বিষ্ণু দে-র ঘোড়সওয়ার কবিতার বিষয়বস্তু আলোচনা –
কবিতার প্রথম স্তবকে পাই –
“জনসমুদ্রে জেগেছে জোয়ার
হৃদয়ে আমার চড়া।
চোরাবালি আমি দূরদিগন্তে ডাকি –
কোথায় ঘোড়সওয়ার ?”
জনসমুদ্রে মানে জনগণের মধ্যে, এখানে বিশ্বব্যাপী সাধারণ জনগণের কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে জোয়ার জেগেছে। কীসের জোয়ার ? পরিবর্তনের জোয়ার।
কী পরিবর্তন ? এতদিন ধরে চলে আসা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী সাধারণ জনগণ সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য জেগে উঠেছে।
এখানে আসলে মার্কসের শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলা হয়েছে। আমরা আগেই ঘোড়সওয়ার কবিতার পটভূমি বিশ্লেষণ করে জেনেছি – বিশ শতকের মধ্যভাগে পুঁজিবাদের সংকট, বিশ্বযুদ্ধ এবং ফ্যাসিবাদের উত্থান মানবসভ্যতাকে এক স্থবির ও সংকটাপন্ন অবস্থায় উপনীত করেছিল। মার্কসের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে সাধারণ মানুষ এর বিরুদ্ধে পথে নেমেছে।
কিন্তু তার পরের লাইনেই কবি লিখছেন – “হৃদয়ে আমার চড়া।”
অর্থাৎ কবির হৃদয়ে স্থবিরতা। কবি সেই জনজোয়ারে অংশ নিতে পারছেন না। কবি বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত হচ্ছেন। মার্কসবাদ এটাও বলে যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রম বিভাজন এবং উৎপাদনের উপায় থেকে শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতা মানুষের মনের গভীরে এক নিঃসঙ্গতা তৈরি করেছিল। কবি সেই নিংসঙ্গতায়, বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত।
‘চোরাবালি’ হল পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষের ক্লান্তিকর স্থবিরতা ও বিচ্ছিন্নতার রূপক।
আর এই বিচ্ছিন্নতাবোধ সহ ব্যক্তিতান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে কবি ঘোড়সওয়ারকে আহ্বান করছেন।
কিন্তু ঘোড়সওয়ার কেন ? প্রথমেই এই বিষয়টা জানিয়ে রাখি।
ঘোড়া আমাদের আজন্ম লালিত বীরের বাহন। ছেলেবেলার বীরপুরুষ কবিতাতেও রবীন্দ্রনাথ মাকে রক্ষা করার জন্য ছোট্ট বীরপুরুষকে রাঙা ঘোড়ায় বসিয়েছিলেন। ঘোড়ার উদ্যত গ্রীবা, টগবগ আওয়াজের দৌড়, তেজস্বী গতিবেগ, সতেজ আক্রমণের ভঙ্গি ঘোড়ার পিঠে বসা ঘোড়সওয়ারের মধ্যেও পরিচালিত হয়। ঘোড়ার পিঠে বসে ঘোড়সওয়ারও হয়ে ওঠে যেকোনো বাধা অতিক্রমে দুর্মর।
তাই তিরিশের ক্লান্ত মন্থর দিনে কবির মন যখন বিচ্ছিন্নতাবোধে ভারী হয়ে উঠেছে তখন সেই বাধা থেকে উত্তরণের জন্য কবি ঘোড়সওয়ারের আহ্বান জানিয়েছেন।
যেমন কবি তার অন্য এক কবিতায় বলছেন –
“ঘোড়া কেন বলো নাচে হ্রেষাচঞ্চল
নাসাপুট উদ্ধত।
সে কোন পাহাড়ে চলেছে, নীলকমল।
বলো কি তোমার ব্রত?” (বৈকালী / পূর্বলেখ)
আবার, সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে অনুসরণ করে আমরা এভাবেও বিষয়টা ভাবতে পারি যে কবি যেন ভক্ত আর ঘোড়সওয়ার হয়ে উঠেছে ভগবান। কংসের অত্যাচার থেকে বাচতে যেমন ভক্তবৃন্দ ভগবান কৃষ্ণের আরাধনা করেছিল তেমনি কবি বিষ্ণু দে ঘোড়সওয়ারের আসার প্রতীক্ষা করছেন।
এইভাবনা থেকেই এবার পরবর্তী পঙক্তি দেখি –
“দীপ্ত বিশ্ববিজয়ী। বর্শা তোলো।
কেন ভয় ? কেন বীরের ভরসা ভোলো ?
নয়নে ঘনায় বারে বারে ওঠা পড়া ?
চোরাবালি আমি দূরদিগন্তে ডাকি ?
হৃদয়ে আমার চড়া ?”
লক্ষ্য করো, প্রথম লাইনটা ছাড়া প্রতিটা লাইনের শেষে জিজ্ঞাসা চিহ্ন। কবি কাকে প্রশ্ন করছেন ? নিজেকে।
প্রথম লাইনে ঘোড়সওয়ারকে ‘দীপ্ত বিশ্ববিজয়ী’ বলে সম্বোধন করে তাকে বর্শা তোলার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর তার পরেই কবি নিজের মধ্যস্থ নিঃসঙ্গতা থেকে উত্তরণের জন্য নিজের মধ্যেই সেই দীপ্ত বিশ্ববিজয়ী ঘোড়সওয়ারের অনুসন্ধান করছেন। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে জানাচ্ছেন ভয় কেন ? বীরের ভরসা কি ভুলে গেছেন তিনি ? সত্যিই কি চোরাবালি দূরদিগন্তে ডাকেন ? সত্যিই কি তার হৃদয়ে চড়া পড়ে গেছে যে তিনি জনজোয়ারে অংশ নিতে পারছেন না ! এ আসলে নিজেকে নিজের শান্ত নিরাপদ মধ্যবিত্ত খোলস থেকে বাইরের বিক্ষুব্ধ পরিবেশে মুক্ত করার তীব্র আকুতি। কিংবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে অনুসরণ করে ভক্তের তার ভগবানের সঙ্গে অর্থাৎ কবির তার কাঙ্ক্ষিত ঘোড়সওয়ারের সঙ্গে মিলিত হবার তীব্র আকুতি।
পরবর্তী পঙক্তিতেও কবি নিজেকে নানা প্রশ্নে জর্জরিত করে সমাজে নিজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করছেন। নিজেকে কারোর শপথের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কিনা জানতে চেয়েছেন। তখনই চাঁদের আলোয় স্নিগ্ধ বালুকাময় তটভূমিও যেন কবির ব্যর্থতাকে মনে করাচ্ছে। মৃগতৃষ্ণিকা তখন মরীচিকা বা বিভ্রম জনিত আভিধনিক অর্থ অতিক্রম করে হয়ে দাঁড়াচ্ছে চাকচিক্যময় আপাতলোভন মধ্যবিত্ত অস্তিত্বের প্রতীক। আর কবি নিজেকে তারই অংশ মনে করেছেন, যার কারো তৃষ্ণা মেটাবার সাধ্য নেই, অঙ্গীকার রাখার সাধ্য নেই, কারো বাসরের অঞ্জলিতে অর্পিত হবার যোগ্যতা নেই। তিনি প্রশ্ন রাখছেন “আত্মাহুতি কি চিরকাল থাকে বাকি?”
জনসমুদ্রে জনজোয়ারের কোলাহলে কবি যোগ দিতে চাইছেন। তার জন্য কপালে তিলক টেনে প্রস্তুত হতে চাইছেন। পরমুহূর্তেই বলছেন
“সাগরের শিরে উদ্বেল নোনাজল / হৃদয়ে আধির চড়া”
কবি লক্ষ্য করছেন জনসমুদ্রের শিখরেও নোনাজল উদ্বেলিত। আমার মতে সাগরের শিখরে বলতে হয়ত কবি বোঝাতে চেয়েছেন যেখানে নদী সমুদ্রের সঙ্গে মেশে , সেখানে আমরা জানি নোনাজলের ঘনত্ব কম হয়, কেননা নদীর মিষ্টি জল সেখানে মিশে থাকে। অথচ কবি লক্ষ্য করছেন সেই সাগরের শিখরে নোনাজল উদ্বেলিত। এই নোনাজল আসলে আগের পঙক্তির মৃগতৃষ্ণিকা, চাকচিক্যময় প্রলোভিত মধ্যবিত্ত অস্তিত্ব। যা দেখে কবির হৃদয়ে আধি অর্থাৎ মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বময় পীড়ার চড়া পড়ে গেছে। কবি জনসমুদ্রে মিশে সংগ্রামে অংশ নিতে পারছেন না।
পঞ্চম পঙক্তির শুরুতে বিষ্ণু দে আবার বলছেন – “চোরাবালি ডাকি দূরদিগন্তে”
এই নিয়ে তিনবার লাইনটা কবিতায় আসছে বিভিন্নভাবে। এ থেকে বোঝা যায় চোরাবালি কবির মনে প্রোথিত হয়ে গেছে। আমরা জানি কবি কবিতার এই অর্ধ লিখছেন ভোরে, প্রবল জ্বর থেকে একটু সুস্থ হয়েই। তার আগে কবি শুনেছেন ময়মনসিংহের রাজা শশীকান্তের হাতির চোরাবালিতে ডোবার ঘটনা। এবং সমুদ্রতীরে ঘোড়া ডুবে যাবার বিদেশী গল্প। প্রায় একই প্রসঙ্গের দুটি ঘটনা জ্বরাক্রান্ত কবির মনের গভীরে প্রোথিত হয়ে বিচ্ছিন্নতার প্রতীক রূপে কবিতায় প্রতিভাত হয়েছে।
পরবর্তী লাইনগুলিতে বিচ্ছিন্নতাবোধ কবিমানসের মধ্যে আবদ্ধ। অর্থাৎ কবিমানসকে কবি দুই ব্যক্তিত্বে ভাগ করেছেন, যাকে আমরা ‘split personality’ বলে থাকি অনেকটা সেইরকম। বিষ্ণু দে লিখছেন –
“কোথায় পুরুষকার ?
হে প্রিয় আমার, প্রিয়তম মোর!
আয়োজন কাঁপে কামনার ঘোর,
অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গীকার ?”
– এ আসলে ব্যক্তিত্বের পূর্ণায়নের জন্য ব্যক্তিত্বের আকুলতা। প্রত্যেক মানুষই তার অন্তর সত্তায় অর্ধ নারী অর্ধ পুরুষ সত্তাকে বহন করে। প্রত্যেক পুরুষের মানসে নির্জ্ঞান স্তরে থাকে নারী, আর নারীর মধ্যে পুরুষ। আমাদের পুরাণেও আছে অর্ধনারীশ্বর ভাবনা, একই অঙ্গে শিব পার্বতী মিলিত হয়েছেন। আলোচ্য ‘ঘোড়সওয়ার’ কবিতাতেও আহ্বানকারিণী আসলে আহুতেরই ব্যক্তিসত্তার অংশ। ওই নারীসত্তা ‘কোথায় পুরুষকার?’ ডাকের মধ্য দিয়ে সমগ্র সৃষ্টিকে আহ্বান জানিয়েছে মিলিত হবার জন্য।
প্রসঙ্গত জানাই, অষ্ট্রেলিয়ার ওয়াটসান্ডিস দ্বীপপুঞ্জের আদিম উপজাতিরা বসন্তকালে একটা প্রথা মেনে চলত। প্রথাটা ছিল এইরকম – মাটিতে গর্ত খুঁড়ে ঝোপে ঝাড়ে তাকে আবৃত করতো। এটা আসলে ছিল স্ত্রী যোনির প্রতীক। আর এই গর্তটাকে ঘিরে উদ্যত বর্শা হাতে তারা নাচত। উদ্যত বর্শাটি ছিল সম্মুখিত পুরুষাঙ্গের প্রতীক। এটি নরনারীর যৌনমিলনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, আদিম উপজাতির তাদের ধরিত্রীর মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন মাটিকে বন্ধ্যাত্ব থেকে মুক্তি দেবার জন্য। এমনকি এইসময় তারা নারী সংসর্গ থেকে দূরে থেকে তাদের সমস্ত শক্তিকে নিয়োজিত করত শস্য উৎপাদনে। এই ভাবনাই ঘোড়সওয়ার কবিতার পরবর্তী পঙক্তিগুলিতে উপস্থাপিত করেছেন বিষ্ণু দে। বল্লম উঁচু, চোরাবালি, দীপ্ত ঘোড়সওয়ার, পুরুষকার, হঠকারিতায় ভেঙে দাও ভীরু দ্বার – ইত্যাদি প্রসঙ্গে আপাত অর্থে রিরংসার প্রতীক বলে মনে হলেও বিষ্ণু দে পঙক্তিগুলিকে আরো গভীর অর্থবহ করে ব্যঞ্জনামন্ডিত করেছেন।
‘হালকা হাওয়া’ কথাটি কবিতায় তিনবার এসেছে ; হালকা হাওয়া আসলে আসন্ন।ঝড়ের ইঙ্গিতবহ। ঝড় আসার আগে কবি নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে চাইছেন। যেভাবে আদিম উপজাতিরা তাদের সমস্ত শক্তি শস্য উৎপাদনে তথা ধরিত্রীকে শস্য শ্যামলায় সাজিয়ে তুলতে নিয়োজিত করত বিষ্ণু দে ও নিজের ব্যক্তিসত্তাকে সমাজ বদলের জন্য সংগ্রামে অংশ নিতে নির্দেশ দিয়ে বলছেন – “হঠকারিতায় ভেঙে দাও ভীরু দ্বার”
হিমশিলাপাত, ঝঞ্ঝা ইত্যাদি প্রতিকূলতার মধ্যে পাহাড়ের মতো অবিচল থাকার কথা জানিয়েছেন।
‘ছায়া’র প্রসঙ্গ কবি দুইবার এনেছেন। এবং দুইবারই কবি তার কামনার ছায়াকে শরীর ঘেঁষে পায়ে পায়ে চলতে বলেছেন। এই ছায়া আসলে কবির নির্জ্ঞান সত্তার প্রতীক, যা কবির ব্যক্তিসত্তার সঙ্গেই ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। তাই সেই কামনার ছায়াকে অর্থাৎ নির্জ্ঞান মনকে সচেতন মনের সঙ্গেই চলতে বলছেন।
ঝড় আসার আগে হালকা হাওয়ায় কবি নিজেকে বিশ্বজয়ী দীপ্ত ঘোড়সওয়ারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সংগ্রামে অংশ নিতে চেয়েছেন। কবি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন যেখানে স্বয়ং সূর্য জগতের স্রষ্টা ও পালক তোমার ললাটে তিলক এঁকে দিয়েছে সেখানে নিশ্বাস নিতে ভয় কেন! আর তারপরেই বলছেন –
“তুরঙ্গ তব বৈতরণীর পার”
অর্থাৎ, কষ্টের নদী পেরোলেই কেষ্ট অর্থাৎ ইপ্সিত কাঙ্ক্ষিত বস্ত পাওয়া হবে। প্রসঙ্গত মনে পড়ে যায় রামচন্দ্রও সীতা উদ্ধারের চূড়ান্ত যুদ্ধের আগে বৈতরণীর তীরে পিতৃতর্পণ করেছিলেন। বিষ্ণু দেও তাই বলছেন – “চেয়ে দেখো ঐ পিতৃলোকের দ্বার”
শেষে কবি জানিয়েছেন –
“জনসমুদ্রে নেমেছে জোয়ার / মেরুচূড়া জনহীন”
সকলে সংগ্রামের পথে পা বাড়িয়েছে। মেরুচূড়া তাই জনহীন। সমস্ত মানুষ লোকনিন্দার কথা হালকা হাওয়ায় ভুলে যে কোনো ঝড়ের সম্মুখীন হতে প্রস্তুত। এই সময় কবিও নিজের প্রিয়তম সত্তা , পুরুষ সত্তা, ঘোড়সওয়ারকে আহ্বান জনাচ্ছেন মিলিত হবার জন্য –
“কোথায় পুরুষকার ?
অঙ্গে আমার দেবো না অঙ্গীকার ?”
কবির ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে দীপ্ত ঘোড়সওয়ারের মিলিত শক্তিই সমস্ত বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করে আত্মদানের মাধ্যমে সমাজের সমস্ত অবক্ষয়ের জগদ্দল পাথরকে সরিয়ে নতুন সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
অর্থাৎ ঘোড়সওয়ার কবিতায় বিষ্ণু দে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা জনিত অবসাদ থেকে মুক্তির এবং ব্যষ্টি বা সমষ্টির মধ্যে একাত্ম হয়ে জরার বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামের কথা বলে।