘাট,অঞ্জন সেন,সংবেদ প্রকাশনী,ঢাকা,২০১৯,(পৃষ্ঠাঃ৫৫-৬১)।

২/বাংলার টেরাকোটা মন্দির আখ্যান ও অলংকরন,শ্রীলা বসু,সিগনেট প্রেস,কোলকাতা,২০১৫,(পৃষ্ঠাঃ২৬,২৭)।

৩/স্মৃতিকথা শিল্পকথা,প্রদোষ দাশগুপ্ত,প্রতিক্ষন প্রকাশন,কোলকাতা,১৯৮৬,(পৃষ্ঠাঃ ৩৬-৩৭)।