বাংলা সাহিত্যে যৌনতা – সুজয় কর্মকার

যৌনতা জীবজগতের প্রবৃত্তিগুলির মধ্যে আদিমতম ও প্রধান একটি প্রবৃত্তি। সুস্থ ও সজীব জীবনচর্যার অঙ্গ এই যৌনতা।সেই আদিকাল থেকে নর নারী হাত ধরাধরি করে হাজার হাজার বছর পথ হেঁটেছে, দুচোখ মেলে দেখেছে পরস্পরকে, কোন এক অজানা কারণে পরস্পরের কাছাকাছি এসেছে, তারপর মনের গলিপথ ধরে শরীরের অনাবিস্কৃত প্রান্তরে পৌঁছে গেছে । অনুভব করেছে আনন্দ আর আনন্দ ।
সেই আনন্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে মানবজীবনের সৃষ্টি রহস্য। জীবনযাত্রার প্রবাহ অবিচ্ছিন্ন আর অক্ষুণ্ণ থাকবার মূলে রয়েছে এই যৌনতা। কাব্যসাহিত্য সবকালেই সমাজ অনুসারী। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বাংলা সাহিত্যে জীবনের সমান্তরালে উঠে এসেছে যৌনতার কথা। প্রচীন সাহিত্যে যৌনতাএবং যৌনতার নানাবিধ উপকরণ মণি মুক্তোর মত ছড়িয়ে আছে। প্রাচীন বাংলা বাংলা সাহিত্যে যৌনতা এসেছে খোলাখুলি, আর বাংলা কথা সাহিত্যে যৌনতা এসেছে কিছুটা অবদমিত হয়ে। বাংলা কথাসাহিত্যে যৌনতা নিয়ে আলোচনা করার আগে আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে যৌনতার কথা সংক্ষেপে কিছু বলে নেওয়া দরকার।
বাংলা ভাষায় প্রচীনতম গ্রন্থ চর্যাপদ। যার রচনা কাল ৯৫০খ্রীষ্টাব্দের কাছাকাছি। চর্যাপদে আছে শৃঙ্গার রসের কথা। চর্যাপদের পর দীর্ঘকাল পরে রচিত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী, রামায়ণ-মহাভারত-ভাগবতের অনুবাদ, মনসা-চন্ডী-ধর্মঠাকুরের মাহাত্মসূচক বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য। আমাদের দেশেই বাৎসায়ন লিখেছিলেন ‘কামসূত্র’। পরবর্তীকালে আরও কত কামশাস্ত্র রচিত হয়েছে তার ঠিক ঠিকানা নেই। দ্বাদশ শতকে লেখা হয়েছিল কোক্ককের ‘রতিরহস্য’, যা ‘কোকশাস্ত্র’ নামে পরিচিত।
রামায়ন মহাভারতেও আছে যৌনতার সমারোহ বর্ণনা। প্রাচীন মুনি-ঋষিরা ইচ্ছামাত্র মিলিত হচ্ছেন সুন্দরীদের সঙ্গে। তাঁদের মৈথুন কার্যের ফসল লোকলজ্জার ভয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছেন জলে । কখনো ফেলে আসছেন জঙ্গলে বা মাঠে। মহাভারতেই এর অজস্র উদাহরণ আছে। অর্জুন ,ভীম প্রমুখেরা যেখানে গেছেন সুন্দরী যুবতী দেখেই কামনা করেছেন, বিয়ে করেছেন। হয়ত সেই স্ত্রীর আর খোঁজ করেন নি । দুষ্মন্ত-শকুন্তলার বিয়ে তো এভাবেই।
মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পদাবলী সাহিত্য রচনা করেছেন। চন্ডীদাস-বিদ্যাপতি-জ্ঞানদাস, দৌলত কাজি, মুকুন্দরাম, সৈয়দ আলাওল রচিত পদাবলীর উপজীব্য বিষয় রাধা কৃষ্ণের প্রণয় লীলা। সব ক্ষেত্রেই অনুষঙ্গ হিসাবে এসেছে যৌনতা। আমাদের প্রাচীন সাহিত্য যেখানে যৌনপ্রসঙ্গ এসেছে সেখানে শৈল্পিক আবেদনও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষত, সম্ভোগ দৃশ্যের বর্ণনায়।
মধ্যযুগের প্রথম দিকে রচিত হয়েছে বড়ু চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে রাধা- কৃষ্ণের যৌন মিলনের যে বর্ণনা আছে -তা যেন শব্দ রচিত চলচ্ছবি। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে অন্তত চারবার যৌন মিলন দৃশ্যের বর্ণনা আছে যার প্রতিটি দৃশ্যই নিঁখুত ও সম্পূর্ণ। শরীরী মিলনও যে শিল্প হয়ে উঠতে পারে তার একটি অবিস্মরণীয় উদাহারণ -‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। আধুনিক কালের নরনারীর মিলনেও এত দক্ষতা ও যৌনবিজ্ঞানের এমন নিপুণ প্রয়োগ দেখা যায় কিনা সন্দেহ!
শুধুমাত্র সাহিত্য নয়, সাহিত্য-শিল্প-ভাস্কর্য -সবক্ষেত্রেই এসেছে যৌনতা। খাজুরাহো কোনারকের মতো মন্দিরের গায়ে খোদাই করা নর নারীর ঘনিষ্ঠ চিত্রগুলি আজও আমাদের বিস্ময়ে হতবাক করে। যে জাতি মন্দিরে বিগ্রহ দেখার আগে পুল্যলোভাতুর দর্শনার্থীর সামনে মেলে ধরে রতি-সুখ-সার চিত্রপট ও ভাস্কর্য, দেবদাসী নৃত্যের সকাম বর্ণনা -সে জাতির যৌনতা বুঝতে গেলে দেশীয় সাহিত্য সংস্কৃতিতে পারঙ্গম হতেই হয়। যৌনতা, সৌন্দর্য ও উদার চিন্তাভাবনা কত কাল আগে আমাদের দেশেও প্রচলিত ছিল!
মধ্যযুগের শেষ দিকে রচিত হয়েছে ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ -‘বিদ্যাসুন্দর’ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধাকৃষ্ণের সম্ভোগের মত বিদ্যা-সুন্দরের সম্ভোগলীলাও কাব্যের কাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত। রয়েছে যৌনতা – রগরগে কামকলার বর্ণনা। পরবর্তীকালে অবশ্য এই ধ্রুপদী যৌন অনুষঙ্গগুলি অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে। ‘শ্রীকৃষ্ণকর্তন’ কাব্য ও ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্য সম্পর্কে অশ্লীলতার অভিযোগ গুরুতর।
তবে মনে রাখতে হবে সাহিত্যেই হোক বা শিল্পেই হোক, পাঠক-শ্রোতা-দর্শককে কামাবিষ্ট বা মোহাবিষ্ট করার জন্য যৌনতার আমদানি করা হয়নি। স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবন যাপনের অনিবার্য অঙ্গ হিসেবে এগুলি ব্যাখাত হয়েছে। এই খোলাখুলি যৌনতা তৎকালীন জনরুচির বিচারে অশ্লীল ছিল না।
যৌনতাকে অশ্লীলতার সাথে সংযুক্ত করতে ,শিল্প -সাহিত্যে যৌনতাকে আড়ালে-আবডালে রাখতে আমরা শিখলাম ইংরেজদের কাছ থেকে। সাগরপার থেকে উড়ে আসা এক নতুন হাওয়ার প্রভাবে আমূল বদলে গেল আমাদের ভাবনাচিন্তা ,জীবনধারণ ও মূল্যবোধের ধারণাগুলো।তাদের সংস্পর্শে এসে যৌনতা সম্পর্কে ছুৎমার্গ এল। ভিক্টোরীয় নীতিবোধ এবং কিছুটা খ্রিষ্টীয় পাপ-চেতনা ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি মানসে ব্যাপক প্রভাব ফেলল।
উনিশ শতকে ইতিহাসের সেই ঝোড়ো যুগেই আমাদের আধুনিক কথা সাহিত্যের পথচলা শুরু। যৌনতার অবদমন দেখা গেল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। যৌনতা ও প্রেমকে পৃথকভাবে দেখা হল। শিল্প সাহিত্যে প্রাধান্য পেল বিশুদ্ধ প্রেম। যৌনতা সম্পর্কে নানা বিধিনিষেধ আরোপিত হল। নৈতিকতার নিগড়ে আটকে রাখা হল যৌনতাকে। যৌনতার নিঃসঙ্কোচ উল্লেখ বা যৌনতা বিষয়ক কথাবার্তা অশালীন বলে গণ্য হল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই শিক্ষিত বাঙালীর কাছে যৌনতা ক্রমশই অস্পৃশ্য এক পাপাচার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেল।
বাংলা কথাসাহিত্যর সুচনা অবশ্যই ভবানীচরণ, প্যারীচাঁদ বা কলীপ্রসন্নর কলমে । ভবানীচরণের ‘নববাবুবিলাস’ ও ‘নববিবিবিলাস’ যেন উনিশ শতকের বাবু কালচার ও বেশ্যা সংস্কৃতির এক অনুপুঙখ ম্যনুয়েল। কলকাতার ধনী যুবকের লাম্পট্য, পরস্ত্রী সম্ভোগ ও বহু নারীগমনের কেচ্ছা সম্বলিত পুস্তক ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দূতীবিলাস’ । কলকাতার সম্পন্ন পরিবারগুলোতে পুরুষতান্ত্রিক যৌন অবরোধের ভিতর গৃহস্থ মেয়েদের নিজস্ব শারীরিক উপভোগ বা সমকামিতার এর ছবি পাওয়া যায় ‘দূতীবিলাসে’। প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ তে আছে সমাজ যৌনতার কথা। কিন্তু এই সময়ের লেখকেরা নৈতিক দিক দিয়ে সকলেই ছিলেন প্রায় বিবেকের ভূমিকায়।
বলা যায় কথা সাহিত্যের যথার্থ আত্মপ্রকাশ বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে। তিনি যৌন মানসিকতার শৃঙ্খলায় কঠোরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন।বাংলা দেশে ‘প্রেম’ নামক পদ্ধতিটির আবিষ্কারক বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমের কালে এবং বঙ্কিমের কলমে নারীর শরীরে ফুটেছিল কমলহীরের দ্যুতি। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যে নারী ও এবং প্রেমের ভূমিকা নিয়ে খুব তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন পূর্ণেন্দূ পত্রী —
“বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সারা জীবনে যা কিছু লিখেছেন তার অর্ধেক বিষয় ভালোবাসা, বাকী অর্ধেক ধর্ম, সমাজ ও ইতিহাস। বঙ্কিমচন্দ্র ভালোবাসা নিয়ে যা কিছু লিখেছেন,তার অর্ধর্কটা জুড়ে নারী। বাকী অর্ধেকটা সমাজ সংস্কার এবং সংঘাত। বঙ্কিমচন্দ্র নারীদের নিয়ে যা কিছু লিখেছেন তার অর্ধেকট জুড়ে তাদের রূপ, তাদের সৌন্দর্যের মোহ, তাদের দৈহিক আকর্ষণ বাকী অর্ধেকটা হৃদয়ের ভিতরকার নদ-নদী, জল, জলস্তম্ভ এবং জোয়ার ভাঁটা।” -অর্থাৎ এককথায় দাঁড়াল রূপবতী রমনীরাই বঙ্কিমচন্দ্রৈর যা কিছু সৃষ্টির অর্ধেক।
কথাসাহিত্যের চারা গাছকে বাঁচানোর দায়িত্ব ছিল বঙ্কিমের একক কাঁধে। ফলে তাঁকে এগোতে হয়েছে খুব সাবধানে। সমাজ-স্বাস্থ্যের নজরদার বঙ্কিমের পক্ষে অসম্ভব ছিল হৃদয়চর্চার কাহিনী রচনা করা। বিষবৃক্ষের ‘কুন্দনন্দিনী’ বা কৃষ্ণকান্তের উইলে ‘রোহিণী’ চরিত্র চিত্রায়নে তিনি যৌনতাকে ব্যবহার করেছেন কাহিনীর প্রয়োজনে। প্রয়োজন ফুরোতেই তিনি তাদের মেরে ফেলেছেন। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় বঙ্কিমের সমসময়ের। তিনি তাঁর ‘রূপসী হিরণ্ময়ী’ আখ্যানে হিরণ্ময়ীর পরপুরুষ সম্ভোগের কথা রাখঢাক না করেই বলেছেন পরে অবশ্য তিনি হিরণ্ময়ীর এই প্রবণতার জন্য তাকে মারাত্মক শাস্তি দিয়েছেন।
তারপর এলেন রবীন্দ্রনাথ ।জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে যৌনতাকে তিনি দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’,’চোখের বালি’ ও ‘ঘরে বাইরে’ তৎকালীন সমালোচকদের কাছে নিন্দিত হয়েছিল। নিন্দুকদের মতে যৌনতাকে আশ্রয় করেই এই গল্পগুলির বিস্তার। তিনি বাংলা সাহিত্যে সৌন্দর্যতত্ত্বের পুরোহিত – High priest of beauty. এই সৌন্দর্যও তাঁদের কাছে যৌনভাবের সৌন্দর্য ছাড়া কিছৃ নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস তকমা পেল— উদ্দাম কামপ্রবৃত্তির পোশাকি রূপের.. যেখানে রোমন্সের সাথে যৌনতাকে মেশানো হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ পূর্ণতার প্রতীক যৌবনের জয়গানে মুখর। বারবার কামনা করেছেন তার স্পর্শ, যৌবনকে দেখেছেন সুন্দর ও সত্য হিসেবে। আসলে দৃষ্টির আড়ালে যে গভীর গোপন মনের রসায়ন -সেই মগ্নচৈতন্যের লুকানো কারখানার সন্ধানে নেমেছেন সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসের নারী চরিত্রদের অবলম্বন করে। ‘চোখের বালি’র মহেন্দ্র -বিনোদিনী অথবা ‘ঘরে বাইরে’র বিমলা-সন্দীপের নানাবিধ যৌনতার সুক্ষ বর্ণনা অত্যন্ত পরিশীলিত ভাবে আছে। রক্তমাংসের কামনা মূর্ত হয়ে উঠেছিল সন্দীপের মধ্যেও। বিমলাও চঞ্চল হয়েছে বার বার। নীতিবোধে আক্রান্ত রবীন্দ্রনাথ মহেন্দ্র -বিনোদিনী বা বিনোদিনী-বিহারীকে চুম্বন পর্যন্ত আগাতে দেননি–
“বিনোদিনী বিহারীর গলদেশ বাহুতে বেষ্টন করিয়া বলিল – জীবনসর্বস্ব, জানি তুমি আমার চিরকালের নও, -কিন্ত আজ এক মুহূর্তের জন্য আমাকে ভালবাস! তারপর আমি আমাদের সেই বনেজঙ্গলে চলিয়া যাইব, কাহারও কাছে কিছু চাহিব না। মরণ পর্যন্ত রাখিবার আমায় কিছু একটা দেও বলিয়া বিনোদিনী তাহার ওষ্ঠাধর বিহারীর কাছে অগ্রসর করিয়া দিল।”
ব্যাস্ ,ঐ পর্যন্ত। শিল্পে সাহিত্যে যৌনতার নিবিড় প্রকাশ রবীন্দ্রনাথের না-পসন্দ ছিল। তাই দেখা যায় ,তাঁর উপন্যাসে বা গল্পে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের চিত্রিত চরিত্রেরা সংযম হারিয়েছে। সাহিত্যে ও তাঁর রচনায় যৌনতা আছে ,কিন্তু তার প্রকাশভঙ্গি পরিশীলিত ,অন্যরকম। রবীন্দ্রনাথের রচনায় কামনা থাকলেও কামের জায়গা ছিল না। তিনি কোথাও বাস্তবতার নামে উচ্ছৃঙ্খলতার প্রশ্রয় দেন নি।
বলা বাহুল্য সে যুগের নীতিবোধ, সামাজিক প্রেক্ষিত এ জাতীয় ঘটনা দেখাবার প্রতিকূল ছিল। তাতে পাঠক আনুকূল্য পাওয়া সম্ভব হত না । পাঠকপ্রিয় রবীন্দ্রনাথ এরকম ঝুঁকি নিতে পারেন নি। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো না মেরে বিধবা বিনোদিনী কে তিনি কাশী পাঠিয়ে দিয়েছেন আর সন্দীপ পালিয়েছে উত্তরের ট্রেনে চেপে। এইসব ঝামেলার চরিত্র নিয়ে রবীন্দ্রনাথও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন।
এবার শরৎচন্দ্র । বিরোধীদের কথায় ,’রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় ও চোখের বালির একটা মিলিত সংস্করণ বাহির হইয়াছে -তাহার নাম শ্রীযুক্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চরিত্রহীন’। কিছু নীতিবাদী প্রাবন্ধিকের ধারণা হয়েছিল যৌনতা আমদানি করে অশ্লীল ও দুর্নীতিপ্রস্থ সাহিত্য লিখে শরৎচন্দ্র দেশের মানুষকে নরকস্থ হবার পথ দেখাচ্ছেন। এখানে উল্লেখ্য শরৎচন্দ্রের লেখা ‘প্রবাসী’র কাছে প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ চরিত্রহীনের কিরণময়ী ও সাবিত্রী র দিকে। বুদ্ধদেব বসু তো লিখেই ফেললেন ‘সাবিত্রীর মতো মেসের ঝি থাকলে আমরা মেসেই পড়ে থাকতুম’।
শরৎসাহিত্যেও যৌনতা আছে তবে তা শিল্পসম্মত উঁচু মানের পর্দায় বাঁধা। উঁচুদরের রসিক না হলে তার প্রকাশভঙ্গী ধরা মুশকিল। শ্রীকান্ত চতুর্থ পর্বে রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তকে এক জায়গায় বলছে -‘ তোমাকে কি বিনামূল্যে অমনি অমনিই নেব -তার ঋণ পরিশোধ করব না? আর আমিও যে তোমার জীবনে সত্যি করে এসেছিলুম যাওয়ার আগে সেই আসার চিহ্ন রেখে যাব না ? এমনি নিষ্ফলা চলে যাব ? কিছুতেই তা আমি হতে দেব না।’ -এই কথার পিছনে যে ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে তা যৌনতারই নামান্তর। তবে শরৎচন্দ্রের নায়ক -নায়িকারা সব সময়ই যৌনমিলন হতে নিজেদের দূরে রেখেছে।
শরৎচন্দ্রের কোমল শান্ত-মৃদু যৌনতাকে অতিক্রম করে ধুর্জটিপ্রসাদ তাঁর ‘অন্তঃশীলা’ উপন্যাসে লিখলেন রমলাদেবীর কথা। শরৎচন্দ্রের সুরেশ অচলা লোকলজ্জার জন্য যা করতে পারেনি তাই করে দেখিয়ে দিল রমলা-খগেন। জগদীশ গুপ্তর যৌনতার জগৎ আরও তীব্র আরও তিক্ত। জগদীশ গুপ্ত লিখলের ‘লঘুগুরু’.’রতি ও বিরতি’.’শ্রীমতী রোমন্থন’.’তাতল সৈকতে’। লঘুগুরুর জগৎ সম্পর্কে প্রশ্ন তুললেন রবীন্দ্রনাথ । যৌনতার এক বিচিত্র উদাহরণ জগদীশ গুপ্তের ‘অরুপের রাস’ গল্পটি। ছোটবেলার খেলার সঙ্গী পাড়ার কানুদাকে ভালোবেসেছিল রাণু। কিন্তু কানুদার শরীরকে সে পায়নি। তাই কানুদার শরীরের স্পর্শ লেগে থাকা কানুদার স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সংসর্গ করে রাণু কানুদার শরীরের স্বাদ নিয়েছে।
বিভূতি সাহিত্যও নরনারীর প্রেম আছে কিন্তু সৃষ্ট প্রেমের কাহিনীতে যৌবনের দাহ, মিলনের জন্য নরনারীর তীব্র ব্যকুলতার প্রকাশ নেই। বিভূতিভূষণ যে প্রমের তীব্রতা বা যৌন আকর্ষণ সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ ছিলেন -তা নয় । তাঁর ‘অথৈ জল’ নামে উপন্যাসে শহুরে প্রেম দেখাতে গিয়ে তিনি অনেকখানি আদিরেসের সাহায্য নিয়েছিলেন। তবুও বলা যায় তার সৃষ্ট প্রেমিকা নারী কামনাময়ী নয়, নায়কচিত্তে সে দেহতৃষ্ণা জাগায় না ,সে মমতাময়ী কল্যানী প্রতিমা।
নালিশ শোনা যায় যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় জীবন থেকে যৌনতা বেশি। যে দুটি বই নিয়ে এই নালিশ তা হল ‘চতুষ্কোন’ উপন্যাস এবং ‘সরীসৃপ’ গল্পগ্রন্থ। তবে এই দুটিই শুধু নয়, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’,’পুতুল নাচের ইতিকথা’ সহ মানিকের প্রথম দিকের সমস্ত রচনাই যৌন মিশ্রিত মনস্তাত্ত্বিক রচনা। মানিক মনে করেন প্রেম হোক ,কাম হোক, যৌনতা হোক, এ রহস্য জীবনেরই রহস্য, এ বিস্ময় জীবনেরই বিস্ময়। যৌনতা জীবনের একটি সুস্থ, প্রধান ,অত্যাজ্য অংশ । তাঁর গল্প উপন্যাসে যৌনতা এসেছে জীবন রূপায়ণের অনিবার্য তাগিদে। মানিক কখনই যৌনতা সর্বস্ব নন-বরং বিবেকহীন যৌনতাকে তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। মানুষের অবচেতন মনের আলো -আঁধারের লীলার অপূর্ব শিল্পগুণান্বিত অথচ শক্তিশালী বিশ্লেষন আমরা মানিক সাহিত্যেই পাই।
কবিতায় যৌনগন্ধী শব্দ থাকার জন্য শিক্ষকতার চাকরী হারাতে হয়েছিল জীবনানন্দ দাশকে। তখনো তাঁর একটিও গল্প উপন্যাস প্রকাশিত হয়নি। যে সময়ে জীবনানন্দ দাশ গল্প উপন্যাসগুলো লিখেছিলেন তখন তাঁর বয়স ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। সে সময়টা যৌনবোধ ও যৌনযন্ত্রনার তীব্র দাপাপদাপির বয়স। স্বভাবিকভাবে যৌনতা তাঁর গল্পে উপন্যাসে উঠে এসেছে, তবে তা যৌন উত্তেজনার আগুন পোহানোর জন্য নয়। মূলত দাম্পত্য জীবনের স্থিরতা অস্থিরতাকে কেন্দ্র করেই তাঁর গল্প উপন্যাসে উঠে এসেছে নারী ও যৌনপ্রসঙ্গের দ্বন্দ্ব সংঘাত। প্রেম জীবনানন্দর কাছে শরীরী-মিলনের সার্থকতা নয়, বরং তা অপ্রাপ্তির ধূসরতা। ।
”সাহিত্যে লালসা ইতিপূর্বে স্থান পায়নি বা এর পরে স্থান পাবেনা এমন কথা সত্যের খাতিরে বলতে পারিনে”-রবীন্দ্রনাথ যখন একথা বলছেন ততদিনে বাংলা সাহিত্যে উচ্ছৃঙ্খলতা আর অসংযমের বাঁধ ভাঙা বন্য দেখা দিয়েছে। তারুণ্যের জয়পতাকা ওড়াবার নামে ‘কল্লোলে’র লেখকরা শালীনতা, শোভনতা ও সুমার্জিত রুচিবোধকে ধুলায় কাদায় টেনে নামিয়ে দিয়েছেন। অশ্লীলভাবে দেহবাস্তবের নগ্নতাকে উদ্ঘাটন করে বাংলা সাহিত্যের কোমল লাজুক বাতাবরণকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
সেই চ্যালেঞ্জ এর মোকাবিলা করতে গিয়ে সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা নিয়ে চলেছিল কত সাহিত্যিক বাদ-বিবাদ, কত তর্ক-বিতর্ক। শ্লীল-অশ্লীলের সীমারেখা নিয়ে আসরে নেমেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ , শরৎচন্দ্র , নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, অমল হোম প্রমুখ রথী মহারথীরা। কিন্তু সমাধান বা সর্বসম্মত কোন মীমাংসা হতে পারেনি।এ সম্বন্ধে তীব্র মতদ্বৈধ ছিল, আজও আছে, পরেও থাকবে বলে মনে হয়।
নারী ও প্রেম নিয়ে বুদ্ধদেব যে নির্বানপন্থী ছিলেন না তা তঁর লেখায় স্পষ্ট। বুদ্ধদেব বসু রগরগে যৌনতাও এক অস্বাভাবিক সৌন্দর্য মাখিয়ে উপন্যাস লিখেছেন । তাঁর ভাষায় আছে এক মোহনীয় রূপ। তাঁর লেখা ‘রজনী হল উতলা’য় আছে আঠারো বছর মেয়ের সঙ্গে ষোল বছরের কিশোরীর শৃঙ্গার সম্ভোগ দৃশ্য। কল্লোলে ‘রজনী হল উতলা’ ছাপা হলে আত্মশক্তি পত্রিকায় বীণাপাণি দেবী ক্ষুব্ধ হয়ে লেখেন -“এমন লেখককে আঁতুড়েই নুন খাইয়ে মেরে ফেলা উচিত ছিল’। তাঁর ‘রাত ভরে বৃষ্টি’ অশ্লীলতার অভিযোগে আদালতে পৌঁছে গিয়েছিল।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পঞ্চশর’ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘বেদে’, শৈলজারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ‘মা’ প্রভৃতি গল্প উপন্যাসে আছে দেহকেন্দ্রিক কামনা বাসনার প্রতিফলন। প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে’ আখ্যানে যৌনচর্চার বীভৎসতাকে খুবই নিরাসক্ত ভাবে সংযত কলমে ফুটিয়ে তুলেছেন। মণীন্দ্রলাল বসুর ‘রমলা’য় আছে নমনীয় -কমনীয় ললিত-গলিত প্রেমের বর্ণনা। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের লেখায় যৌনতা বা দেহ-ক্ষুধা এত বেশি আছে যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তার নাম দিয়েছিলেন ‘মিথুন প্রবৃত্তি’। তাঁর ‘বিবাহের চেয়ে বড়’ গল্পটি অশ্লীলতার দায় এড়াতে পারেনি।শেষের দিকে অবশ্য ধর্মের আশ্রয় খুঁজেছেন অচিন্ত্যকুমার।
সমরেশ বসুর সাহিত্য ও জীবন অনেক ক্ষেত্রেই এক হয়ে গেছে। জীবন নিয়ে তীব্র কোন নৈতিকতা বা আদর্শের আদিখ্যেতা ছিল না তাঁর।যে জীবন যাপনে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন তা যেন উঠে এসেছিল তাঁর কলমে সরাসরি। সমরেশ বসু লিখলেন ‘বিবর’। সবলে টান দিল পাঠককে। বাংলা উপন্যাসের সৌধে বুঝি ফাটল ধরল এবার । বিবর ভেঙে দিল অনেক পুরানো সংস্কার- রুচি সংস্কার, শুচি সংস্কার, নীতি সংস্কার। সমরেশের ‘বিবর’ অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল আর ‘প্রজাপতি’ নিষিদ্ধ হয়ে লেখককে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে হয়েছিল।
শুধু বুদ্ধদেব বসু বা সমরেশ বসুই নয় ,এ ধরণের অখ্যাতি ছিল জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীরও । জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী প্রধানত যৌন বিষয়কে সামনে রেখে মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। বুদ্ধদেব গুহর প্রতিটি উপন্যাসে যৌনতা হাজির স্বমহিমায়। তাঁর উপন্যাসের ঘটনা বিন্যাসের পরতে পরতে আছে যৌনতার বিস্তার। তথাকথিত তান্ত্রিক লেখক অবধূত এর লেখাতেও আছে যৌনতা।তাঁর দুএকটি লেখা বাদ দিলে ধর্মক্ষেত্র যেন হয়ে উঠেছে যৌনক্ষেত্র।
ইদিপাস কমপেক্স এর চমৎকার নিদর্শন সুবোধ ঘোষ এর গল্পে। তাঁর ‘পরশুরামের কুঠার’ গল্পটি এখানে স্মরণ করতে পারি । ধনিয়ার কোন স্বামী নেই কোন ছেলেমেয়ে নেই কিন্তু দু তিন বছর অন্তর অন্তর তার সন্তান ভুমিষ্ঠ হয়। পরবর্তীতে যারা ধনিয়ার খদ্দের হয়ে এসেছে তারা একসময় ধনিয়ার বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়েছে। কমলকুমার মজুমদার লিখলেন ‘মল্লিকাবাহার’ , ‘গোলাপসুন্দরী’ ‘শবরীমঙ্গল’ উপাখ্যান । সেখানে যৌনতা কখনও প্রকটভাবে কখনও প্রচ্ছন্নভাবে অধিকার করল বিশেষ স্থান। ‘অন্তর্জলী যাত্রা’তে ভেসে এল এক বিশেষ সম্পর্কের কথা ।চন্ডাল বৈজু আর কুলীন গৃবধুর যৌনতা – যা ইতিপূর্বে দেখা যায় নি। অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘দুখিয়ার কুঠি’ আখ্যানে পিতা-পুত্রকে দেখা গেল যৌন প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে।
তারাশঙ্করের ‘নারী ও নাগিনী’ গল্পে যৌন-সংসর্গের এক আশ্চর্য স্বরূপ উদ্ঘটিত। এই গল্পে মনুষ্যতের প্রাণী এক সাপের সঙ্গে যৌন-সংসর্গের কথা বলা হয়েছে। এসময়ের আর একজন লেখক অনিল ঘড়াই তাঁর ‘বালিয়াড়ি’ গল্পে দেখিয়েছেন জড়পদার্থের সঙ্গে মানুষের যৌন সম্ভোগের কথা। মতি নন্দীর ‘শবাগার’ গল্পটি পড়ে চমকে উঠতে হয়। মৃত্যুপথযাত্রী স্বামীর সম্মুখে তার স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্ভোগে মিলিত হচ্ছে এক অন্য পুরুষ। এই শবাগারে জীবন ও মৃত্যু একই সঙ্গে অবস্থান করছে।
দুঃসাহসিক কিচ্ছু তরুণের অনুপ্রবেশ ঘটল বাংলা সাহিত্যে। এঁরা ‘হাংরি’ নামে পরিচিত। এঁদের লেখালেখি বাঙালীর সযত্নলালিত রক্ষণশীলতায় দারুণ ঝাঁকুনি লাগল। মলয় রায়চৌধুরী,সুবিমল বসাক,বাসুদেব দাশগুপ্ত,শৈলেশ্বর ঘোষ,অবনীধর,ও অন্যান্যদের সঙ্গে জুটে গেলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় ,উৎপলকুমার বসু ,বিনয় মজুমদার প্রমুখেরা। যৌনতা বিষয়টি নিয়ে নাড়া-ঘাটা চলতে লাগল। যৌনাচার,যৌনাঙ্গ, যৌন-অনুসঙ্গের উপস্থাপনা সৃষ্টি করে দিল স্বতন্ত্র একটি ধারার। অপভাষা অবাধ গতিতে ঢুকে যেতে লাগল আখ্যানে।ভদ্রজনের রাখঢাক করার দায় থেকে সরে যেতে লাগল অনেক কথাকাররা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় , লোকনাথ ভট্টাচার্য , নবারুণ ভট্টাচার্যের অনেক আখ্যান এই মন্তব্যের উদাহরণ হতে পারে। নারী পুরুষের যৌন সম্ভোগের কথা এমনভাবে আসল, যা মধ্যবিত্ত পাঠকদের অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় পরিষ্কারভাবে বলে দিলেন তাঁর সাহিত্যের একমাত্র বিষয় হল – যৌনতা । ‘বিজনের রক্তমাংস’ দিয়ে শুরু করে ‘ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী’ ‘আত্মক্রীড়া’ ‘শেষ মট্রো’ ছোটগল্পে এবং ‘জঙ্গলের দিনরাত্রি’, ‘রুবি কখন আসবে’ ইত্যাদি দীর্ঘ আখ্যানে তিনি যৌনতা নিয়ে চর্চা করেছেন নানাভাবে। যৌনতার এক বীভৎস রূপ উন্মোচিত হল সুবিমল মিশ্রের ‘পরীজাতক’ গল্পে। এঁদের রচনায় যৌনতার উগ্রতা, বাংলা কথা সাহিত্যের আঙ্গিনায় ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছিল দীর্ঘদিনের লালিত সংস্কার বিশ্বাস।
দেবেশ রায় যৌন বিষয়কে কেন্দ্রে রেখে আশ্চর্য সব আখ্যান রচনা করে গেছেন। কথা সাহিত্যের আঙিনায় দেবেশ এর আগেও সময় ‘অসময়ের বৃতান্ত’, ‘বৃষ্টি বাদল’ আখ্যানে যৌনতাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখার প্রয়াস পেয়েছিলেন। কিন্তু ‘ব্যক্তিগত ফ্যাসিবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে একটি উপন্যাসে’ তিনি দুর্বার। এই আখ্যানে তিনি যৌন অতৃপ্ত নারীদের সমস্যা নিয়ে শিল্প রচনা করেছেন। পড়তে পড়তে শিউরে উঠতে হয়। বাঙলার অনেক ঘরের স্ত্রীরা জানেই না সর্বাধিক যৌন পুলকের অনুভূতিটা ঠিক কী রকম! আখ্যানে ষাট বছর বয়সী নেহা জানেই না কাকে বলে শরীর, তার নিজের শরীরের কাকে বলে উল্লাস আর কাকে বলে মেয়েদের নিজস্ব রমণ! এ ধরণের আখ্যান বাংলা কথা সাহিত্য এর আগে পায়নি। যৌনতা কেবল উত্তেজনার নয় উপলব্ধির, আমাদের বুঝতে সাহায্য করেন দেবেশ রায়।
আমাদের দেশে কেন প্রায় গোটা বিশ্বেই নারীকে দেখা হয়েছে যৌন আগ্রাসনের নিরুপায় ও বিকল্পহিন গ্রহীতা হিসাবে। বাংলা কথাসাহিত্যে যে সব বই নিয়ে এক সময প্রবল আলোচনা অভিযোগ দানা বেঁধেছিল তার সবকটির মূলেই ছিল পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।
বাংলা কথাসাহিত্যে শিল্পীসুলভ গভীরতায় যৌন চেতনা আমরা পেলাম সত্তরের দশক থেকে। সত্তরের দশকে এক ঝাঁক কথাকার উঠে এলেন বাঙলার নানা কোন থেকে । এঁরা তুলে আনতে লাগলেন বিচিত্র জনজীবনের আখ্যানরাজি।
শচীন দাশ তাঁর ‘ঘোগ’ আখ্যানে সুন্দরবন অঞ্চলের নোনা জলের আঘাতে মাটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে ঘরে পরপুরুষের আগমনকে জুড়ে দিলেন অশেষ দক্ষতায় । সোহরাব হোসেন ‘শিকার কাল’ আখ্যানে সমাজে সম্মানীয় এক প্রৌঢ় মানুষের পর্ণ-পুস্তক পড়ার কথা লিখেছেন। গোপন কক্ষে থাকে তাঁর পর্ণ ভান্ডার। সোহরাব হোসেন ‘মাঠ জাদু জানে’ তাঁর আর একটি গল্পে ভূমিতে বীজ বপনের পরবর্তী অঙ্কুরোদ্গম প্রক্রিযার সঙ্গে শিশ্ন যোনির সংসর্গে গর্ভসঞ্চার অনুসঙ্গকে অসাধারণ দক্ষতায় তুলে এনেছেন। শুভঙ্কর গুহ তাঁর আখ্যানে তূলে আনেন কর্পোরেট জগতের মালিকের যৌনাচার। ভগীরথ মিশ্র তাঁর ‘চারণভূমি’ আখ্যানে মালিকের অধীনস্ত কর্মিনীদের দেহভোগ করার বাস্তবতা নিয়ে বিবাহবহির্ভূত নারী পুরুষের যৌনতার কথা আখ্যানে নতুনভাবে উপস্থিত করেছেন। শরদিন্দু সাহা তাঁর ছোট গল্প ‘জঠর’ উপাখ্যানে বড়বউ ছোট বউকে বলে ‘আজকাল তো অনেকে শুক্রানু কিনে নেয় । তুই নিবি তোর সুবিমলদার? কেউ জানবে না’….
শরদিন্দু সাহা ‘স্বপ্নে সন্ততি’ গল্পে তালাকপ্রপ্ত এক রমনীর গর্ভবতী হওয়া নিয়ে আশ্চর্য বুনন করেছেন। সমস্যা এই রমনীর গর্ভে বীজটা তালাক পাওয়ার আগে না পরে প্রোথিত হয়েছে তাই নিয়ে। অভিজিৎ সেন ‘বিদ্যাধরী ও বিবাগী লখিন্দর’ আখ্যানে ভিখু তারই আত্মজা মধুমতীর কাছে তার কাপড়ের আড়ালের কমলালেবু’ নিলামে চড়ায়।
কমল চক্রবর্তীর ‘ব্রহ্মভার্গব পুরাণে’ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের যৌন জীবনের অনেক গুঢ় খবর আমরা পেয়ে যাই । নলিনী বেরার ‘অপৌরুষেয়’ গল্পে আনন্দী তার লিঙ্গাত্বক পরিচয়ের জন্য মাথা খুড়ে মরছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’। আর তিলোত্তমা মজুমদারের চাঁদের গায়ে চাঁদ। এ সব বইয়ে সমকামীদের যৌনজীবন সম্পর্কে বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে।
সময়ের সাথে মুল্যবোধেরও পরিবর্তন হয়। এক যুগের মুল্যবান জিনিষ অপর যুগে মূলহীন হয়ে যায়। স্নেহ প্রেম করুণা ইত্যাদি যেসব মানবিক হৃদয়বৃত্তি এককালে যথেষ্ট মর্যাদা ছিল ইদানীং কালের কাব্যে সাহিত্যে তা উপহাসের বস্তু হয়ে উঠেছে। মাতা -পুত্র ,পিতা -কন্যা ,ভাই -বোনের স্নেহের সম্পর্কগুলোর বন্ধন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘চেনা মহলে’ আছে রক্ত সম্পর্কে ভাই বোনের প্রেম।
তিলাত্তমার ‘প্রহাণ’ উপন্যাসে রয়েছে বাপ মেয়ের যৌন সম্পর্কের টানাপোড়েন। অবাধ যৌন সম্পর্কে যে পাপ নেই পুরাণের যম-যমী সংবাদ পড়ে শুনিয়েছে মেয়ে তার বাবাকে।অসংযত মেয়ে শেষ পর্যন্ত বাবাকে বলছে …’আচ্ছা সরাসরি না পারলে ইউজ ইয়োর ফিংগার…’। ‘রাজপাট’ উপন্যাসে আছে পাতানো মায়ের সঙ্গে ছেলের যৌন সম্ভোগের কথা।। যদিও আমাদের বহুদনের লালিত সংস্কার নীতিবোধ এ ধরণের যৌন সম্পর্ককে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনা সব সবময়। এ সকল বিষয়বস্তুর প্রতিক্রিয়া পাঠক সাধারণের মনের উপর গুরুতর এবং দীর্ঘকালস্থায়ী।
এমনিভাবে অজস্র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে । বাংলা কথাসাহিত্যে এমনতর বিচিত্র প্রেম ভালোবাসা ছড়িয়ে আছে অনেক লেখকের অনেক আখ্যানে। আর প্রেমের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে যৌনতা। যৌনতার প্রকাশ নির্ভর করে লেখকের রুচি, কাহিনীর বিন্যাস আর সামাজিক বোধ অনুযায়ী । যৌনতার প্রকাশে কেউ কেউ সংযত আবার কেউবা অবাধ – অবারিত।
যৌন দৃশ্যের প্রতি আমাদের দুর্বার মোহ। অনিবার্য আকর্ষণ। ১৮৩৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল একটি পত্রিকা ‘সম্বাদ রসরাজ’। অন্দরমহলের মেয়েদের যৌন সক্রিয়তা, মৈথুনে উদ্যোগী ভূমিকা এবং মেয়েদের সমকামী আচরণের বিবরণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যেত ‘সম্বাদ রসরাজ’ পত্রিকায়। অধিকাংশই নাম গোপন করে বা ছদ্মনামের আড়ালে বিভিন্ন অভিজাত পরিবারের মেয়েদের যৌন আচরণের রসালো বিবরণ থাকত। দেখা গেছে সেই পত্রিকার গ্রাহক সংখ্য এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, সে সময়ে কোন ভাল সংবাদপত্রের এত গ্রাহক ছিল না । বটতলার বইয়ের বিক্রি বঙ্কিমচন্দ্রের বই এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
পাঠক টানার এত সহজ পথ হাতের কাছে পেয়ে কোন কোন লেখক লেখিকা সেই পথে পা বড়াচ্ছেন। পাঠকের যৌন অনুভুতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে কী করে সস্তায় নাম কেনা যায়, দু পয়সা কামানো যায় সে বিদ্যাতেই এঁরা হাত পাকিয়ে চলেছেন। তন্ত্র মন্ত্র,রহস্য, রোমাঞ্চ, গল্প উপন্যাস যে কোন রচনায় যত্রতত্র ‘গরুর রচনা’র মতো যৌনতা আমদানি করার জন্য এঁরা ওৎ পেতে থাকেন। সেক্স থ্রিল আর প্রেমের যৌগ মিলনে তৈরী হয় ‘বেস্ট সেলার’ মার্কা বই। সঙ্গে থাকে প্রচারের ঢক্কা নিনাদ,বিজ্ঞাপনের জৌলুস ।আর পেটোয়া সমালোচকের উস্কানি। এতে পাঠকরূপী শিকার ধরার প্রবণতা বাড়ছে। হতভাগ্য পাঠকের অবস্থা হয়ে উঠছে ‘অজগর কবলিত হরিণে’র মত।

তবে বলাই যায় যে যৌন বর্ণনা পড়ার জন্য কেউ সাহিত্য পড়ে না । তার জন্য পর্ণোগ্রফি আছে ।সারা বিশ্বজজুড়ে তৈরী হয়েছে সেক্স ইড্রাস্টি। আসলে সাহিত্যের পাঠক সাহিত্যই পড়তে চায় যৌনতা খুজতে যায় না। যৌনপ্রসঙ্গ থাকতেই পারে , তা অবাধও হতে পারে তা নিয়ে কোন সংস্কার নেই অধিকাংশ পাঠকের। কিন্তু দেখতে হবে কাহিনী বিন্যাসে তার প্রয়োজন কতটুকু।ঘটনার খাতিরে তা অনিবার্য কি না। আর তা না করে যদি উদ্দেশ্যমুলক যৌন সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য লেখায় যৌনতা আমদানি করা হয় তবে তা অযৌক্তিক , সেইসব লেখাকে অভিযুক্ত করাও অসঙ্গত হবে না।

তথ্যঋণ-
১)ভারতীয় দর্শন ও তত্ত্বে কাম ও যৌনতা – দেবব্রত দাস।

২) রবীন্দ্রনাথের দুটি উপন্যাস ও ভারতীয় যৌন মনন – শুক্লা রায়।

৩) সমরেশ বসুর সাহিত্যে যৌনতার নির্মাণ- শুভময় সরকার।

৪) কথা বিশ্বে যৌন যৌনতা:পটপরিবর্তন- বাসুদেব দাশগুপ্ত।

৫)যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল – বিশ্বজিৎ পন্ডা।

৬) বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস -জহরলাল বসু।

৭) একালের বাংলা গদ্য পদ্য আন্দোলনের দলিল- সত্য গুহ।

৮) কথা সাহিত্য- নারায়ন চৌধুরী