ঠাকুরবাড়ির শেষ কটা দিন – আল হাসান
পাঁচ নাম্বার বাড়ির কর্তা গগনেন্দ্রনাথ মারা গেলেন ১৯৩৮ সালে ও ছয় নাম্বার বাড়ির কর্তা রবীন্দ্রনাথ মারা গেলেন ১৯৪১ সালে৷রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ঠাকুরবাড়ির প্রদীপ শিখাটি নিভে গেল ও সমস্ত বাঁধন আলগা হয়ে গেল।পুরো বাড়ি জুড়ে যেন এক করাল গ্রাস সকলকে ঘিরে ধরলো।
দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর গিরীন্দ্রনাথ উড়িষ্যার পরগনাগুলো ভাগে পেয়েছিলেন ও দেবেন্দ্রনাথ পূর্ববাংলার৷১৯৩৮ সালে গগনেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সমরেন্দ্র ও অবনীন্দ্রনাথের বৈষয়িক বুদ্ধি না থাকার কারনে প্রচুর ঋনে জড়িয়ে যায় এবং জমিদারি হাতছাড়া হয়ে যায়৷তার পেছনে প্রধান কারন ছিল পরিবারে বিশাল সদস্যসংখ্যা ও তাদের অঢেল বিলাসিতা।দ্বারকানাথের উত্তরসূরীরা তার বৈষয়িক বুদ্ধি না পেলেও তার খরচের হাত সকলেই পেয়েছিলেন।সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ সারাজীবন সৃষ্টি নিয়ে মেতেছিলেন যার কারণে বৈষয়িক ব্যাপারে শান দেয়া কখনোই হয়ে উঠেনি।এছাড়া ও তাদের সকলের জামাই প্রীতি ছিল অসম্ভব।তিন ভাই ই তাদের সব জামাতাকে ব্যরিস্টারি পড়তে পাঠিয়েছেন।এছাড়া ও জামাইদের বাড়ি করে দেয়া, তাদের রুজি রোজগার থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়া পর্যন্ত সমস্ত খরচ তারাই দিয়েছেন।এছাড়া ও নাতিদের ক্ষেত্রেও তাদের খরচ ছিল অফুরন্ত।জামাইরা প্রতিষ্ঠিত হলেও নাতিরা প্রতিষ্ঠিত সে তুলনাই কমই হতে পেরেছে।প্রত্যেক নাতিকেও আলাদা আলাদা ব্যবসার জন্য প্রচুর অর্থ দেয়া হয় কিন্তু তারা বারবার নষ্ট করে।ঠাকুরবাড়িতে জামাই পালন তো একটা স্বাভাবিক ব্যাপার।
ছয় নাম্বার বাড়ির ক্ষেত্রেও একই।দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার ছিল বিশাল।আসলে পরিবার না বলে কলোনি বলাই ভালো হবে কারণ রবীন্দ্রনাথের সময় পরিবারের সদস্য ছিল দেড়শো এর উপরে।এই বিশাল সংখ্যক মানুষের খরচ পুরোটা রবীন্দ্রনাথকেই বহন করতে হয়েছে।তবে রবীন্দ্রনাথের বৈষয়িক বুদ্ধি প্রখর ছিল।তাই তিনি সবকিছু সামলে খুব ভালোভাবেই সংসার করে গেছেন।রবীন্দ্রনাথ মারা যাবার পর হেমেন্দ্রনাথের নাতি সুভোগেন্দ্রনাথ মনোমালিন্যের কারণে তার ভাগের অংশ বেচে দিয়ে অন্যত্র চলে যান।
ঠাকুরবাড়িতে সম্পত্তি বিক্রি করে বাইরে যাওয়া এই প্রথম।রবীন্দ্রনাথের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় ছয় নান্বার বাড়ি ঠিকমত থাকলেও পাঁচ নাম্বার বাড়ির কর্তারা পারলেন না।শেষমেষ বাধ্য হয়েই তারা বাড়ি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলেন।বাড়িটি বিক্রি হলো বড়বাজারের মাড়োয়াড়ির কাছে।পাঁচ নাম্বার বাড়ির তিন ভাইয়ের পরিবার এতদিন হাতে হাত ধরে ছিল।সেই বাঁধন ছেড়ার সময় হলো।এ যেন তিনটি তারার গলাগলি ধরে থাকার পর হঠাৎ বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
বাড়ি বিক্রির খবর শুনে বাড়ির যৌথ জিনিসপত্র যে যার যার মতো ভাগ করে নিতে থাকলো।দুই ভাই সমরেন্দ্র ও অবনীন্দ্র যেন নীরব দর্শক। তারা শূন্য চোখে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন।রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকলে হয়তো তা কোনভাবেই হতে দিতেন না।কিন্তু এখন!! কি ছিল আর কি হলো!!!
দোতলার নাচঘরে টাঙানো বিশাল তেলরঙের প্রতিকৃতি গুলো যা দ্বারকানাথ থেকে শুরু করে কয়েকপুরুষ ধরে কেনা তা একে একে নামতে লাগলো।সেগুলো কিনেনিয়েছিলেন পাথুরিঘাটার মহারাজা প্রদ্যুৎকুমার ঠাকুর। তবু সান্তনা রয়ে গেল যে বাইরের কোন আর্ট ডিলারের কাছে তা যায়নি।বংশের লোকদের হাতেই আছে।কিন্তু সেই বিশাল বইয়ের ভান্ডার?? সারাবিশ্ব থেকে কয়েক পুরুষ ধরে সংগ্রহ করা হাজার হাজার বই!! সেগুলো রাখা গেল না।তা চলে গেল কলেজ স্ট্রিটের কোন এক গুদামঘরে৷অবনীন্দ্রনাথ একসময় রবীন্দ্রনাথকে লাইব্রেরি দেখিয়ে হেসে হেসে বলতেন,দেখ রবিকা, তুমি তুমি সারা পৃথিবী ঘুরে দেখ আর আমার সারা পৃথিবী দেখা হয়ে গেছে এখান থেকেই।সেই সব বই যা দ্বারকানাথ ইউরোপ থেকে সংগ্রহ করেছিলনে তা নারকেলের ছোবড়া দিয়ে বানানো দড়ি দিয়ে বেধে নিয়ে গেল কলেজ স্ট্রিটের ঠিকাদাররা।
আস্তে আস্তে পুরো দোতলা থেকে জিনিসপত্র ফাঁকা হয়ে গেল।এবার তিনতলা।গগনেন্দ্র নাথের পরিবার ভাড়া করলো ল্যান্সডাউন প্লেসের বাড়ি।সমরেন্দ্রনাথের পরিবার সুনহো স্ট্রিটের বাড়িতে আর অবনীন্দ্রনাথের পরিবার ভাড়া নিলো গুপ্তনিবাস।
ঠাকুরবাড়ির পাঁচ নাম্বার বাড়ির শেষ কয়েকটি দিনের কথা এসেছে অবনীন্দ্রনাথের নাতি সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর এর লেখায়।
তিনি লিখেছেনঃ
“গগন দাদু ও সমর দাদুর পরিবার চলে গিয়েছে।শুধু আমরা পড়ে রইলুম দোতলার পশ্চিমের অন্দরমহলে।তখন বাড়ির লোকজন নেই বললেই চলে, বারবাড়িতে ঝাড়পোঁছ নেই,লাইব্রেরি ঘর ফাঁকা,হাঁ হাঁ করছে,দাদুমশাইয়ের মাদুরপাতা স্টুডিও,দক্ষিনের বারান্দার পেছনে ছোট লাইব্রেরি ঘর,ছেলেদের পড়ার ঘর,আসবাবপত্র,বড় বড় ঝাড়লন্ঠন,অমূল্য বইহের ভান্ডার,নাচঘরের অমূল্য পোর্ট্রেট সবকিছু হারিয়ে পুরো বাড়ি যেন সবসময় হু হু করে কাঁদছে বলে মনে হতো।
একটেরে হয়ে তখনো আমরা আছি আর প্রতিটি দিন গুনছি ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তটির।গাড়িবারান্দার তলায় বাড়ির ভেতরে ঢোকার কয়েক ধাপ ভেতরেতই থাকতো দুই দারোয়ান আছিলাল ও আদ্রাজ। তা একদিন অদৃশ্য হয়ে গেল কারণ তাদের ছুটি হয়ে গেছে।বাগানের পাশে দপ্তরখানা,তোষাখানা,কাচারিঘর,খাঞ্জাঞ্চিখানা সব কিছুকে যেন সদা অন্ধকার গ্রাস করে থাকে-কারণ দেওয়ান,সরকার,ম্যানেজার সবার ছুটি হয়ে গেছে চিরদিনের মতো সবাই বাড়ি থেকে চলে গেছে।
একদিন রাতে চোর এসে বাগানের পারগোলার লোহার ফ্রেম চুরু করে নিয়ে গেল।পরিবারের সে এক অন্ধকারময় সন্ধিক্ষন।তখন ও খেলা চলে ছ নাম্বারের ছেলেদের সাথে।রাতে সেখান থেকে আলো আসে এখানে।
সারা বাড়িতে দুটি ঘর ছাড়া সব অন্ধকার। কোথাও আলো নেই,শুধু দুটি ঘরে আলোর রেশ।আমি রাতে লুকিয়ে দক্ষিনের বারান্দা থেকে শুরু করে,নাচঘর,কাঠের মেঝেওয়ালা লাইব্রেরি ঘর,বিলিয়ার্ড ঘর,সর্বত্র ঘউরে বেড়াতাম।আমার বয়স তখন বারো।মাঝে মাঝে অন্ধকারে দীর্ঘশ্বাস পড়তো।পূর্নিমার আলোয় দক্ষিনের বারান্দায় যেন আলোর বন্যা বইতো।
কয়েক পুরুষের স্মৃতিবিজড়িত কত গল্প কথা, ইতিহাস,আমাকে হারিয়ে নিত কল্পনার রাজ্যে। ঘন্টার পর ঘন্টা সেইসব অন্ধকার ঘরে বসে হারিয়ে যেতাম সেই ইতিহাসের মাঝে।কল্পনা আমাকে হাঁটিয়ে মারতো ঘর থেকে ঘরে।বারান্দা থেকে ছাদে, নাচঘর থেকে লাইব্রেরিতে৷
নাচঘর আমায় মনে করিয়ে দিত দ্বারকানাথের সেই দিনগুলোর কথা-দেশ বিদেশ থেকে কত সাহেব মেম, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ এই ঘরে পদধূলি দিয়েছেন।এই ঘরে কত নাচগানের জলসা বসেছে,কত নাটক করেছেন কর্তাবাবা (রবীন্দ্রনাথ)।আর দক্ষিনের বারান্দা? উনবিংশ ও বিংশ শতকের সাংস্কৃতিক ভাব ও চিন্তাধারার তীর্থক্ষেত্র।
বাড়ি ছাড়ার দিন চলে এলো।যে শালগ্রাম শিলা আদি বাড়ি থেকে নীল্মনি ঠাকুর নিয়ে এসে এখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা দীপেন ঠাকুর নিয়ে বরানগরের গুপ্তনিবাসে প্রতিষ্ঠা করলেন।শালগ্রাম শিলার কি হবে তা তিন ভাই বুঝতে পারছিলেন না।কেউ বললো কোন মন্দিরে দিয়ে দিতে,কেউ বললো পাথুরিঘাটায় পাঠিয়ে দেয়া হোক।কিন্তু অবনীন্দ্রনাথ রাজি হলেন না,তিনি বললেন,”আজ যদি আমাদের বাবা,ঠাকুর্দা বেঁচে থাকতেন তারা এটা মেনে নিতেন? “
সকাল ১১ টায় গাড়ি এসে গেল আমাদের নিতে।দাদামশা (অবনীন্দ্রনাথ) কে ধরে নামানো হলো।বাকিরা আস্তে আস্তে সিড়ি দিয়ে নামতে লাগলো।কারো পায়ে বোধহয় জোর ছিল না। মা চোখ মুছতে মুছতে গাড়িতে উঠলেন।পিছনে রয়ে গেল একশো বছরের ও বেশি ইতিহাস।
গাড়িতে উঠার আগে ফ্যাল ফ্যাল করে পিছনে দেখছিলাম।আকাশ থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল।চিৎপুরের রাস্তা দিয়ে জলের স্রোত দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন পার হয়ে ভাসিয়ে দিয়েছে দুই বাড়ির চত্বর।পাশেই বাড়ির জমাদার মালপত্র তুলছিল।তারা চার পুরুষ ধরে আমাদের বাড়ির জমাদার ছিলেন৷তিনি দাদামশায়ের হাত ধরে হু হু করে কাঁদলেন।
এবার এলো সেই চিরবিদায়ের মুহুর্ত।গাড়ি স্টার্ট দিল দ্বারকানাথের তৈরি করা গাড়িবারান্দা থেকেই।লোহার গেট পেরিয়ে শুকনো ঝরাপাতা মাড়িয়ে গাড়ি এগিয়ে চললো, পেছনে পড়ে রইল দ্বারকানাথ ঠাকুরের বৈঠকখানার বাড়ি শত শত ঘটনার বোবা সাক্ষ্মী হয়ে।”
অবনীন্দ্রনাথ বাড়ি বেঁচে দিয়ে গুপ্তনিবাস ভাড়া নেন।স্বনামধন্য ডাক্তার ডি গুপ্ত এই বাড়িটির মালিক।এটি আসলে ছিল একটি বাগানবাড়ি।
একদিন সকালে বাড়ির চাকর এসে অবনীন্দ্রনাথ এর পরিবারকে খবর দিলেন দ্বারকানাথের বাড়িতে গাইতির ঘা পড়েছে।প্রথমেই ধূলিসাৎ হলো গুনেন্দ্রনাথের বাগান,তারপর দক্ষিনের বারান্দা,স্টুডিও, লাইব্রেরি,নাচঘর, বিলিয়ার্ডঘর সব।বাড়িটির যখন ৮০ ভাগ ধবংস হয়ে যায় তখন রাজ্যসরকারের টনক নড়ে।তারা এগিয়ে আসে এবং রবীন্দ্রনাথের ছয় নাম্বার বাড়ি সহ পুরো ঠাকুরবাড়ি অধিগ্রহন করে।কিন্তু ততক্ষনে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে।দ্বারকানাথ এর তৈরি করা পাঁচ নাম্বার বাড়ি শুধুই স্মৃতিমাত্র।পরে মূল নকশার আদলে আবার বাড়িটি তৈরি করা হয়।
এদিকে ছয় নাম্বার বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ মারা যাবার পর শুধু মহর্ষির দুই বিকৃতমস্তিষ্ক পুত্র সোমেন্দ্রনাথ, বীরেন্দ্রনাথের পরিবার বাস করতে থাকে।তারা বাড়ির কয়েকটি ঘর রেখে বাকিগুলো ভাড়া দিয়ে দেয়। মহর্ষির সকল পুত্রকন্যা শুধু বর্নকুমারী দেবী বাদে সকলে রবীন্দ্রনাথের আগেই মারা যায়।আর তাদের পুত্রদের ভেতর দ্বিজেন্দ্রনাথের ছেলে দ্বিপেন্দ্রনাথ অন্যত্র বাড়ি কিনে থাকতে শুরু করেন তাও তিনি ১৯৪২ এ মারা যান,সত্যেন্দ্রনাথ এর পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ১৯৪০ এ মারা যান,হেমেন্দ্রনাথের পৌত্র সুভোগেন্দ্রনাথ অন্যত্র বাড়ি কিনে চলে যান ও রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ প্রথমে শান্তিনিকেতন ও পরে দেরাদুন চলে যান।
এই ছিল বাংলার নবজাগরনের নেতৃত্ব দেয়া,সমগ্র বাংলা তথা ভারতবর্ষের গর্ব, কোলকাতা শহরের নয়নের মণি জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি সমাপ্তির ইতিহাস৷
তথ্যসূত্রঃ
১/ঠাকুরবাড়ির জানা অজানা,সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর,মিত্র ও ঘোষ পাবলিসার্চ, কোলকাতা,২০১৬,(পৃষ্ঠাঃ১০৪-১১০)।
২/ ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল,চিত্রা দেব,আনন্দ পাবলিসার্চ,কোলকাতা,২০১৮,(পৃষ্ঠাঃ২৯৫-২৯৮)।
৩/ জোড়াসাঁকোর ধারে,অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর,কোলকাতা,(পৃষ্ঠাঃ৭৫-৭৮)।
৪/ ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়,জসীম উদ্দিন,বাংলা একাডেমী সংস্করন,ঢাকা,২০০৮,(পৃষ্ঠাঃ৫৫-৫৬)।