ঔপন‍্যাসিক আশাপূর্ণা দেবী

কলমে : অনন্যা সাহা, বি.এ ( বাংলা ), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়


ভূমিকা :
আশাপূর্ণা দেবীর নাম বাংলা সাহিত্যের দরবারে বিশেষ ভাবে খ্যাত। তৎকালীন সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি মেয়েদের মনোস্তত্ব নিয়ে পর্যালোচনা করে সেই পর্যালোচনাকে নিজ রচনায় স্থান দেন। স্পষ্ট ভাবে বলতে গেলে তাঁর রচনার মূল উপজিব্য ছিল বিংশ শতকের বাঙালি সমাজ ও নারীমহল। যে নারীদের, আমাদের তথাকথিত সমাজ যুগ-যুগান্ত থেকে উপেক্ষিত করে আসছে তাদের মনের অন্দরের কথাই লেখিকা মহাশয়া নিজ রচিত নানান কাহিনীতে তুলে ধরেন। একাধারে তিনি ছিলেন ঔপন‍্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং শিশুসাহিত্যিক। বিভিন্ন ধরণের ঘটনার সমাবেশকে অঙ্গীকার করে, তিনি যে ভাবে নিজ প্রতিবাদী সত্তার বহিঃপ্রকাশ করেন তার তুলনা কোনো ভাবেই চলেনা। তিনি নিজ লেখনীর জোড়ে স্বতন্ত্রতার বিশেষ সতন্ত্রতার দাবিদার। একজন গৃহবধূ হয়েই তাঁর সাহিত্যের যাত্রার আরম্ভন হয়। পাশ্চাত্য সভ্যতা অথবা পাশ্চাত্যের বিষয় সম্মন্ধে আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন নিতান্তই অনভিজ্ঞা কিন্তু তবুও তাঁর চিন্তন শক্তি ছিল প্রখর। এই চিন্তন শক্তিকে কাজে লাগিয়েই তিনি,নিজের নানান ধরণের গৃহকর্মের মাঝে সময় বের করে সাহিত্য রচনায় প্রবৃত্ত হন।
লেখিকার অন্তরদৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণ শক্তি ছিল অতুলনীয়। তিনি নিজের সারা জীবন যাবৎ নিজের এই পর্যবেক্ষণ শক্তির দ্বারা নীতিহীন সমাজকে প্রত্যক্ষ করেন এবং সমাজের বিভিন্ন স্খলনকে নিজ রচনার মাধ্যমে পাঠককুলের সাথে অতীব স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেন।
প্রথম প্রতিশ্রুতি – সুবর্ণলতা – বকুল কথা এই তিনটি উপন্যাস হলো তাঁর রচিত ত্রয়ী উপন্যাস যার জনপ্রিয়তা আজও অটুট রয়ে গিয়েছে। বলাবাহুল্য বাংলা সাহিত্যে এই রচনা তিনটিকে বিশ শতকের প্রেক্ষিতে শ্রেষ্ঠ হিসেবে গন্য করা হয়। তাঁর রচিত উপন্যাস সকলের মধ্যে,সমসাময়িক সমাজের প্রেক্ষাপটে ও বিত্ত ভেদে নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব,প্রেম, সংঘাত, সংঘর্ষ, প্রতিবাদ সমস্তই ফুটে উঠেছে। যা তাঁর ঔপন‍্যাসিক সত্তাকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

জন্ম ও বংশ পরিচয় :
     উত্তর কোলকাতার মাতুললয়ে আশাপূর্ণা দেবীর জন্ম হয় ১৯০৯ সালের ৮ ই জানুয়ারি। তাঁর পিতা ছিলেন হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত এবং মাতা ছিলেন সরলাসুন্দরী দেবী। তাদের আদিনিবাস ছিল হুগলী জেলার বেগমপুরে। এবং ১৯২৪ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয় কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা কালিদাস গুপ্তের সাথে। সে যুগে তাঁর পিতা বিভিন্ন জনপ্রিয় পত্রিকায় ছবি আঁকতেন, তিনি ছিলেন প্রফেশানাল কমারসিয়াল আর্টিস্ট।
      আশাপূর্ণা দেবীর ছেলেবেলাটা কেটেছে উত্তর কলকাতাতেই। তাঁর ঠাকুমা নিস্তারিণী দেবীর ছিল পাঁচ পুত্র। আশাপূর্ণা দেবী নিজ ঠাকুমার একান্নবর্তী পরিবারেই বড়ো হয়ে উঠতে থাকেন। তবে আনুমানিক পাঁচ বছর বয়সে লেখিকার বাস-ভিটের পরিবর্তন হয়। তাঁর পিতা হরেন্দ্রনাথ আপার সার্কুলার রোডে নিজস্ব বাস ভবন যখন বানান তখনই তাঁর বাসস্থানের পরিবর্তন ঘটে। তবে এতো কম বয়সেও শৈশবের নানান স্মৃতি তাঁর স্মৃতিপটে অক্ষুন্ন ভাবে রয়ে। যার প্রতিফলন আমরা তাঁর বিভিন্ন রচনার মধ্যে প্রত্যক্ষ করি।
তাঁর নিজস্বী একটি বয়ান থেকে জানা যায় শৈশবকালে তিনি বেশ ডাকাবুকো ছিলেন। দাদাদের সাথে ক্যারাম খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, মার্বেল খেলা এ সবই তিনি শৈশবকালে করেন। এছাড়া তাঁর প্রিয় বাড়ির দুই সদস্য ছিলেন তাঁর দিদি রত্নমালা ও তাঁর বোন সম্পূর্ণা। লেখিকার মতে তিনি এবং তাঁর তিন বোন ছিলেন “…এক মলাটে তিনখানিগ্রন্থ “।
এর পরে লেখিকার ভাগ্যের পট পরিবর্তন ঘটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি চিঠির মাধ্যমে। দুঃসাহসীকতার বসে লেখিকার, রবীন্দ্রনাথের প্রতি লেখা এক চিঠির প্রতিউত্তর পাওয়ার পরেই মূলত তাঁর লেখক সত্তার বিশেষ জাগরণ হয়।

শিক্ষা :
       শিক্ষার ক্ষেত্রে আশাপূর্ণা দেবী ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন সমস্ত রকম রক্ষণশীলতার উর্দ্ধে। এছাড়া নিজ মাতার আনুকূল্য সাহিত্য পাঠেও ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। তবে ছেলেবেলায় খুবই দুঃখজনক ভাবে তাঁর প্রথাগত ভাবে শিক্ষা লাভ করা হয়ে ওঠেনি। ঠাকুমা নিস্তারিণী দেবীর কঠোর অনুশাসনের তলে পৃষ্ট হওয়ার কারণ বশতই লেখিকা মহাশয়ার এমন দুর্গতি হয়। তৎকালীন সমজের ন্যায় তাঁর ঠাকুমাও স্ত্রী শিক্ষার বিশেষ বিরোধি ছিলেন, তিনি মনে করতেন বাড়ির কন্যারা স্কুলে পড়তে গেলেই তাদের চারিত্রিক পতন অবসম্ভাবি। সে যুগে যেহেতু যেকোনো কন্যা সন্তানের জীবনের মোক্ষম লক্ষ্য ছিল বিবাহ, সেহেতু তাদের চরিত্রে কোনো রকম কোনো অনাকাঙ্খিত কালিমা থাকা বাঞ্ছণীয় ছিলনা। ফলত নারী শিক্ষার চল সেই সময় বলা বাহুল্য নগন্যই ছিল। অন্যদিকে লেখিকার মাতাভক্ত পিতাও, মাতার সম্মানের কথা মাথায় রেখে নিজ কন্যাকে প্রথাগত শিক্ষা প্রদানে ছিল অপারক।
তবে এমন অহিতকর পরিবেশে থেকেও আশাপূর্ণা দেবী শিক্ষা অর্জনে কখনো পিছুপা হননি। খুবই অল্প বয়সে নিজ আত্মসংকল্পের জোড়ে নিজের দাদার কাছে পড়া শুনেই তিনি নিজ জ্ঞানের বিস্তার করা শুরু করেন। অন্যদিকে বর্ণপরিচয়ও ছিল তাঁর শিক্ষা গ্রহণের আর এক সঙ্গী।
তাঁর মাতা সরলাদেবী ছিলেন সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠিকা এই কারণে নিজ সাহিত্য পাঠের গুন তিনি নিজের সন্তানদেরও প্রদান করেন। এছাড়াও সরলাসুন্দরী দেবী ছিলেন চৈতন্য লাইব্রেরি, জ্ঞানপ্রকাশ লাইব্রেরি ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্য সেই সুবাদেই আশাপূর্ণা দেবীর গৃহে গ্রন্থ সম্ভারের অভাব ছিলোনা এবং তাঁর গৃহে সাধনা, প্রবাসী, সবুজপত্র, বঙ্গদর্শন, সন্দেশ ইত্যাদি পত্রিকা সকলের আনাগোনাও ছিল অবাধ। এই কারণেই প্রথাগত শিক্ষার আবেশ তাঁর জীবনে না ঘটলেও,এ সমস্ত পুস্তিকা গুলি পঠন করে তাঁর মধ্যেকার সাহিত্যিক সত্তার সার্থক ভাবে বিকাশ ঘটে।

ঔপন‍্যাসিক আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্য জীবন :
       আশাপূর্ণা দেবী নিজের সারাটা সাহিত্য জীবন জুড়ে, নানান ধরণের সাহিত্য প্রকরণের আশ্রয় নিয়ে নানান প্রকারের রচনার করে যান। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস এ সবই তাঁর রচনা সম্ভারের অঙ্গবিশেষ, তবে এ সকল ধরণের প্রকরণের মাঝে আশাপূর্ণা দেবীর রচিত উপন্যাসগুলি বিশেষ স্বতন্ত্রতার অধিকারী। তিনি ঔপনাসিক হিসেবে এমন কিছু উপন্যাসের সৃষ্টি করে যান, যে উপন্যাসের আখ্যান এবং চরিত্রসকল কালের প্রেক্ষিতে বিশেষ তৎপর্যবাহী হয়ে থেকে গিয়েছে।
১৯৪৪ সালে লেখিকা মহাশয়া তাঁর প্রথম উপন্যাস লেখেন। কমলা পাবলিসিং এর সম্পাদক বিশু মুখোপাধ্যায়ের তাগিদে তিনি ” প্রেম ও প্রয়োজন “ নামক উপন্যাসটি লেখেন।
অল্প পরিসর ও সুতীক্ষ্ণ প্রেক্ষাপট যুক্ত ছোট গল্প লেখার জন্য লেখিকা মহাশয়া প্রথম থেকেই বিশেষ জনপ্রিয় ছিলেন তবে উপন্যাস জগতে পদার্পন করার পরে তাঁর প্রতি পাঠককুল আরও কিছুটা আকর্ষিত হয়ে পরে কারণ উপন্যাসের মতন বৃহৎ প্রেক্ষাপটে লেখিকা মহাশয়ার অন্তঃস্থল আরও স্পষ্ট ভাবে পরিস্ফুট হতে থাকে।
তাঁর প্রত্যেক উপন্যাসেরই মূলে ছিল তৎকালীন সময়ের বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ এবং সেই সমাজেরই মানুষের জীবনযাত্রা। এছাড়া নারীদের কথাও তাঁর উপন্যাসে উপেক্ষিত হয়নি।
এ সব কিছু মিলিয়েই তাঁর রচিত উপন্যাস গুলির মাধ্যমে আমরা এই বিষয়টি খুবই ভালো ভাবে জানতে পারি যে তৎকালীন যুগের সাপেক্ষে,কালের সাথে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের বাইরের রূপ পরবর্তীত হলেও এর ভিতরের রূপ সেই অদ্দিকালের মতনই রক্ষনশীল রয়ে যায়, এর পরিবর্তন কোনো ভাবেই হয় না। লেখিকা এই রক্ষণশীল মনোভাবের উপর আঘাত হানতেই, নিজ রচিত উপন্যাস গুলিতে এমন কিছু চরিত্রের নির্মাণ করেন যাদের মধ্যে ছিল অতীপ্রাসঙ্গিক প্রতিবাদীভাবের বাহুল্যতা।
নিম্নে তাঁর লিখিত উপন্যাসের নাম সংক্ষিপ্ত ভাবে উল্লেখ করা হলো –
অনির্বান (১৯৪৫)
মিত্তির বাড়ি (১৯৪৭)
অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫২)
যোগবিয়োগ (১৯৫৩)
কল্যাণী (১৯৫৪)
নির্জন পৃথিবী (১৯৫৫)
অতিক্রান্ত (১৯৫৭)
প্রথম লগ্ন (১৯৫৯)
উত্তর লিপি (১৯৬০)
তিন ছন্দ (১৯৬১)
মায়াজাল (১৯৬২)
বহিরঙ্গ (১৯৬৩)
উত্তরণ (১৯৬৪)
প্রথম প্রতিশ্রুতি (১৯৬৪)
সুরভী স্বপ্ন (১৯৬৫)
দুই মেরু (১৯৬৬)
সুবর্ণলতা (১৯৬৭)
বকুল কথা (১৯৭৪)
এঘর অঘর (১৯৯৫)

ঔপন‍্যাসিক আশাপূর্ণা দেবীর লেখনীর বিশিষ্টতা :
      বাংলা সাহিত্য জগতে আশাপূর্ণা দেবীর প্রায় ২৪২ টির মতন উপন্যাসের অস্তিত্ব বিদ্যমান। এবং এই উপন্যাসগুলি রচনার ক্ষেত্রে লেখিকা মহাশয়ার লেখনীর কিছু বিশেষ বিচিত্রতা তথা স্বকীয়তা পরিস্ফুট হতে লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে সেই স্বকীয়তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিশিষ্টতা তুলে ধরা হলো –
১. উপন্যাস রচনায় ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছিল তাঁর পরিশীলিত মনোভাব এবং প্লট পরিবেশনেও তিনি ছিলেন বেশ সংযত প্রকৃতির।
২. এছাড়া তাঁর লেখনীতে ছিল তৎকালীন যুগের ছাপের পাশাপাশি আধুনিকতার ছোঁয়া।
৩. তাঁর কলমের জোড়ে তাঁর লিখিত উপন্যাসের নারী চরিত্রেরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেড়াজাল ভঙ্গ করে অন্দরমহল থেকে, বাইরের মুক্তাঙ্গনে বেরিয়ে আসে।
৪. যেকোনো পরিবারের মধ্যে নারীদের গুরুত্ব যে কোনোভাবেই নগন্য নয় এই বার্তাও তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে স্পষ্ট। তদুপরি তিনি প্রকৃতপক্ষে নিজ রচনার মাধ্যমে পরিবারের মধ্যে নারীদের মূল্যকেই প্রতিষ্ঠিত করেন।
৫. তাঁর উপন্যাসের মেয়েদের মধ্যে কুন্ঠিত রূপ, প্রণয়ে ভীরুতা, লোকলজ্জার ভয় এসব দেখা গেলেও এর সাথে তাদের সাহসিনী রূপও প্রস্ফুটিত হতে লক্ষ করা যায়।
৬. তাঁর উপন্যাসে উল্লিখিত পুরুষ চরিত্রগুলি বেশিরভাগই , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “…গৃহপালিত, মাতৃলালিত, পত্নীচালিত…।”
৭. লেখিকা নারী চরিত্রের বিভাজন মূলত দুই ভাবে করেন, যাদের মধ্যে একদল ছিল রক্ষনশীল মনোভাবাপন্ন আর একদল ছিল ব্যতিক্রমী অর্থাৎ যারা রক্ষণশীল মনোভাবের বিরুদ্ধ পক্ষ। এমনি ব্যতিক্রমী বিরুদ্ধ পক্ষের মধ্যে, সত্যবতী (প্রথম প্রতিশ্রুতি) এবং সুবর্ণলতা (সুবর্ণলতা) চরিত্র দুই বিশেষ তৎপর্যের অধিকারিণী।
৮. যেকোনো পরিবারের অন্দরমহলের মধ্যেও যে সমাজ ভাঙা ও গড়ার কাজ চলে এ বার্তাও লেখিকা তাঁর প্রথম প্রতিশ্রুতি নামক উপন্যাসের মাধ্যমে প্রদান করেন।
৯. নারীদের অন্তর্জগতের কথা ছাড়াও বাঙালি পরিবার নানান ইতিবাচক ও নেতিবাচক অধ্যায়ও আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস সকলের বিশেষ উপজীব্য হয়ে উঠেছিল।

পুরস্কার ও সম্মাননা :
     আশাপূর্ণা দেবী নিজ সাহিত্যকর্মের জন্য নানান ধরণের পুরস্কার ও সম্মাননা পান। তাঁর লেখনীর মধ্যে প্রস্ফুটিত তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, তৎকালীন সময়ে সকল পাঠকবর্গকে বিশেষ ভাবে অবাক করে তোলে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে সমাজের কথাকে উপেক্ষা করে কোনো গৃহবধূ যে, এমন সহজ সাবলীল ভাবে সকল নারীর মনোস্তত্ত্ব সংক্রান্ত লেখা লিখতে পারেন এ নিয়ে সকলেরই বিশেষ সংশয় বৈ আশা কোনোভাবেই ছিলোনা।

নিম্নে তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কার সকলের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হলো :

•কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত – লীলা পুরস্কার
(১৯৫৪)
•কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত – জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (১৯৬৩)
•কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত – ভুবনমোহিনী দাসী স্বর্ণপদক (১৯৬৬)
•পশ্চিম বঙ্গ সরকার প্রদত্ত – রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (১৯৬৬)
•ভারত সরকার প্রদত্ত – জ্ঞানপিঠ পুরস্কার (১৯৭৬)
•ভারত সরকার প্রদত্ত – পদ্মশ্রী (১৯৭৬)
•জব্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি.লিট (১৯৮৭)
•বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি.লিট (১৯৮৮)
•বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রদত্ত – হরনাথ ঘোষ পদক (১৯৮৮)
•বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.লিট(১৯৮৮)
• বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশিকত্তম (১৯৮৯)

উপসংহার :
সাহিত্যজীবনের সূত্রপাতের শুরুর দিকে সংসারের চাপের জন্য প্রায় দীর্ঘ চোদ্দ বছর ধরে আশাপূর্ণা দেবীর নিজ সাহিত্য রচনার ধারাকে শিশুসাহিত্য রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। অন্যদিকে মাত্র পোনেরো বছর বয়সে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয় তবে স্বামী কখনো তাঁর সাহিত্য চর্চায় বাঁধা হয়ে দাঁড়াননি।
গৃহবধূ হিসেবে তিনি প্রথম দিকে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য লেখা লিখতে বিশেষ কুন্ঠিতই বোধ করতেন তবে শেষ পর্যন্ত সম্পাদকমহল এবং প্রকাশকমহলের চাপে পরে,তিনি নিজের সমস্ত রকম দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে বড়োদের জন্য প্রথম ছোটগল্প “পত্নী ও প্রেয়সী” (১৯৩৬) রচনা করেন।
তাঁর লেখনীর মধ্যে থাকা মূল নির্যাস ছিল মেয়েদের জগতের মূল বাস্তব চিত্র। প্রসঙ্গত আশাপূর্ণা দেবীর আগে, সাহিত্যিক জগতের অনেকেই মহিলাদের কেন্দ্র চরিত্র বানিয়ে নানান লেখা লেখেন তবে আশাপূর্ণা দেবী তাদের থেকে আলাদা ছিলেন, এর একটাই কারণ তাঁর স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি মেয়েদের জগৎটাকে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন, যেখানে নারীদের প্রকৃত প্রতিবাদ মুখ্য হয়ে ওঠে। তিনি কোনোভাবেই নিজের লেখার মাধ্যমে নারীদের করুনার পাত্রী বানানোর চেষ্টা করেননি।
      পরিশেষে বলা যায় স্বশিক্ষিতা আশাপূর্ণা দেবী নিজের অবরুদ্ধ জীবনকে পাত্তা না দিয়ে  যে ভাবে সাহিত্য জগতের এক উচ্চ স্থান নিজের নামে বরাদ্দ করেন তা সত্যই অশেষ প্রশংসার দাবিদার। তবে স্বাধীনতার গন্ডি অতিক্রম না করতে পারার কারণে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার ঘাটতি তাঁকে তাঁর প্রতিভা প্রকাশে বিশেষ বাঁধা প্রদান করে বৈকি। কিন্তু নানান বাঁধা বিঘ্নতার মধ্যেও লেখিকা আমাদের সত্যবতী, সুবর্ণলতা প্রমুখদের মতন এমন কিছু চরিত্র উপহার দিয়ে যান যার জনপ্রিয়তা বাংলা সাহিত্যে স্বকাল এবং চিরকালের প্রেক্ষিতে অমর হয়ে রয়ে যাবে।