“সার্ধশতবর্ষে আচার্য যদুনাথ সরকার”
পদ্ধতিতন্ত্রের নিগড়ে গড়া বিস্মৃতপ্রায় এক ঐতিহাসিক – দীপরাজ দাশগুপ্ত
কলকাতায় ইতিহাস পড়তে যাওয়ার সময় আমার মনে ধারণা ছিল স্যার যদুনাথ সরকার , রমেশচন্দ্র মজুমদার , নীহাররঞ্জন রায় , কালিকারঞ্জন কানুনগোদের মতো বিখ্যাত ইতিহাসবিদদের লেখা পাঠ্যক্রমে পড়ার সুযোগ পাবো । কিন্তু দেখলাম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের সিলেবাসে এঁদের নামও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে । সেই স্থানে মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা ইতিহাস বিভাগের পাঠ্যক্রমে স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত (এই কথা আমি সশ্রদ্ধভাবেই লিখছি) । বুঝলাম যদুনাথ সরকার ও সেকালীন ঐতিহাসিকরা আজ অনেকটাই ব্রাত্য। কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম ।
আমার ইতিহাস চেতনার আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ভাস্বর সেই বিখ্যাত নামগুলো , কৈশোরে ইতিহাসের সাথে পরিচয়ের সময় থেকে যা আমি শুনে কিংবা পড়ে আসছি , তার প্রতি এক স্বাভাবিক আগ্রহ থেকেই ব্যক্তিগত ভাবে এদের জীবন ও কর্মের সাথে পরিচিত হতে শুরু করেছিলাম । এঁদের লেখা বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থগুলো কিছুটা হলেও পড়ার চেষ্টা শুরু করেছিলাম । এভাবেই একদিন আচার্য যদুনাথ সরকারের সাথে আমার পরিচয় হলো । সীমিত পরিসরের মধ্যে থেকেই তাঁর কিছু গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে তাঁকে অনুধাবনের চেষ্টা করে চলেছি । কেন তিনি আজ বিস্মৃতপ্রায় তা বোঝার চেষ্টা করে চলেছি । আজ তাঁর সার্ধশত জন্মদিবসে আচার্য যদুনাথের অনুসন্ধানে এই লেখাটি সেরকমই একটি অতি সামান্য প্রয়াস মাত্র ।
আচার্য যদুনাথ কোনো আত্মচরিত লিখে যাননি । তাঁর অধীনে গবেষণাকারী প্রিয় ছাত্র কালিকারঞ্জন কানুনগোর একটি স্মৃতিচারণামূলক প্রবন্ধ থেকে জানা যায় এ বিষয়ে যদুনাথের অনাগ্রহের কথা । আত্মচরিত না লিখলেও “আমার জীবন প্রণালী” নামে তিনি একটি সংক্ষিপ্ত রচনা লিখেছিলেন । এক ইতিহাস সাধককে বুঝতে তা পাঠককে কিছুটা সাহায্য করে । অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তীর লেখা The Calling of History – Sir Jadunath Sarkar and His Empire of Truth গ্রন্থে বলতে চেয়েছেন , “ইতিহাসবিদ স্যার সরকার উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকে জনপ্রিয় হওয়া ইতিহাস উৎসাহের ফসল । অসংখ্য ইতিহাস গবেষক ও স্বশিক্ষিত , অপেশাদার ঐতিহাসিক তৈরি করেছিল শতাব্দীর এই ভাগ।” ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষা মাধ্যমে ভারতীয় ইতিহাস ছিল অনেকটাই ব্রাত্য । হয়তো এই কারণটি তাঁকে ইতিহাসবিদ হয়ে উঠতে প্রেরণা যুগিয়েছিল ।
স্যার যদুনাথ পদ্ধতিগত , তথ্যানুগ ও বিবরণমূলক ইতিহাস রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন । ইতিহাস গবেষণায় তিনি জার্মানদের অগ্রণী জাতি বলে মনে করতেন । জার্মান ইতিহাসবিদ লিওপোন্ড ভন র্যাংকের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা ছিল তাঁর । র্যাংকের মতোই তিনিও ইতিহাসচর্চায় তথ্যনিষ্ঠতাকেই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন । ইতিহাসের রচনায় তাঁর অসামান্য ধৈর্য্য , অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম ছিল অতুলনীয় । এক আত্মমগ্ন সাধকের মতো তিনি ইতিহাসের অনুসন্ধান চালিয়ে গেছেন । ইতিহাস গবেষণা ছিল তাঁর কাছে এক মহান তপস্যার মতো । ইতিহাসের সত্যকে অনুসন্ধানের পথে সুখ-দুঃখ , বাধা-বিপত্তি , খ্যাতি-নিন্দায় সেই নির্বিকার তপস্বী সিদ্ধিলাভ করেছিলেন । ইতিহাস রচনায় তাঁর সততা ও পরিশ্রম আজ অনেকটাই অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে পারে । কাজের প্রতি অন্ধভক্তিই সাফল্যের পথে তাঁকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল । দীপেশ চক্রবর্তীর বিশ্লেষণে আমরা স্যার যদুনাথ সরকারকে দেখতে পাই অতি নিয়মানুবর্তী এক ঐতিহাসিক সাধক হিসেবে যিনি ইতিহাসের সত্যতা যাচাই করার জন্য জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন , তাঁর মতে ইতিহাসবিদদের কাজ হলো চাক্ষুষ সাক্ষীর প্রমাণ পত্রের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা । ঐতিহাসিক সত্যের আবিষ্কারে তিনি আমৃত্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। যাঁর সাথে তিনি কাজ করেছিলেন সেই ডঃ গোবিন্দ সখারাম সরদেশাই তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন ,, “যদুনাথ সরকার হঠাৎ করে ইতিহাসবিদ হননি , তিনি সৌভাগ্যের অধিকারী বলেই ইতিহাসবিদ হয়ে যাননি । তার সমগ্র জীবন ছিল এককথায় – প্রস্তুতি , পরিকল্পনা , কঠিন পরিশ্রম এবং প্রায় ঐশ্বরিক ভক্তিতুল্য কাজের প্রতি নিষ্ঠা । যা একটি মিশন সফল করতে মানুষকে সাহায্য করবে।”
বিংশ শতকের ঐতিহাসিক যদুনাথ সম্পর্কে একবিংশ শতকের ইতিহাসবিদ ঈ. শ্রীধরণের মন্তব্যটি উল্লেখযোগ্য । তিনি বলেছেন ,, “যদুনাথ সরকার ছিলেন তাঁর সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ এবং তাঁর কাজ থেকে বোঝা যায় একজন ইতিহাসবিদ কতখানি সততার সঙ্গে ইতিহাস চর্চা করতে পারেন।”
জাতীয়তাবাদ ও বীরপূজার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েও স্যার যদুনাথ এ ধরণের ইতিহাসচর্চায় অসাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন । তাঁর “History of Bengal” এ তিনি যশোর জমিদার প্রতাপাদিত্যের প্রকৃত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন । প্রতাপাদিত্যের বীরত্ব কাহিনী যে অনৈতিহাসিক তা তিনি তথ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন । আবার শিবাজী ও সিরাজদৌল্লা সম্পর্কে নির্মোহ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন । তথ্যনিষ্ঠতা ও সত্যের প্রতি নির্মোহ দৃষ্টি তাঁর সময়ে তাঁকে প্রবাদপ্রতিম করে তুলেছিল । উনিশশো তিরিশ এর দিক থেকে স্যার যদুনাথ মন প্রাণ সমর্পণ করে দিয়েছিলেন ভারতীয় গবেষকদের পথপ্রদর্শক হিসেবে তাদের জন্য গবেষণার সামগ্রী সংগ্রহে । কালিকারঞ্জন কানুনগোর মতো ইতিহাস গবেষক তাঁর হাতেই তৈরি করা ।
মুঘল যুগের ইতিহাস চর্চায় তাঁর রচনা আজো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক । আকবরের প্রসংশা করলেও তিনি গবেষণার জন্য বেছে নিয়েছিলেন আওরঙ্গজেবকে। পাঁচটি খণ্ডে রচিত “History of Aurangzib” আজো অপ্রতিদ্বন্দ্বী ঐতিহাসিক গবেষণা । এ সময়ের তথ্যের জন্য যে কোনো গবেষকের কাছে এখনো স্যার যদুনাথের রচনাকর্ম নির্ভরযোগ্য ভরসাস্থল । হিন্দু ও মুসলিম পরস্পরবিরোধী ইতিহাসবিদদের কাছ থেকে তিনি তথ্য প্রমাণ সহযোগে আওরঙ্গজেবের ও শেষ মুঘল কালের প্রকৃত ইতিহাস উদ্ধার করে লিপিবদ্ধ করেছেন । এক্ষেত্রে কোনো প্রকার আবেগ ও সত্যের অপলাপ তিনি কখনোই হতে দেননি । এই অসামান্য নির্মোহতা থাকে সত্যব্রতী মহান ঐতিহাসিক রুপে প্রতিষ্ঠিত করেছিল ।
মুঘল কাল বিষয়ে যদুনাথ সরকারের ইতিহাস এতোই নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য যে তাঁর ঘোর বিরোধীদেরও মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস রচনায় রেফারেন্স হিসেবে তাঁর রচিত গ্রন্থের উপরে নির্ভর করতে হয় । ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জে এফ রিচার্ডস তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন ,, “তিনি মোটামুটি নিখুঁত ও তথ্যনির্ভর মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস রচনা করেছেন এবং তা আমরা অনুসরণ করে চলেছি।”
রমেশচন্দ্র মজুমদার ও কে. আর. কানুনগোর মতো ঐতিহাসিকরা আচার্য যদুনাথকে ইতিহাস গবেষণায় তাদের গুরু হিসেবে মানতেন । আবার সুরেন্দ্রনাথ সেন , মুহম্মদ হাবিব , নুরুল হাসান ও শাফাত আহম্মদ খানের মতো ঐতিহাসিকরা যদুনাথের বিরোধিতা করেছেন নানা ভাবে । তবে কেউই তাঁর ঐতিহাসিক সততা ও তথ্যনিষ্ঠতাকে ভুল প্রমাণিত করতে পারেননি । কারণ এ বিষয়ে তাঁর কাজ ছিল প্রশ্নাতীত । যদুনাথ সরকারের ঐকান্তিক ঐতিহাসিক তপস্যা সম্পর্কে ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী তার দ্য কলিং হিস্ট্রিতে লিখেছেন ,, “সত্যি বলতে কী , যে কোনো ইতিহাসবিদ ‘ইতিহাস গ্রন্থ’ রচনা করতে গিয়ে যা হতে হবে । সেটা সবার পক্ষে হওয়া সহজ কাজ নয় – ‘তাকে অবশ্যই একজন সন্ন্যাসী হতে হবে , ঈশ্বরকে খোঁজার মতো করে সত্যকে খুঁজতে হবে । তাকে রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে । তাকে ইতিহাসে লুকিয়ে থাকা গোপণ সত্য খুঁজে বের করতে হলে ‘নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে’ খুঁজে বের করতে হবে । যদুনাথ সরকার ছিলেন এই রকমই একজন মানুষ যিনি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে ইতিহাস রচনা করে গেছেন ।
যদুনাথ সরকারের সমকালীন যেসব ইতিহাসবিদরা তাঁর সমালোচনা করেছে , তারা কোনোদিনই বুঝতে চাইবে না যদুনাথ সরকার কী পরিশ্রমের সাথে রাজনৈতিক পক্ষপাতহীনতা , সততা , বিষয়টির সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করার মর্ম কী , তারা নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে এতটাই অন্ধ হয়ে আছে।”
অসামান্য ঐতিহাসিক প্রজ্ঞার পরও আজ সার্ধশতবর্ষে দাঁড়িয়ে কেন তিনি অনেকটাই ব্রাত্য , সেই প্রশ্ন বারংবার উঠে আসে । তাঁর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন কেন হলো না ? শিক্ষা ব্যবস্থার উচ্চ স্তরে তাঁর লিখিত ইতিহাস কেন যথার্থ গুরুত্ব পেল না ? রাজনৈতিক মতাদর্শের উপরে দাঁড়িয়ে নির্মোহ দৃষ্টিতে ঐতিহাসিক সত্যকে তথ্যনিষ্ঠ ভাবে রচনা করাই কী তাঁর প্রতি উপেক্ষার কারণ ? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ?
পরিশেষে, সার্ধশতবর্ষে আচার্য যদুনাথ সরকারের প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম
তথ্যঋণ :
• এম. সি. সরকার প্রকাশিত যদুনাথ সরকার রচনা সম্ভার
• The Calling of History – Sir Jadunath Sarkar and His Empire of Truth : Dipesh Chakrabarty
• আচার্য যদুনাথ সরকার সম্পর্কে রমেশচন্দ্র মজুমদার , কে.আর. কানুনগো , নীহাররঞ্জন রায় ও গৌতম ভদ্রের প্রবন্ধ ।